কৃষ্ণকান্ত জানে, এসব সত্য নয়। মনুপিসি এ বাড়ির আয়পয় দেখে, কখনও কোনও জিনিস জায়গা থেকে নড়চড় হয় না। তবু সে দাৱাবউদিকে কিছু বলেনি। কিন্তু দরকার হলে সে বলবে, যা সে শুনেছে তা আড়াল থেকে, তার সামনে কেউ কিছু বলেনি।
কৃষ্ণকান্ত রঙ্গময়ির কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলে, তোমার গায়ে সবসময় একটা শসা-শসা গন্ধ কেন, বলো তো!
শসার গন্ধ! দূর!–বলে রঙ্গময়ি তাড়াতাড়ি নিজের হাত আর শাড়িটা খুঁকে দেখে বলে, যাঃ, কী যে সব অদ্ভুত কথা বলিস!
কৃষ্ণকান্ত মাথা নেড়ে বলে, শসা বাতাসা এই সবের গন্ধ। আর চন্দনবাটা।
রঙ্গময়ি চোখ পাকিয়ে বলে, আজকাল খুব গন্ধের বাতিক হয়েছে, না?
বউদির গায়ে কীরকম গন্ধ জানো?
তোর বউদি বড়লোকের মেয়ে, বড়লোকের বউ, তার গায়ে আতরের গন্ধই হবে।
মোটেই না, বউদির গায়েও তোমার মতো শসা-শসা গন্ধ। সব মেয়ের গায়ের গন্ধই কি এরকম!
রঙ্গময়ি শ্বাস ফেলে বলে, পাগলা।
পরদিন সবাই বয়রায় শিকার করতে চলে গেল। সঙ্গে গেল জনা দুই চাকর আর একজন দাসী।
বজরাটা নিশ্চিত ঘাট ছেড়ে মাঝদরিয়া ধরে অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার পর রঙ্গময়ি ঠাকুরবাড়ির দালান থেকে নেমে এল। বয়ঃসন্ধির মেয়ের মতো তার বুক কাঁপছে। ঠোঁট গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।
তাড়াতাড়ি সে অন্দরমহলে ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে এল।
দক্ষিণের বারান্দায় হেমকান্ত চোখে চশমা এঁটে একটা বেতের টেবিলে বিস্তর কাগজপত্র বিছিয়ে বসে নিবিষ্টমনে কী দেখছেন।
রঙ্গময়ি সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে অপলক চোখে নীরবে দৃশ্যটা খানিকক্ষণ দেখল৷ কত দূরের মানুষ। দীর্ঘ বিরহের পর এখন এক চৌম্বক আকর্ষণ রঙ্গময়িকে ওই মানুষটির দিকে টানছে। কিন্তু সে জানে, বৃথা। মাঝখানে অসংখ্য অদৃশ্য বাধা।
রোজকার মতো নয়, আজ দীন ভিখারিনির মতো সংকুচিত পদক্ষেপে এগিয়ে গেল রঙ্গময়ি। চক্ষু নত। আঁচলে গা ভাল করে ঢাকা।
আচমকা রঙ্গময়িকে দেখে একটু যেন অপ্রতিভ হন হেমকান্ত। সহাস্যে বলেন, আরে মনু! এসো।
কেমন আছ?
ভালই। কয়েকদিন তোমাকে দেখিনি।
তাতে কী! কোনও অসুবিধে তো হয়নি।
না, তা নয়।–হেমকান্ত একটু দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ব্যাপার কী জানো! আমার বেশি লোক সহ্য হয় না।
ওমা! ও কী অলক্ষুনে কথা! লোক আবার কী? তোমারই ছেলে, বউ, নাতি-নাতনি।
হেমকান্ত হাসলেন, তোমাকেও কি সব ব্যাখ্যা করে বলতে হবে? তুমি কি জানো না, পৃথিবীতে আমার আপনার লোক খুব কমই আছে!
সে হিসেবে ধরলে কম কেন, আপনার লোক তোমার কেউ নেই।
হেমকান্ত কথাটা একটু ভাবলেন। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, তাই বোধহয়।
এত কাগজপত্র নিয়ে বসেছ যে! কী ব্যাপার?
