রেমি ধরা-ধরা গলায় বলল, আমি কী করব তা বুঝতে পারছি না।
কৃষ্ণকান্ত একটু গম্ভীর গলায় বললেন, শোনো মা, ধ্রুবর বন্ধুরা তোমার বাপের বাড়িতে একটা অন্যায় হামলা চালিয়েছিল। তাতে বেয়াই বাড়িতে আমার মানসম্মান নষ্ট হয়েছে, বেয়াইমশাইয়েরও চূড়ান্ত অপমান হয়েছে। এটা তুমি নিশ্চয়ই বোঝো যে, ধ্রুব এ কাজ করেছে আমাকে আর বেয়াইমশাইকে অপ্রস্তুত করার জন্যই। অন্য কেউ হলে আমি আরও কঠিন ব্যবস্থা করতাম। কিন্তু সে আমার ছেলে বলেই বিচারের ভার নিজের হাতে না নিয়ে পুলিশের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। সেটা কি অন্যায় করেছি, বলো!
না, অন্যায় কেন হবে! ঠিকই করেছেন।
আমি জানি তুমি ওই দামড়াটাকে অসম্ভব ভালবাসো। অত ভালবাসা পাওয়ার যোগ্যতা ওর নেই। তাই ভাবছিলাম, বাপ হয়ে ছেলেকে পুলিশের হাতে দিচ্ছি বলে তুমি আমার ওপর আবার অসন্তুষ্ট না হও!
অসন্তুষ্ট হইনি তো!
হয়েছ মা, নইলে এতক্ষণ কথা বলছ অথচ একবারও আমাকে বাবা বলে ডাকোনি।
রেমি স্তব্ধ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। কৃষ্ণকান্তকে ইচ্ছে করেই আজ সে বাবা বলে ডাকছিল না। সম্পর্ক তো সে শেষ করতেই চলেছে। এখন কী বলবে! তার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় বেদনা বোধহয় প্রিয়জনকে অকারণ আঘাত করার বেদনা।
রেমি স্তব্ধতা ভেঙে বলল, ঠিক তা নয়, বাবা।
কৃষ্ণকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, অত কঠিন হোয়য়া না, মা। আমি নানা কারণে বড় জর্জরিত। কিছুটা বোধহয় শুনেও থাকবে। এর মধ্যে তুমিও যদি ওরকম হও তাহলে আমি কোথায় দাঁড়াই বলো তোর
রেমি জানে, কৃষ্ণকান্ত এত দুর্বল প্রকৃতির মানুষ নন। তবে তিনি মানুষকে পটাতে ওস্তাদ। তবু এই চিনি মাখানো কথায় রেমি জেনেশুনেও ভিজল। একটু হেসে বলল, আমি তো এখনও পাকাঁপাকিভাবে কিছু ঠিক করিনি, আপনি ওরকম ভাবছেন কেন?
না বলে ধ্রুবর সঙ্গে পুরী গেলে মা, তাতে কিছু মনে করিনি। কিন্তু এখন যেসব কথা বলছ তাতে ভয় পাচ্ছি।
আমি কি কালীঘাটের বাড়িতে চলে যাব, বাবা?
কৃষ্ণকান্ত একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, না, আজ থাক। কাল আমি গাড়ি পাঠিয়ে দেব। যদি তোমার মা বাবা অনুমতি করেন তাহলে চলে এসো। আজ বরং বিশ্রাম নাও।
আপনি যা বলবেন তাই করব, বাবা।
কোরো মা। আমি কাউকে খুব খারাপ পরামর্শ দিই না। তোমার স্বামী যদি আমার কথা ছিটেফোঁটাও শুনত তাহলে মানুষ হয়ে যেত।
রেমি আচমকাই বলে বসে, আপনি কেন ওর মুখোমুখি হয়ে জবাবদিহি করতে বলেন না!
