কথাটা শুনে রেমির একটু দুঃখ লাগছিল। মাথা নেড়ে বলল, অনেক প্রবলেম আপনাদের, না?
মনো মাথা নেড়ে হেসে উঠে বলল, আরে না, প্রবলেম আমাদের হবে কেন? প্রবলেম আপনাদের, যারা বাঙালি বাঙালি করে কেবল গলা শুকোয়। আমরা যাবা বাইরে জন্মেছি তাদের মধ্যে অত প্রভিন্সিয়ালিজম নেই। আমার দুই দিদির বিয়ে হয়েছে মধ্যপ্রদেশ আর মহারাষ্ট্রের পাত্রের সঙ্গে। আমার দাদা বিয়ে করেছে এক দিল্লিওয়ালি সর্দারনিকে। উই হ্যাভ নো প্রবলেম।
তার মানে কী? হ্যাং উইথ বেংগলিজ?
মনো বিশ্বাস খুব হাসল। বলল, অতটা নয়। নো বিটার ফিলিং। একজন বাঙালি যদি এখনও নোবেল প্রাইজ পায় বা ওলিম্পিক থেকে সোনার মেডেল নিয়ে আসে তা হলে অ্যাজ এ বেঙ্গলি আমি প্রাউড ফিল করব। তা বলে প্রভিন্সিয়ালিজম আমাদের নেই।
বাঙালিদের খুব প্রভিন্সিয়ালিজম আছে বুঝি?
মনো বিশ্বাস ঠোঁট উলটে বলে, কে জানে কী বউদি। তবে আমার সঙ্গে কয়েকজন ওরিজিন্যাল বাঙালির পরিচয় হয়েছে, এক্সপেরিয়েন্সটা খুব সুখের হয়নি।
রেমি মৃদুস্বরে বলল, সেটা আপনার অভিজ্ঞতা। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা অন্যরকম।
সেটা কীরকম বউদি?–মনো নড়েচড়ে বসল। সকৌতুকে তাকাল রেমির দিকে।
রেমি তার শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গ করে রাজনীতি একটু বুঝতে শিখেছে। সে বলল, কলকাতা বাঙালির শহর নয়। সেখানে কোনও বাঙালি-অবাঙালি ফিলিং নেই। তা ছাড়া বাঙালি-অবাঙালিতে মারপিটও পশ্চিমবঙ্গে হয় না।
মনো মাথা নেড়ে বলে, আরে মারপিটের কথা বলিনি। আমি বলছি যেটা তা অন্য জিনিস। বাঙালিরা আর ভেরি মাচ প্রাউড অফ দেমসেলভস।
রেমি মাথা নেড়ে বলে, সেটা স্বাজাত্যাভিমান।
ওই হল।
রেমি বলল, না, হল না। আপনার রিডিং ঠিক নয়। আমাদের অনেক দোষ আছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের প্রবলেম অনেক। আফটার পার্টিশন দেশটার অবস্থা কী তা কখনও খোঁজ করেছেন? আপনি কি জানেন আমাদের স্টেটের বিগ বিজনেস আর বিগ ইন্ডাষ্ট্রি কোনওটাই বাঙালিদের হাতে নেই? কলকাতায় যে কটা স্কাইস্ক্র্যাপার আছে তার ওনারশিপ বেশিরভাগই নন-বেঙ্গলির।
দোষটা কার বউদি?
আমাদেরই। বলছিই তো, এসব আমাদের দোষ। শুধু ভাষা আর কালচার নিয়ে আমাদের একটু অহংকার আছে। কোনও বাঙালি যদি সেটুকুও হারিয়ে বসে থাকে তবে আমরা দুঃখ পাই। সেটা প্রভিন্সিয়ালিজম হতে যাবে কেন?
না, আপনি ওরিজিন্যাল বাঙালিদের মতোই কথা বলছেন। তবে অ্যাগ্রেসিভ নন।
রেমি একটু হাসল।
মনো বিশ্বাস হঠাৎ প্রসঙ্গ পালটাল। গলাটা খাটো করে বলল, একটা কথার ঠিকঠাক জবাব দেবেন?
