ভোরের আলো ভাল করে ফুটবার আগেই রেমি উঠে পড়ে। ধ্রুব আজ ফিরবে কি না তা সে জানে না। ভাববার মানেও হয় না কোনও। রেমি সকালের জলখাবার খেয়ে নিল অনিচ্ছা সত্ত্বেও। সকাল নটা নাগাদ একটা রিকশা ডেকে ব্যাগ নিয়ে রওনা হয়ে পড়ল স্টেশনের দিকে। সিদ্ধান্তটা খুবই দুঃসাহসী। কিন্তু আপাতত এই সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।
কিন্তু বিকেলের আগে কলকাতার ভাল ট্রেন নেই। রেমি অনেকক্ষণ চেষ্টাচরিত্র এবং খানিকটা ছোটাছুটি করে ও অবশেষে এক দালালকে বেশি টাকা কবুল করে একটা স্লিপার বার্থের ব্যবস্থা করে ফেলল। একা মেয়েমানুষের পক্ষে ফার্স্ট ক্লাস খুব ভাল নয়। সে সেকেন্ড ক্লাসেই যাবে।
সারাটা দিন রেমি ফার্স্ট ক্লাস ওয়েটিং রুমে বসে বসে স্টেশন থেকে কেনা পত্রপত্রিকা আর বই পড়ল। খিদে পেলে খেয়ে এল রেস্টুরেন্ট থেকে। খুবই স্বাভাবিক আচরণ করে যাচ্ছিল সে। কিন্তু মনের মধ্যে সর্বদা এক উচাটন ভাব। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ধ্রুব সকালে হোটেলে ফিরবে এবং তাকে না পেয়ে ছুটে আসবে স্টেশনে। আসেনি।
বিকেল চারটে পর্যন্ত শক্ত ছিল রেমি। তারপর আর পারল না। কে জানে, ধ্রুব আদৌ ফিরেছে কি না! যদি কোনও বিপদ ঘটে থাকে তার?
স্টেশন থেকেই ডিরেকটারি দেখে হোটেলে ফোন করে রেমি।
দোতলার চোদ্দো নম্বর ঘরের মিস্টার চৌধুরী কি ফিরেছেন?
হ্যাঁ। অনেকক্ষণ। আপনি কি মিসেস চৌধুরী?
হ্যাঁ।
উনি কয়েকবার আপনার খোঁজ করেছিলেন। কোথায় গেছেন বলে যাননি তো!
না। হঠাৎ একটু বেরিয়ে পড়লাম।
কোথায় গিয়েছিলেন?
রেমি একটু ভেবে বলল, বেড়াতে। ওঁকে বলবেন, আমি আমার ফিরতে একটু দেরি হবে। চিন্তার কিছু নেই।
আচ্ছা।
রেমি নিশ্চিন্ত মনে এসে বসতে পারল ওয়েটিং রুমে। একটু ঘুমিয়েও নিল। সবচেয়ে গাঢ় ঘুম হল তার গাড়িতে। এক ঘুমে কলকাতা। ট্যাকসিতে উঠে সোজা চলে এল বাপের বাড়িতে।
সে এবং ধ্রুব যে কোথাও গিয়েছিল এবং কলকাতায় যে বেশ কয়েকদিন তারা ছিল না, এ খবরটা পর্যন্ত তার বাপের বাড়িতে পৌঁছোয়নি। ব্যাপারটা বিস্ময়কর। তবে তার শ্বশুর কৃষ্ণকান্ত বোধহয় পুত্র আর পুত্রবধূর এই আকস্মিক গৃহত্যাগের ঘটনাটা চাউড় করতে চাননি। দ্বিতীয় যে ঘটনাটা আরও চমকপ্রদ এবং দূরপ্রসারী সেটা বাপের বাড়িতে পা দিয়েই শুনল সে, কৃষ্ণকান্তর দফতর বদল হয়েছে। মোটামুটি গুরুত্বপূর্ণ এক দফতর থেকে তাকে সরিয়ে নিতান্তই একটা এলেবেলে দফতরে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। তা নিয়ে খুব একটা হই-চই হয়নি অবশ্য। কিন্তু গুজব হল, কৃষ্ণকান্তর দলের মধ্যে ফাটল দেখা দিয়েছে। ওঁকে হয়তো মন্ত্রিত্বই ছাড়তে হতে পারে।
খবরটা ভাল না মন্দ তা বুঝতে পারল না রেমি। আসলে খবরটা তাকে তেমন স্পর্শই করল না। তার নিজের জীবনে অনেক গুরুতর আর-একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে। ধ্রুবর সঙ্গে তার সম্পর্কের ইতি ঘটছে। সে তুলনায় কৃষ্ণকান্তর মন্ত্রিত্ব নিয়ে গণ্ডগোেল তেমন কোনও ঘটনাই নয়।
বিকেলের দিকে সে কয়েকবার ফোন করার পর শ্বশুরমশাইকে ধরতে পারল তাঁর দফতরে।
আমি রেমি বলছি।
কৃষ্ণকান্তর গলাটা একটু দুর্বল শোনাল, কে? বউমা! তোমাদের জন্য ভেবে ভেবে আমি–কোথায় গিয়েছিলে, মা?