হেমকান্ত একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সেটাই তো সমস্যা, মনু। এক সময়ে কাগজপত্র দেখতাম। তারপর সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত ছিলাম। জমিদারি লাটে উঠলে উঠুক, আমার একটা জীবন কেটে যাবে। ছেলেরা যদি বুঝে নিতে চায় তো নিজেদের গরজেই নেবে। কিন্তু তা আর এরা হতে দিচ্ছে কই?
কনক কিছু বলেছে বুঝি?
হ্যাঁ, ওরা ভাগ বুঝতে চায়।
ভাগ করে দেবে সম্পত্তি?
উপায় কী? এস্টেটের একটা এস্টিমেট করে দিয়েছে শচীন। দলিল-টলিল সব দেখছি।
ভাল। দেখো।
প্রস্তাবটা কি তোমার পছন্দ হল না?
আমার পছন্দ-অপছন্দে কী আসে যায়!
তোমার যায় আসে না জানি, কিন্তু আমার যায় আসে।
কেন? আমি তোমার কে?
হেমকান্ত হঠাৎ ভারী গভীর ও মায়াবী দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন রঙ্গময়ির দিকে।
রঙ্গময়ির পা থেকে মাথা অবধি বিদ্যুৎ খেলে যেতে লাগল। থরথর করে কাঁপছে তার অভ্যন্তরে। মাথা আবছা হয়ে যাচ্ছে। সে যে মরে যাবে আবেগে!
০৩৮. ঘর-বার করতে করতে
ঘর-বার করতে করতে কেমন পাগলের মতো হয়ে যাচ্ছিল রেমি। ধ্রুবর রাত করে বাড়ি ফেরা এমন কিছু ব্যাপার নয়। কিন্তু আজকাল, এবং বিশেষ করে পুরীর এই অদ্ভুত অ্যাডভেঞ্চারে আসার পর থেকে রেমির ধৈর্য কমে গেছে। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে ধ্রুব তার সঙ্গে ঘর করতে চায় না। বর কাছে তার কোনও মূল্য নেই। অথচ পালিয়ে আসার সময় ধ্রুব যখন তাকেও সঙ্গে এনেছিল তখন রেমি এক রোমহর্ষক আনন্দ বোধ করেছিল। মনে হল, ধ্রুবর বুঝি বরফ গলল।
না। তা তো নয়।
সমুদ্রে অচেনা ঢেউয়ের সঙ্গে যখন তার প্রথম চেনাজানা করিয়ে দিয়েছিল ধ্রুব তখনও রেমি এক অদ্ভুত নৈকট্যের স্বাদ পেয়েছিল। মাঝে মাঝে এত আপন, এত নিজের জন মনে হয় ধ্রুবকে, পরমুহূর্তেই ভাঙা পুতুলের মতো রেমিকে ছুড়ে ফেলে সে খেলা ভেঙে উঠে যায়। কিন্তু কোথায় যায়?
এত কাছে থেকে, এত ঘনিষ্ঠ মেলামেশার পরও কী করে একজন এত দূরের মানুষ থেকে যায়, তা রেমির অল্পবুদ্ধির মাথায় ঢোকে না।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে রেমি দেখল, হোটেলের সদর ফটক বন্ধ হয়ে গেল রাতের মতো। বন্ধ হয়ে গেল দরজা। ক্রমশ নিজ্ঝুম হয়ে এল চারধার। রেমি জানে, হোটেলের ম্যানেজারকে খবরটা জানানোর কোনও মানেই হয় না। কেউ কিছু করতে পারবে না।
অনেকক্ষণ অন্ধকার বালিয়াড়ির দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে রইল রেমি। দুর্যোগের দিন বলে কেউ কোথাও নেই। ধ্রুবরও থাকার কথা নয় ওখানে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পাগল-পাগল মাথা নিয়ে ঘরে এসে দোর দিল রেমি। তারপর কাঁদতে বসল।
একা হোটেলের ঘরে যুবতী বউকে ফেলে রেখে যে চলে যেতে পারে তাকে স্বামী হিসেবে স্বীকার করা উচিত নয় রেমির। তার উচিত জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নিয়ে ফেলা। ধ্রুব তাকে চায় না, তারও উচিত ধ্রুবকে না-চাওয়া।