আমি!–কৃষ্ণকান্ত যেন চমকে ওঠেন। তারপর স্তিমিত কণ্ঠে বলেন, আমি মাত্র একজনকেই দুনিয়ায় ভয় পাই, মা। তোমার স্বামীকে।
০৩৯. এত কলকব্জা কখনও দেখেনি সুবলভাই
এত কলকব্জা কখনও দেখেনি সুবলভাই। তার ছেলেবেলায় রেল পাতা হয়নি এদিকটায়। মোটরগাড়ি চলত না। স্টিমার ছিল না। কলের কাপড় বিলেত থেকে তখনও এত দূর এসে পৌঁছোয়নি। দিনেকালে এসব হল কী? তাজ্জব কাণ্ড সব। সুবলভাই যতবার খোকাবাবুদের সেডান গাড়িখানাকে লাল ধুলো উড়িয়ে রাস্তায় যাতায়াত করতে দেখে, ততবার সব কাজ ফেলে ছুটে আসে রাস্তায়। এই প্রায় নব্বই বছর বয়সে তার ভেতরটা আবার ছোট্ট ছেলের মতো আঁকুপাঁকু করে। তাজ্জব! তাজ্জব!
চৌধুরীবাড়ির এগারোজন মালির মধ্যে সুবলভাই একজন। ঠিক একজন তাকে বলা যায় না। বলতে গেলে সে হল হেড মালি। মাইনে পনেরো টাকা, খোরপোশ। শুরু করেছিল তিন টাকায়। তার চোখে ছানি পড়েনি। শরীরটা পুরোনো গাছের মতোই শক্তপোক্ত এবং গাঁটবহুল। চামড়ায় কিছু কুঞ্চন এবং পুরুভাব এলেও কাঠামোটা সোজা এবং সহজ। সুবলভাই এখনও চমৎকার মাটি কোপাতে পারে, আগাছা নিড়োয়। তার হাতে গাছ বাড়েও চমৎকার।
শ্যামকান্ত বলতেন, তুই বেটা, গাছের সঙ্গে কথা বলিস গাছের কথাও তুই বুঝতে পারিস। পারিস না?
সুবলভাইয়ের এটাও তাজ্জব লাগত। কথাটা ঠিকই। সে গাছের কথা বুঝতে পারে। গাছও তার কথা বোঝে। কিন্তু সেটা আর কারও জানার কথাই নয়। শ্যামকান্ত সেটা টের পেয়েছিলেন মেন করে?
আজকাল হর কমপাউন্ডারের সঙ্গে প্রায়ই তার প্রাণের কথা হয়। হর কমপাউন্ডার আজকাল জিন-পরি, ভূত-প্রেত নিয়ে কারবার করে। তার ওপর সুবলভাইয়ের অগাধ আস্থা। এই একটা জ্ঞানী লোক। যতদিন কমপাউন্ডারি করত ততদিন খুব চুপচাপ মানুষ ছিল হর। আজকাল তেমনি একটু বকবক করে। তবে কাউকে শোনানোর জন্য নয়। নিজেই বকে, নিজেই শোনে। সুবলভাইয়ের বিশ্বাস, হরনাথ আসলে একা-একা ভূতপ্রেতের সঙ্গেই কথাবার্তা বলে। যেমন সে সারাদিন বলে গাছপালার সঙ্গে।
ওই যে হরনাথ একটা কাঠচাঁপা গাছের ছায়ায় বসে একা বকবক করছে, সুবলভাই জানে হরনাথের এখন কথা চলছে কোনও আত্মার সঙ্গে। কোনও কুট বিষয় নিয়েই আলোচনা চলছে বোধহয়। হরনাথের কপালে তিনটে ভাঁজ।
দোলনচাঁপার গোড়া উসকে দিতে দিতে সুবলভাইয়ের একটু তামাক খেতে ইচ্ছে হল। এবারে গরমটা পড়েছে জব্বর।
কলকে সেজে নিয়ে সে এসে হরনাথের পাশে বসল জুত করে।
হর, কেমন বোঝো?
ভাল বুঝছি না।
হলটা কী?
দিনকাল ভাল যাচ্ছে না। এস্টেট লাটে উঠল বলে।
কিছু শুনেছ নাকি?
শুনেছি।
কী শুনেছ?
রাজেন মোক্তারের ছেলে কর্তাকে কী বলেছে জানো?
না। কী করে জানব?
বলেছে খরচ কমাতে।
তা কমাক না।
খরচ কমানোর জন্য কী করতে বলেছে জানো?
বলল শুনি।
বলেছে, যে সব অপোগকে বসিয়ে খাওয়াচ্ছেন সেগুলোকে ঝেঁটিয়ে তাড়ান।