বলুন না।
আজ আপনি যখন জলে নামলেন, আমি আমার হোটেলের বারান্দা থেকে দেখছিলাম। মনে হল, ইট ইজ অ্যান অ্যাটেম্পট ফর সুইসাইড। অ্যাম আই কারেক্ট?
রেমির বুকের মধ্যে একটা তোলপাড় দেখা দিল। কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারল না। তারপর বলল, যাঃ।
আমি একটু বোকা আছি, বউদি। যা মনে আসে বলে ফেলি। কিছু মনে করবেন না। কথাটা এখনও বলতাম না। কিন্তু আপনাকে দেখে কেন যেন আনহ্যাপি মনে হচ্ছে।
রেমি রাগ করতে পারত। কিন্তু এ ছেলেটি একদমই সরল এবং বোধহয় একটু বোকাও। মনের কথা চেপে রাখতে জানে না। তাই রেমি একটু হেসে বলল, মেয়েদের মনের খবর পাওয়া অত সহজ নয় ভাই। সমুদ্রে আমি নেমেছিলাম অ্যাডভেঞ্চারের জন্য।
তা হলে বলতে হয় আপনি দারুণ সাহসী।
তাও নয়। হঠাৎ মাথায় ভূত চাপে না মাঝে মাঝে? সেরকমই।
যাক, ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল।
রেমি টুক করে অন্য একটা প্রসঙ্গে চলে গেল, আপনি কি পুরীতে একা এসেছেন?
ঠিক একা নয়। সঙ্গে একজন বন্ধু আছে। তবে সে পাগল।
পাগল!–রেমি অবাক হয়ে বলে, সত্যি পাগল?
হ্যাঁ। আগে ছিল না। এখন হয়েছে। তাকে সঙ্গ দিতেই আসা।
সেও কি বাঙালি?
না। মধ্যপ্রদেশের ছেলে।
পাগল হল কী করে?
সে অনেক ব্যাপার বউদি। আর-একদিন শুনবেন। আজ বরং আমি উঠি।
আরে! চা খাবেন না?
চা? থাক গে। ও আমার না হলেও চলবে।
আরে বসুন, আপনি গেলেই আমি একা হয়ে পড়ব। চা খেতে খেতে সেই বন্ধুর কথা বলুন। আমি পাগলদের গল্প শুনতে খুব ভালবাসি।
মনো বিশ্বাস একটু হাসল, বলল, শোনার মতো গল্প নয়। বাজে ব্যাপার।
অশ্লীল কিছু নয় তো!
না, তা নয়।
তা হলে বসুন, চা বলে আসি।
রেমি খুব দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে তড় তড় করে নীচে নেমে এল। সিঁড়ির গোড়ায় সে একটু থমকে দাঁড়ায়। বস্তুত মনো বিশ্বাসের সঙ্গে বক বক করা বা ওর বকবকানি শোনার কোনও ইচ্ছাই তার হচ্ছিল না। বরং এ সময়ে একা বসে নিজের অভ্যন্তরের ক্ষতগুলির কথা ভাবতে তার ইচ্ছে। হচ্ছে। কিন্তু ধ্রুব সঙ্গে তাকে তো কোনও না কোনওভাবে পাল্লা দিতে হবে! এই ছেলেটিকে বসিয়ে রেখে অত্যন্ত অভদ্রভাবে ধ্রুব বেরিয়ে গেছে। তাকে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে যে, সে পরোয়া করে না। বেশ, ধ্রুবর সেই ছুড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ সে লুফে নেবে। সম্ভব হলে এই ছেলেটির সঙ্গে অনেক রাত অবধি সে গল্প করবে, সমুদ্রের ধারে বেড়াবে। আজ, কাল, পরশু, রোজ। দেখা যাক কী হয়।
বেয়ারার পিছু পিছুই উঠে এল রেমি। তারপর মুখোমুখি বসে মনোকে বলল, এবার বলুন।
কী বলব? আমার পাগল বন্ধুর কথা?
হ্যাঁ।
বউদি, কিছু মনে করবেন না, আপনিও একটু পাগলি আছেন কিন্তু।
রেমি ভ্রু কুঁচকে চেয়ে বলল, নিজের ঘরের লোকের কাছে দিনরাত ওই কথা শুনছি।
তা হলে কথাটা ঠিক?
পাগল তো সবাই।–বলে রেমি মুচকি হাসল।
