কাঁদতে কাঁদতেই রেমি উঠল। তার ব্যাগে কিছু টাকা আছে। ধ্রুবর সুটকেস খুলে একটু হাঁটকাতেই সে পেয়ে গেল বাহান্নখানা একশো টাকার নোটেব একটা নতুন তাড়া।
চোখের জল মুছে রেমি নিঃশব্দে তার শাড়ি-টাড়ি গুছিয়ে নিল ব্যাগে। কাজ শেষ করে ঘড়িতে দেখল, রাত দুটো।
ঘুম আসবে না। বাইরে ঝোড়ো বাতাসের আক্রোশ এখন অনেকটা কম। তবে অবিরল ঢেউ ভাঙার শব্দ আসছে। বাতি নেভাল না রেমি। ভয় করে। বাতি জ্বেলেই শুয়ে রইল বিছানায়।
ঘুমহীন দুচোখ ভরে ফের জল এল। এখন আর রাগ নেই। বুক জুড়ে এক অভিমানের সমুদ্র।
তোমাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারি না। তবু তোমার জন্যই তোমাকে ছেড়ে থাকতে হবে। চললাম।
অনুপস্থিত ধ্রুবর একটা অট্টহাসি শুনতে পায় রেমি। ধ্রুব যেন বলে, যাও। পৃথিবীতে কাউকেই আমার খুব একটা প্রয়োজন নেই।
রাগে দুঃখে দুহাত মুঠো করে রেমি বলে, কেন প্রয়োজন নেই?
কেন? মানুষে-মানুষে কোনও স্থায়ি সম্পর্ক নেই, আত্মীয়তা একটা সংস্কার মাত্র। আমি এই জীবনে তা বহুবার প্রত্যক্ষ করেছি। ওই যে আমার জন্মদাতা, উনি ঠিক কে বলো তো! বাবা বলে ভাবলে বাবা, কিন্তু যদি না ভাবি!
শুধু বাবার ওপর রাগ বলেই কি তোমার মনটা ওরকম হয়ে গেছে?
রাগ হলে তো বাঁচতাম। শুধু রাগ তো নয়।
তাহলে কী?
কী করে বলি! তবে ব্যাপারটা বুঝবার চেষ্টা করছি। আমার মা যখন মারা যায় রেমি, সেটা আমার চোখের সামনেই ঘটেছিল। আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, সবচেয়ে আপন, যার গায়ের গন্ধ, নাকের বাঁ পাশের আঁচিলটা সবই ছিল যেন আমার নিজস্ব ঐশ্বর্য, তাকে চোখের সামনে অঙ্গার হয়ে যেতে দেখে আমার সেই যে মোহভঙ্গ ঘটেছিল তা আর মন থেকে গেল না। হঠাৎ ঘরের ছাদ উড়ে গেলে মানুষের যেমন অসহায় লাগে, কিংবা কোনও অঙ্গ হঠাৎ দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে মানুষ যেরকম হতভম্ব হয়ে যায়, ঠিক তেমনই একটা বিস্ময়বোধ আমাকে আজও আচ্ছন্ন করে আছে। বাবা দেশোদ্ধার করে বেড়াচ্ছেন, ভাল কথা, কিন্তু আমার মায়ের অপরাধ কী তা আজও আমি জানি না। কেন তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হল? কেন তার নীরব ও নিরবচ্ছিন্ন ভারাক্রান্ত মনের দিকে কেউ তাকাল না?
শোক কি এত দীর্ঘস্থায়ি হয়?
না। প্রথমে শোক ছিল। কিন্তু বড় হতে হতে আমি বারবার ঘটনাটির বিচার ও বিশ্লেষণ করে দেখেছি। শোক থেকে উৎপন্ন হয়েছে এক ক্রোধা কৃষ্ণকান্ত চৌধুরীর সঙ্গে আমার বোঝাপড়াটা যতদিন না শেষ হয় ততদিন পৃথিবীর অন্যান্য ঘটনাবলী এবং মানুষ আমার কাছে অর্থহীন।
কীসের বোঝাপড়া? মানুষ তো ত্রুটিহীন নয়। সকলেরই কিছু না কিছু দোষ থাকেই। শ্বশুরমশাইকে তুমি কী করতে চাও?
ভয় পেয়োনা রেমি। আমি ওঁকে খুন করতে চাই না।
তাহলে?
আমি ওঁর দৃষ্টিভঙ্গিটা পালটে দিতে চাই।
সেটা আবার কীরকম?
