ধ্রুব যে পাগল সে বিষয়ে রেমির বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। সেই পাগলামিকে সে নিজেও খানিকটা প্রশ্রয় দেয়। তবে সে এ-ও জানে যে, ধ্রুব পাগল হলেও সন্দেহ-পিশাচ নয়। রেমি যদি অন্য কোনও পুরুষের সঙ্গে প্রেম করে তাতে ধ্রুব উত্তেজিত হবে বা রেগে যাবে বলে রেমির মনে হয় না। ততটা ভালবাসে কি তাকে ধ্রুব? ততটা নিজের জিনিস বলে মনে করে কি তাকে?
এই ছোকরাকে ঘরে ডেকে এনে তার সঙ্গে ভিড়িয়ে দেওয়ার যে ছেলেমানুষি চেষ্টা ধ্রুব করছে সেটা রেমির কাছে আরও অপমানকর। ধ্রুব চায় রেমি তাকে ছেড়ে অন্য দিকে কিছুক্ষণ মন দিক। নইলে সত্যি বলতে কী, এই ছেলেটার কাছে ঘটা করে কৃতজ্ঞতা জানানোর কিছু নেই। রেমিকে তো এ সমুদ্রের ভিতর থেকে উদ্ধার করেনি, আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকেও বাঁচায়নি। শুধু ঢেউ যেখানে তাকে ছুড়ে ফেলেছিল সেখান থেকে নিরাপদ দূরত্বে টেনে এনেছে। না আনলে বিপদ হতে পারত, নাও হতে পারত।
ছেলেটা কিছু অপ্রতিভ ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকল। মুখে হাসি। হেঁ হেঁ ভাব। তার অলক্ষে রেমি কিছু কঠোর চোখে ধ্রুবর দিকে চাইল।
ধ্রুব ত্রুক্ষেপ না করে বলল, এ হচ্ছে মনো বিশ্বাস। নাগপুরের বাঙালি। বুঝলে! ব্রিলিয়ান্ট বয়। ইন ফ্যাক্ট আমি প্রবাসী বাঙালিদেরই বেশি প্রেফার করি। বাঙালিদের ইনহেরেন্ট কতগুলো দোষ এদের থাকে না।
প্রগলভ ধ্রুবর মতলবটা আন্দাজ করার অক্ষম একটা চেষ্টা করছিল রেমি। মনো বিশ্বাসকে খুব মন দিয়ে লক্ষ করছিল না। ছেলেটা বেশ সুপুরুষ সন্দেহ নেই। লম্বা চওড়া চেহারা। তবে চোখের দৃষ্টি নিরীহ এবং মুখের ভাব অতিশয় বিনয়ি।
বসুন।–রেমি বলো।
মনো বিশ্বাস বসল এবং বিনয়ের সঙ্গে মৃদু-মৃদু হাসতে লাগল।
ধ্রুব রেমিকে বলল, ওর সঙ্গে আমার খুব জমে গেছে।
তুমি তো জমানোর ব্যাপারে খুব ওস্তাদ। তুমি বোসো, আমি মনোবাবুকে একটু চা খাওয়ানোর ব্যবস্থা করে আসি।
শুনে ধ্রুব হাঁ হাঁ করে উঠে বলল, এই অবেলায় চা খাবে কী! চা-ফা বিকেল চারটের মধ্যে! এখন অন্য জিনিস।
রেমি ভ্রু কুঁচকে যতদূর সম্ভব কঠোর মুখভঙ্গি করে বলল, কেন বেচারাকে স্পয়েল করবে?
স্পয়েল করব কী? ও তো কুমিরের মতো খায়।
তুমি জানলে কী করে?
