তিন দিন হেমকান্তর সঙ্গে রঙ্গময়ির দেখা হয়নি। মানুষটা কেমন আছে কে জানে! লোকজনের কাছে অবশ্য সে সব খবরই পায়। কৃষ্ণ আসে, চাকরবাকররা আসে। শরীর নিশ্চয়ই ভাল। কিন্তু হেমকান্তর শরীর ভাল থাকলেই যে রঙ্গময়ির চিন্তা ঘুচল তা তো নয়। হেমকান্তর অতি স্পর্শকাতর মনটিই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। সে কথা হেমকান্ত পাঁচজনকে বলতেও পারেন না। একা-একা এক অন্ধকূপের মধ্যে তলিয়ে যান। তখন হয়তো পৃথিবীর আর-কোনও আত্মজন বা সুহৃদকে নয়, রঙ্গময়িকেই মনে পড়ে তার। সব কথা নয়, কিন্তু মাঝে মাঝে কোনও কোনও হৃদয়বেদনার কথা হেমকান্ত বলেন মাত্র রঙ্গময়িকেই।
দাদা লক্ষ্মীকান্ত সকালে পুজো করে যাওয়ার পর রঙ্গময়ি এসে চুপ করে ঠাকুরবাড়ির দালানের সিঁড়িতে বসে ছিল। এখান থেকে হেমকান্তদের বাড়িটা গাছপালা সমেত অনেকটাই দেখা যায়। কারা এল আর কারা গেল তা সবটাই নজরে পড়ে। ঠাকুরবাড়ির এই দরদালানে বসেই কনকপ্রভা এককালে কুটিল চক্ষুতে এ বাড়িতে লোকের গতায়াত নজরে রাখত, আর জটিল মন দিয়ে তার নানারকম বিশ্লেষণ করত। বালবিধবাদের মানসিকতা যে জটিল ও কুটিল হয় তা অভিজ্ঞতা বলে জানে রঙ্গময়ি। বিশেষ করে যারা বাপের বাড়িতে অনাদর আশ্রয়ে জীবন কাটায়। কনকপ্রভা সেইরকমই একজন। তবে আজকাল হেমকান্তদের পবিবারের লোক কমে যাওয়ায় তেমন ঘটনা কিছুই ঘটে না। কনকপ্রভা তাই তার ক্ষেত্র বিস্তার করেছে বাইরের সমাজ-সংসারে। রঙ্গময়ি ভাবে, বালবিধবা আর চিরকুমারীদের মানসিকতা একইরকম নয় তো! সেও কি আরও বুড়ো বয়সে ওরকম হয়ে উঠবে? বড় ভয় করে।
দালানের সিঁড়িতে বসে জমিদার বাড়িতে নানা মানুষের যাতায়াত লক্ষ করতে করতে রঙ্গময়ি নিজের মনেই একটু হাসল। না, সে বিশেষ কাউকে লক্ষ করে না। কোনও ঘটনা আঁচ করার চেষ্টা করে না। সে চাতকিনীর মতো বসে আছে বটে, এক বুক পিপাসাও তার আছে। কিন্তু সে শুধু হেমকান্তর জন্য। লোকটা কেমন আছে? তার মন!
কারও ভালমন্দর জন্য এত গভীর পিপাসা হেমকান্তর নেই, জানে রঙ্গময়ি। সে জানে, হেমকান্তর সাধ্যই নেই রঙ্গময়ির ভালবাসার ঋণ শোধ করে। কিন্তু রঙ্গময়ি তো অতটা আশাই করতে পারে না। তাই চায়নি কোনওদিন।
আজ ঠাকুরবাড়ির দালানে বসে থেকে রঙ্গময়ি বুঝতে পারে, দুটো দিনও মানুষটাকে একবার চোখের দেখা দেখতে না পাওয়ার শূন্যতা কতখানি। ভালই আছে, ছেলে এসেছে, বউ এসেছে, নাতি-নাতনি নিয়ে জমজমাট বাড়ি। ভাল না থাকার কথা তো নয়। তবু সামনে পেলে রঙ্গময়ি শুধু একবার জিজ্ঞেস করবে, কেমন আছ? সে বলবে, ভাল। রঙ্গময়ি শুধু তার মুখের ডৌল ও রেখাগুলি লক্ষ করবে, চোখের দৃষ্টি কেমন তা পরখ করবে। তার যদি মনে হয়, তবে ভাল। যদি মনে হয়, না ভাল নয়, তবে প্রশ্ন করবে, লুকোচ্ছ না তো!
