অবশ্য আজকাল হেমকান্ত কুঞ্জবনে আসছেন না, সময় পান না বোধহয়। রঙ্গময়ি তার আঁচল দিয়ে পাদানিটা ঝেড়ে দিল। এখানেই তো বসে এসে লোকটা।
কালবৈশাখীর কয়েকটা ঝাপটায় বাগানটা অনেক সতেজ হয়েছে। ফন ফন করছে উেঁকি শাকের জঙ্গল। লজ্জাবতী লতা বিছিয়ে আছে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে।
রঙ্গময়ি ঘোড়ার গাড়ির পাদানিতে একটু বসল। চারদিকে গাছগাছালির ঘেরাটোপ। এখানে বসে থাকলে বাইরে থেকে কারও বোঝার উপায় নেই। চারদিকে কাকের উত্তাল কাকা রব। বহু কাক।
রঙ্গময়ি কৌতূহলী হয়ে একবার আকাশের দিকে তাকাল। কাক উড়ছে। কোনও কাক মরলে বা চোট পেলে কাকেরা কোমর বেঁধে এসে বিলাপ করতে থাকে বটে। একটু তাকিয়ে থেকে রঙ্গময়ি ফের নিজের মধ্যে ড়ুবে গেল। শশিভূষণের কথা তার খুব মনে পড়ে। খুব। ঠিক ছোট ভাইটি। এরকম যদি কোনও ভাই থাকত তার তবে কত না ভাল হত। চারদিকে ছোট মনের, ছোট স্বার্থের মানুষজনের মধ্যে অহরহ বাস করতে করতে আচমকা এরকম হাওয়ায় ভেসে আসা বনফুলের গন্ধের মতো আশ্চর্য সৌরভযুক্ত মানুষকে পেলে জীবনটা অন্য রকম হয়ে যেতে চায়।
ওর ফাঁসি হবে!
রঙ্গময়ি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শশিভূষণকে বরিশাল জেলে চালান দেওয়া হয়েছে। মামলা উঠল বলে। সেই মামলায় শশিভূষণের পক্ষ নিতে শচীন যাচ্ছে। কী হবে কে জানে!
আনমনা রঙ্গময়ি চেয়ে ছিল এক দিকে। বাসক পাতার একটা ঝোপের আড়াল থেকে একটা বন্দুকের নল খুব ধীরে ধীরে একটা জামরুল গাছের দিকে উঁচু হয়ে উঠছিল।
রঙ্গময়ি চেঁচিয়ে উঠল, কে রে?
বন্দুকের নলটা চট করে নেমে গেল।
রঙ্গময়ি টপ করে উঠে এগিয়ে যেতেই ঝোপের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে কৃষ্ণ, পিসি!
রঙ্গময়ি অবাক হয়ে বলে, কী করছিস ওখানে?
হি হি, কাক মারছি।
কাক! এ মা!
কৃষ্ণ তার হাতের এয়ারগানটা দেখিয়ে বলে, এটা দিয়ে কিছু মারা যায় না কাক ছাড়া। একটা মেরেছি।
দে ওটা! দে!–রঙ্গময়ি হাত বাড়িয়ে চোখ পাকিয়ে বলে।
কেন?
কাক মারতে হবে না।
কৃষ্ণ কাঁচুমাচু মুখ করে বলে, কী করব তা হলে? প্র্যাকটিস করতে হবে না?
কীসের প্র্যাকটিস?
চাঁদমারি, হাত সেট করতে হবে। বউদির সঙ্গে কমপিটিশন।
বউদির সঙ্গে! বলিস কী রে?
আসল বন্দুক দিয়ে।
কীসের কমপিটিশনে?
কাল আমরা বয়রায় শিকার করতে যাচ্ছি।
আমরা বলতে কে কে?
আমি, বড়দা, বউদি। বউদি সব বন্দুক তেল দিয়ে পরিষ্কার করেছে।
রঙ্গময়ি গম্ভীর হতে গিয়েও হেসে ফেলল। বলল, কটা বন্দুক আছে তোদের?
এগারোটা। চারটে দোনলা। দুটো রাইফেল। তিনটে এক নলা, দুটো গাদা বন্দুক।
এত?
পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল।
রঙ্গময়ি অবিশ্বাস ভরে মাথা নেড়ে বলল, এতগুলো বন্দুক ছিল আমি তো জানতামই না।
আমিও না।
জানলে কবে স্বদেশিদের দিয়ে দেওয়া যেত!
স্বদেশিদের?