পুরী। আপনার ছেলে এখনও ওখানেই আছে।
তুমি কি একা কলকাতায় চলে এসেছ?
হ্যাঁ।
একদম একা?
একদম একা কেন হবে! আমি সেকেন্ড ক্লাসে এসেছি, গাড়িতে অনেক লোক ছিল।
কৃষ্ণকান্ত একটু হাসলেন, তা তো থাকারই কথা। তবু মেয়েদের একা চলাফেরা করতে নেই। এ দেশটা এখনও ততদুর সভ্য নয়, বুঝলে! এখনও জঙ্গলের শাসন কায়েম আছে। তা একা আসতে হল কেন? সেই দামড়াটার সঙ্গে বুঝি ফের ঝগড়া!
না, ঠিক ঝগড়া নয়।
ঠিক আছে। পরে শুনব। আজ ফিরতে একটু রাত হবে হয়তো। জেগে থেকো। আমি আজই সব শুনব।
কিন্তু আমি তো কালীঘাটের বাড়িতে উঠিনি।
তবে কোথায় আছো? বাপের বাড়িতে নাকি?
হ্যাঁ।
গণ্ডগোলটা তাহলে বেশ গুরুচরণ, কী বলে?
আমি অন্য একটা অ্যারেঞ্জমেন্টের কথা ভাবছি।
কী অ্যারেঞ্জমেন্ট, মা?
ভাবছি কিছুদিন দূরে সরে থাকাটা দরকার।
তাতে কিছু লাভ হবে মনে করো?
কাছে থেকেও তো হচ্ছে না।
হচ্ছে না কে বলল? আমি তো দেখছি হচ্ছে। এই যে আমাকে অপদস্থ করতে বাড়ি থেকে দুম করে পালিয়ে গেল, কিন্তু তোমাকেও নিয়ে গেল সঙ্গে। এটা কি ওর উন্নতির লক্ষণ নয়?
আমরা ওভাবে চলে যাওয়াতে আপনি অসন্তুষ্ট হয়েছেন নিশ্চয়ই!
তা হয়েছিলাম। তবে পরে হাসিই পেয়েছিল। পুলিশ ওকে নিয়ে গিয়ে কিছু ইনটেরোগেশনের পর ছেড়ে দিত। সেটাই নিয়ম। কেন যে খামোকা নাটক করতে গেল! তবে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ায় দামড়াটা সম্পর্কে আমার একটু শ্রদ্ধাও হয়েছিল। এটা বুদ্ধির কাজ। কিন্তু তারপর কী হল, মা?
সব তো ফোনে বলা যায় না।
সে তো ঠিকই। দামড়াটা কি এখনও পুরীতেই আছে?
হ্যাঁ।
হোটেলের নামটা বলবে?
সি ভিউ।
ঠিক আছে। আমি দেখছি। তুমি তাহলে এখন বাপের বাড়িতেই থাকবে বলছ!
আপনি যদি অনুমতি দেন এবং রাগ না করেন।
ধ্রুবর জন্য তুমি যা করছ তা হয়তো ঠিকই করছ। কিন্তু মা, শুধু ধ্রুবই তো নয়, তোমার তো আমরাও আছি। দামড়াটাকে জব্দ করতে গিয়ে আমাদেরও জব্দ করা কি ঠিক?
রেমি বার দুই ঢোক গিলল। একটা আবেগ তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। কান্না আসছে। শ্বশুর কেমন মানুষ তা সে জানে না, কিন্তু এই লোকটার মধ্যে সে এক গভীর স্নেহ ও অগাধ প্রশ্রয় পেয়েছে। কিছুতেই এই মানুষটাকে সে নিজের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে না।