ওসব জানা যায় হে, তুমি বুঝবে না।
তোমরা দুজন যদি ওসবই খাও তা হলে আমার থেকে লাভ কী? আমি বরং সি-বিচ থেকে ঘুরে আসি।
মনো এতক্ষণ কথা বলেনি। স্বামী-স্ত্রীর চাপান-উতোর শুনছিল। এবার খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল, আমার ড্রিংক না হলেও চলবে। আমি মাঝেমধ্যে খাই বটে, কিন্তু নেশা নেই।
তখন লক্ষ করেনি রেমি, এখন করল, ছেলেটার কথায় পশ্চিমা টান আছে। রেমি ধ্রুবর ওপর চটেই ছিল। বলল, ও আপনাকে বোধহয় শেষ অবধি ছাড়বে না।
মনো নিরীহভাবে ধ্রুবকে বলে, আজ থাক না হয় দাদা। আমরা দুজন ড্রিংক করলে বউদি তো লোনলি ফিল করতেই পারেন। আজ প্রথম দিন বরং একটু গল্পই করা যাক।
ধ্রুব ঠোঁটটা উলটে বলল, গল্প-টল্প ভাই, আমি বেশিক্ষণ শুকনো মুখে চালাতে পারি না। তোমরা করো, আমি বরং ঘুরে আসি একটু।
সিদ্ধান্তটা বড় সহজ হল না। তিনজনে কিছুক্ষণ টানা-হ্যাঁচড়া চলল। তবে মদের ব্যাপারে একটিও কথা আর বলল না ধ্রুব। রেমি লক্ষ করছে, ইদানীং মদ প্রায় ছুঁচ্ছেই না ধ্রুব। বাস্তবিক যাদের নেশা থাকে তারা একদম না খেয়ে পারে না। ধ্রুব একদম না খেয়েও পারে। দিনের পর দিন পারে। হয়তো ওর সত্যিকারের নেশা নেই। কিংবা কে জানে কী!
ধ্রুব শেষ অবধি থাকল না। দুজনকে রেখে বেরিয়ে গেল।
রেমি অচেনা পুরুষের সামনে আগে অস্বস্তি বোধ করত না। আজকাল করে। তার শ্বশুরবাড়িতে বাড়ির বউরা বাইরের লোকের সামনে হুটহাট বেরোয় না। সেই অভ্যাসই তাকে সংকুচিত করে রেখেছে খানিকটা।
সে জিজ্ঞেস করল, আপনারা কি বরাবর নাগপুরে? কলকাতায় কেউ নেই?
মনো বলে, কলকাতা নয়। আমাদের বাড়ি ছিল মুর্শিদাবাদ শুনেছি। কিন্তু আমরা কখনও যাইনি। নাগপুরে আমাদের চারপুরুষ হয়ে গেল। কলকাতায় একবার গিয়েছিলাম ইন্টারভিউ দিতে।
কেমন লাগল কলকাতা?
আরি বাপ! লাখো গাড়ি, কোটি লোক।
রেমি হেসে ফেলল। বলল, সে তো মুম্বাইতেও লাখো গাড়ি, কোটি লোক।
সে ঠিক, কিন্তু কলকাতার মতো— যাক গে কলকাতার নামে কিছু বললে বাঙালিরা চটে যায়।
কিন্তু বাঙালি বললে চটে না। আপনি তো বাঙালি!
সে বটে, তবে কলকাতার বাঙালিদের আমরা একটু সমঝে চলি।
কেন? তারা কি খাবাপ?
না, না। খারাপ কেন হবে। তবে আমাদের মতো অন্য প্রভিন্সের বাঙালিদের তারা পছন্দ করে। ধরুন কয়েক পুরুষ অন্য স্টেটে থাকলে তো মাদার ল্যাংগোয়েজে একটু ভুল হবেই, কালচারটাও ভাল মেনটেন করা যাবে না, হ্যাবিটস পালটে যাবে। হবে না এসব বলুন?
তা তো হতেই পারে।
কিন্তু আপনারা–অর্থাৎ ওরিজিন্যাল বাঙালিরা এসব ভাল চোখে দেখেন না। বিভূতিভূষণের লেখা পড়িনি বলাতে একজন বাঙালি আমার ওপর দারুণ চটে গিয়েছিলেন। উনি আমাকে মেরেই বসতেন যদি জানতেন যে আমি বাংলায় রবীন্দ্রনাথও কিছু পড়িনি। বাংলা লেখা বা পড়ার পাটই নেই আমাদের।
কিন্তু আপনি তো বলেন।
সে বলি। বলাটার একটু চল আছে এখনও বাড়িতে।
তারপর কী হবে?
মনো মৃদু হেসে বলে, হয়তো এরকমই থেকে যাবে। খুব খারাপ হলে একটা বাঙালি পরিবার বড় জোর নন-বেঙ্গলি হয়ে যাবে। তার বেশি কিছু না। প্রবাসী বাঙালিকে আজকাল বাঙালি বলে ধরেই না অনেকে।
