আমাকে কি আপনার তাই মনে হয়?
একটু-একটু হচ্ছে। এবার গল্পটা বলুন।
গল্প কিছু নেই। একদম বাজে ব্যাপার। গঅরুণ ছিল খুব সিনেমার পোকা। সিনেমা দেখতে দেখতে ওর কাছে লাইফটা একটা স্বপ্নের মতো হয়ে গেল। ও ভাবত সিনেমায় যেমন হয় জীবনটাও সেরকইম। রিয়াল লাইফেও ওরকমই সব ঘটনা ঘটে। হিন্দি সিনেমা তো জানেন, সাধারণ মানুষকে খুশি রাখার একটা কৌশল। ও সেইসব ছবি দেখে সেরকমই সব কাণ্ড ঘটাতে লাগল।
সেটা কী রকম?
যেমন ধরুন ড়ুয়েট গান। নায়ক নায়িকাকে দেখে গান ধরে ফেলল, নায়িকাও গলা মিলিয়ে দিল। অরুণ সেরকমই সব করতে লাগল। রাস্তায় একটা সুন্দরী মেয়ে যাচ্ছে, ও তার পিছু নিয়ে গান ধরল। বা হিন্দি সিনেমার নায়কের মতো যেখানে সেখানে মারপিট লাগাল। এইরকম সব আর কী! হিন্দি সিনেমা ওকে একদম হিপনোটাইজ করে ফেলেছিল। মনে মনে নিজেকে সেইসব ছবির নায়ক ভেবে নিয়ে সব পোশাক করতে থাকে, চুলের কায়দা পালটে ফেলে। সব সময়ে হিন্দি ছবির মুখস্থ করা ডায়ালগ দিয়ে আমাদের সঙ্গে কথাবার্তা চালাত। এইরকম হতে হতে মাথা খারাপ হয়ে গেল একদম।
এখন কীরকম?
ভাল নয়। এখনও ঘোরটা কাটেনি। ইন ফ্যাক্ট আজ আপনাকে সমুদ্রে নামতে ও-ই প্রথম দেখে। জানালার ধারে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠে বলল, মনো, একটা মেয়ে ড়ুবে যাচ্ছে! শি ইজ ট্রায়িং টু কমিট সুইসাইড। এই বলে দরজা খুলে দৌড়ে আসার চেষ্টা করে। আমি জোর করে ওকে ঘরে ভরে দিয়ে দরজায় তালা লাগিয়ে ছুটে যাই আপনার কাছে।
রেমি একটু শিউরে উঠল। তবে মুখে বলল, ওকেই কাজটা করতে দিলেন না কেন?
কেন?— বলে মনো একটু হাসল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, কাজটা ঠিক হত না বউদি। ও তো সুস্থ নয়, হয়তো হিরো বনবার জন্য জলে নেমে আর উঠতে পারত না। দ্বিতীয় আর-একটা কারণ হল, আপনাকে যদি উদ্ধার করতে পারত তা হলে নির্ঘাৎ একটা প্রেমের সিচুয়েশন ক্রিয়েট করত।
রেমি হেসে ফেলল, তাই নাকি?
মনো ম্লান মুখে বলল, হাসছেন! জানেন না তো, কতবার ও এইসব কাণ্ড করে মারধর খেয়েছে, অপমানিত হয়েছে। লোকে তো সবসময়ে পাগল বলে ছেড়ে দেয় না। তাই সব সময় গার্ড দিয়ে রাখতে হয়। কখন যে কী করে বসবে তার ঠিক নেই। ইমাজিনেশন আর রিয়ালিটি একদম গুলিয়ে ফেলেছে।
তা হলে আপনি ওর সঙ্গে এক ঘরে আছেন কী করে?
মনো ম্লান মুখে বলল, খুব রিসক নিয়েই আছি। পরশু গভীর রাতে আমার বুকের ওপর উঠে বসেছিল মারবে বলে। ওর ধারণা হয়েছিল, আমি একজন ভিলেন।
ও বাবা! তারপর?
অনেকক্ষণ বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ঠান্ডা করতে হয়েছিল।
আপনার ভয় করে না?
না। খুব বন্ধু ছিলাম আমরা। তাই তেমন ভয়ের কিছু নেই। অরুণ ছেলেটা তো খারাপ ছিল না। আমরা সবাই অল্পবিস্তর ওই ধরনের স্বপ্নরোগে ভুগি।
তাই নাকি? আপনিও খুব সিনেমা দেখেন বুঝি?