রঙ্গময়িকে কোনওদিনই কঁকি দিতে পারেননি হেমকান্ত। যে এত ভালবাসে তাকে কি ফাঁকি। দেওয়া যায়?
কৃষ্ণর এখন গরমের ছুটি। একটু আগে মাস্টার পড়িয়ে গেল। রঙ্গময়ি অপেক্ষা করছে। এ সময়টায় কৃষ্ণ তার ছোট্ট ঘোড়ায় চেপে এক-আধদিন বেরোয়। দেখা পেলে কৃষ্ণকে তার বাবার কথা জিজ্ঞেস করত একটু।
কিন্তু কৃষ্ণ বেরোল না। রঙ্গময়ি শুনেছে, বউদি চপলার সঙ্গে তার ভারী ভাব হয়েছে। সারাদিন বউদির সঙ্গে সঙ্গে ঘুরঘুর করে। ভাল। খুব ভাল। কৃষ্ণর মা নেই, বউদির মধ্যে যদি মাকে খুঁজে পায়!
রঙ্গময়িদের বাসস্থান মন্দিরের উত্তর দিকটায়। কয়েকটা কামরাঙা আর করমচা গাছের ছায়ায় শ্যাওলায় সবুজ খানিকটা মাটি। অল্প ঘাস। পুরনো পচা দরমার বেড়া ভেঙে পড়ছে। তার আড়ালে। গোটা তিনেক কুঠুরি। অন্ধকার, ঘুপসি, হতশ্রী চেহারা। সেইদিক থেকে বিনোদচন্দ্র লাঠি ঠুকঠুক করতে করতে বেরিয়ে আসেন। এই গরমেও গায়ে একটা চাদর জড়ানো। রোগে ভুগে ইদানীং বিনোদচন্দ্র বড় রোগা হয়ে গেছেন। স্থায়ি কফের দোষ। হাঁপানির টানও আছে। রোগা শরীর বলেই বোধহয় হাওয়া বাতাস, ঠান্ডা জল কিছুই সহ্য হয় না। পায়ে বৌলওলা খড়ম। একবার রঙ্গময়ির দিকে তাকালেন, অক্ষম বাপের যেভাবে অনূঢ়া বয়স্কা কন্যার দিকে তাকানো উচিত সেইরকম
অপরাধী চোখে।
বাপের জন্য রঙ্গময়ির তেমন কোনও মমতা নেই। লোকটা লোভী, কিছু পরিমাণে অসৎ, ধর্মের ব্যাবসা এবং দারিদ্র্য এই দুই-ই তার চরিত্রকে নষ্ট করেছে।
রঙ্গময়ি চোখ ফিরিয়ে নিল।
বিনোদচন্দ্র কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন, লাঠির ডগা দিয়ে রাস্তা থেকে কিছু একটা সরিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন। এ বাড়িতে আর পুরোহিতের তেমন দরকার নেই। হেমকান্ত ঠাকুরবাড়িতে আসেন না। তেমন আঁকজমকের পুজোপার্বণও কিছু হয় না। বিনোদচন্দ্র এখন খুবই অবহেলিত এক ব্যক্তি। তাকে কোনও প্রয়োজন নেই এ বাড়ির, তবু পুষতে হচ্ছে।
রঙ্গময়ি উঠল। তাদের গোরুটাকে কাছারির পিছনের মাঠে খোঁটায় বেঁধে রাখা হয়েছে। এই গরমে রোদে চরতে চরতে জলতেষ্টা পেয়েছে বোধহয়। ডাকছে।
রঙ্গময়ি একটা আধলা ইট দিয়ে খোঁটটা নড়িয়ে টেনে তুলল। গোরুটা টেনে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। ছেড়ে দিলেই সোজা গোয়ালে গিয়ে গামলায় মুখ দেবে। রঙ্গময়ি গোরুটাকে ছেড়ে পায়ে পায়ে হেমকান্তর কুঞ্জবনে ঢুকল।
ভাঙা ঘোড়ার গাড়িটা পড়ে আছে আগাছার জঙ্গলে। এই গরমে সাপখোপ বেরিয়ে এসে বাসা বাঁধতে পারে ভিতরে। হেমকান্তকে বলবে একটু দেখেশুনে যেন বসে এসে।