তারা ছাড়া আর কার বন্দুক দরকার? তোরা তো পাখি মারবি ফুর্তি করতে।
আর ওরা?
ওরা পেলে কাজের কাজ করত। আর কাক মারিস না। মারতে নেই।
কৃষ্ণ কাছে এসে বন্দুটা ঘোড়ার গাড়ির গায়ে ঠেস দিয়ে রেখে বলল, বউদির হাতে দারুণ টিপ, জানো?
গেছো মেয়ে বাবা! মেয়েছেলেরা বন্দুক চালায় জন্মে শুনিনি।
বউদির বাবা যে শিকারি।
সে আর জানি না!
বউদিকে গেছো মেয়ে বলবে না।
কৃষ্ণর গম্ভীর মুখ-চোখ দেখে হেসে ফেলে রঙ্গময়ি বলে, ঘাট হয়েছে বাপধন, আর বলব না। হারে, বউদিকে পেয়ে কি আমাদের ভুলে গেলি?
কৃষ্ণ একটু লাজুক হেসে বলে, না পিসি। তোমার কাছে আসার সময় পাচ্ছি না, বউদির সঙ্গে সারাদিন নানারকম প্ল্যান হচ্ছে তো!
কীসের প্ল্যান?
সে অনেক রকম। বেড়ানো, চড়ুইভাতি, জলসা, শিকার।
কোথায় বেড়াতে যাবি?
চাটগাঁ আর ঢাকা।
ও বাবা!
চাটগাঁ থেকে সমুদ্র দেখা যায়, জানো?
জানি। জলসা আবার কীসের রে?
জলসা কাকে বলে জানো না?
সে খুব জানি। গান-বাজনা হয়। কিন্তু তোদর বাড়িতে তো এসবের চল ছিল না।
এবার চল হবে। বউদি বলেছে, জলসায় বাবাও এসরাজ বাজাবে।
রঙ্গময়ি চোখ গোল গোল করে বলে, তোর বাবা বাজাবে? রাজি হয়েছে?
না। বউদি বলেছে তোমাকে দিয়ে বাবাকে বলাবে।
আমি? আমি কেন?— রঙ্গময়ির গলায় অকপট বিস্ময়।
তোমার কথা বাবা শোনে যে।
বউদি তাই বলল বুঝি?
তুমি বলবে না বাবাকে?
রঙ্গময়ি কৃষ্ণর দিকে চেয়ে আবার হেসে ফেলে। তারপর বলে, তোর বাবা সকলের সামনে বসে এসরাজ বাজাচ্ছে এ তো ভাবাই যায় না। তোরাই বলিস। আমি ওসব বলতে পারব না, তা হলে বাড়ি থেকে তাড়াবে।
ইস, তোমাকে তাড়ালেই হবে! বউদি বলে, এ বাড়ির আসল কর্ত্রী হলে তুমি।
বলে? কেমন বিবশ-অবশ লাগছিল রঙ্গময়ির। তার আড়ালে তাকে নিয়ে কথা হচ্ছে। না, কলঙ্ককে আর ভয় নেই রঙ্গময়ির। তবে তার অন্য আর-এক ধরনের ভয় দেখা দিচ্ছে। হেমকান্ত যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন কিছু হবে না, কিন্তু হেমকান্ত যখন ইহলোকে থাকবেন না তখন বোধহয় এ বাড়ি থেকে সপরিবারে বিনোদচন্দ্রের উচ্ছেদ আটকানো যাবে না।
রঙ্গময়ি ধরা গলায় বলল, না, আমি কী হতে যাব কেন? পরগাছারা কখনও কি কর্ত্রী হয়?
কৃষ্ণকান্ত রঙ্গময়ির এই ভাবান্তর লক্ষ করে। খুবই বুদ্ধিমান ছেলে। পিসির সঙ্গে যে তার রক্তের সম্পর্ক নেই এবং এরা যে এ বাড়ির কর্মচারী মাত্র তা বড় হয়ে সে বুঝেছে। কিন্তু কোনও মানুষকেই তার খুব পর বলে মনে হয় না। তবে দাদা বা বউদি কেউই এদের খুব পছন্দ করে না। এ সম্পর্কে দাদা আর বউদির কিছু কথা তার কানে এসেছে। কথাগুলো ভাল নয়। বউদির ধারণা, মনুপিসি তার মায়ের অনেক গয়নাগাঁটি চুরি করেছে। দাদার সন্দেহ, তার বাবাই মনুপিসিকে গয়না বা টাকা পয়সা দেন।