না। তবে শুধু সিনেমা কেন বউদি? আমাদের চারদিকে একটা দৈন্যের চেহারা যেমন আছে, তেমনি ঐশ্বর্যেরও তো স্রোত বইছে। আমরা যারা বড়লোক নই তাদের তো স্বপ্ন দেখা ছাড়া আর কোনও গতি নেই। আর এ ব্যাপারে বাঙালিরা তো চ্যাম্পিয়ন।
রেমি একটু হাসল। কিন্তু একটু ভাবলও। স্বপ্ন! স্বপ্ন ছাড়া মানুষের আর কীই বা আছে!
মনো বিশ্বাস চা শেষ করে যখন উঠল এবং বিদায় চাইল তখন অন্যমনস্ক রেমি তাকে বাধা দিল। তার একটা কবিতা লিখতে ইচ্ছে করছিল। কবিতাটার নাম হবে স্বপ্নের পাগল।
কবিতাটা শেষ হল রাত দশটা নাগাদ। আশ্চর্য! ধ্রুব ফেরেনি।
রেমি ঘড়ির দিকে চেয়ে থেকে উঠল। এত দেরি তো পুরীতে এসে কখনও করেনি ধ্রুব!
০৩৭. চপলা বাড়িতে পা দেওয়ার পর
চপলা বাড়িতে পা দেওয়ার পর থেকে রঙ্গময়ি পারতপক্ষে ভিতর বাড়িতে আসে না। রোজ সকালে হেমকান্তকে একবার দেখা দিয়ে যেত, তাও এখন বন্ধ। কলঙ্কের আর কোনও ভয় নেই রঙ্গময়ির। এ জীবনে সেটা যথেষ্ট হয়েছে। এমনও নয় যে, চপলা তাকে দেখলে অসন্তুষ্ট হবে বা অপমান করবে, তবু যে আসে না, তার কারণ কনককান্তি।
কনক তার চেয়ে বয়সে খুব একটা ছোট নয়। মেরে কেটে দু-এক বছর। এক সময়ে কনককে সে কোলেপিঠে করেছে। বড় হয়ে একসঙ্গে খেলেছেও। কিন্তু একটু বড় হওয়ার পর যখন বুঝসমঝ হল তখন থেকেই কনককান্তি তাকে একদম পছন্দ করে না। সম্ভবত নলিনীকান্ত এবং পরবর্তীকালে হেমকান্তর সঙ্গে তাকে জড়িয়ে যেসব কথা রটেছে তার জন্যই। কনককান্তি কলেজে পড়ার সময় রঙ্গময়িকে তার পুরো পরিবার সমেত এ বাড়ি থেকে উচ্ছেদের জন্য চেষ্টা করেছিল খুব। তাতে কাজ হয়নি বটে, কিন্তু কনককান্তি সেই থেকে তাদের প্রতি এক তীব্র ঘৃণা ও রাগ পোষণ করে আসছে। এটা রঙ্গময়ি টের পায়।
কনককান্তিকে ভয় পাবে রঙ্গময়ি তেমন মেয়ে নয়। সে শুধু হেমকান্তকে কোনও অপ্রতিভ অবস্থায় ফেলতে চায় না। হেমকান্ত দুর্বল প্রকৃতির মানুষ, তার মন নরম ও ভরা, অবাস্তবতায় কোনও সংকট, বিবাদ, বিতর্ক বাঁধলে হেমকান্ত ভারী মুশকিলে পড়ে যান। রঙ্গময়ি মানুষটাকে সেই অবস্থায় ফেলতে চায় না।
অনেকদিন আগে নলিনীকান্ত তাকে একটা ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলেছিল। বলেছিল, যে দুর্বল প্রকৃতির মানুষটি তার প্রিয় তাকে যেন সর্বদা বিপদ-আপদ থেকে সে বাঁচিয়ে চলে। অনেকটা এ ধরনেরই কথা। তখন ঠিক বুঝতে পারেনি রঙ্গময়ি। সেই ভয়াবহ রাত্রে তার মাথার ঠিক ছিল না। পরে ধীরে ধীরে অনেক দিন ধরে চিন্তা করে সে বুঝেছে, কথাটা তাকে আর হেমকান্তকে জড়িয়েই বলা। অথচ নলিনীকান্তর জানার কথাই নয়, তার হৃদয়ের গভীর প্রদেশে কোন গাছে সে জলসিঞ্চন করছে। বাইরে কোনও প্রকাশ তো ছিল না রঙ্গময়ির!