লোকটা জীবনে সবই পেয়েছে। সামন্ততান্ত্রিক ব্যাকগ্রাউন্ড, স্বদেশিয়ানার ছাপ, সততা ও নিষ্ঠার খ্যাতি। হি ইজ এ বিগ ম্যান। আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমি লোকটাকে বিগ্রহের আসন থেকে টেনে ধুলোমাটির মধ্যে নামাতে চাই। যে উচ্চাকাঙ্ক্ষার নেশায় লোকটা চিরকাল কাছের লোকজনকে অবহেলা করেছে, তাদের সুখ দুঃখ মনোবেদনার দিকে তাকায়নি, সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমি একেবারে শেষ করে দিতে চাই। কিন্তু মুশকিল কী জানো? লোকটার অস্তিত্বটাই জড়িয়ে আছে ওই ভুল পলিটিকস আর ভুল দেশপ্রেমের সঙ্গে। ওগুলো কেড়ে নিলে লোকটা হয়তো বাঁচবেই না। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে লোকটাকে শোধরানোর মানে আসলে দাঁড়াবে লোকটাকে খুন করা। কিন্তু আমি নাচার।
তুমি শ্বশুরমশাইকে ভুলে যেতে পারো না?
কী করে সেটা সম্ভব?
ওঁর কথা ভেবো না। অন্য সব কিছু নিয়ে ব্যস্ত রাখো নিজেকে।
ভোলা সহজ নয়, রেমি।
চলো আমরা অন্য কোথাও গিয়ে ঘর বাঁধি।
লোকটার কাছ থেকে দূরে সরে গেলেই কি সব সমস্যার সমাধান হবে?
তা হলে কী করবে? একটা কিছু তো করতে হবে।
আমার ক্ষমতা কতটুকু, রেমি? কৃষ্ণকান্ত চৌধুরী আমাদের তিন ভাইয়ের দিকে কখনও মনোযোগ দেয়নি। স্বার্থপর লোকটা চিরকাল নিজের কেরিয়ার তৈরিতে ব্যস্ত ছিল। আমাদের মানুষ করে ভোলার জন্য যতটুকু করার ছিল তার কিছুই করেনি। দাদার মিলিটারিতে যাওয়ার কোনও ইচ্ছে ছিল না। কেবলমাত্র একটি ডানপিটে দুষ্ট ছেলেকে দূরে রাখার জন্যই তাকে দেরাদুন মিলিটারি আকাদেমিতে পাঠিয়ে দিয়েছিল তোমার শ্বশুর ছেলে যে সেই পর হয়ে গেল আর তাকে কোনওদিন কাছে ডাকল না। আমার তো মনে হয় কৃষ্ণকান্তকে জব্দ করতেই দাদা একজন মারাঠি ডিভোর্সি মেয়েকে বিয়ে করে বসেছে। প্রচণ্ড মদ খায়, র্যাশ লাইফ লিড করে। আমার ছোট ভাইকে তো দেখেছ? কোনওদিন মনে হয়েছে যে, এ বাড়ির ওপর তার টান আছে? নেই। কারণ তাকে ছোটবেলা থেকেই ঠিক ওরকম ভাবতে বাধ্য করা হয়েছে। দাদার মতো সেও একদিন এ বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কের শেষ সুতোর বাঁধনটাও ছিঁড়ে ফেলবে। শুধু আমি। আমার জন্যই কৃষ্ণকান্ত এখনও নিষ্কণ্টক নয়। সুতরাং ওই একটা কাঁটা তার জীবনে থাক, রেমি।
এসব কাল্পনিক সংলাপ অবশ্য পুরোটাই রেমির কল্পনা নয়। বিভিন্ন সময়ে ধ্রুবর সঙ্গে তার এসব কথাবার্তা হয়েছে।
ভোর পর্যন্ত রেমি আধো-ঘুম ও আধো-জাগরণে বহুবার ধ্রুবর কথা, শুধু ধ্রুবর কথাই ভাবল। কোনও দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবু সেটাকে সম্ভব বলে মনে হল না তার। মদ খেয়ে কোথাও পড়ে আছে? অসম্ভব নয়। তবে মদ খেয়ে ঘরে ফিরতেও যখন বাধা ছিল না, তখন না ফেরারই বা কী অর্থ? রেমির যেটা সম্ভব বলে মনে হয়, ধ্রুব ইচ্ছে করেই ফেরেনি। দুপুরে ধ্রুব বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখেছে, রেমি দুরন্ত সমুদ্রের জলে নামছে একা। বোধহয় সে ভেবেছে, রেমি আত্মহত্যার চেষ্টা করছে। এতে বোধহয় একটু আশান্বিতই হয়েছে ধ্রুব। আত্মহত্যার দিকে রেমিকে আর-একটু ঠেলেই দেওয়া যাক তাহলে! সেই কারণেই কি সারারাত নিজের ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে, নিজের ভূতের সঙ্গে লড়াই করতে তাকে ফেলে গেল ব? একটানা সারা রাত সে এই ঘরে একা। নানারকম দুশ্চিন্তা, অদ্ভুত সব বিকার, বিকট সব ভয় তাকে ঘেঁকে ধরছে। কিছু করার নেই। সে মেয়েমানুষ, যুবতী, চেঁচালে কেলেংকারি হবে।
