কনককান্তিকে তার শ্বশুর কলকাতায় নিয়ে আবার রোপণ করেছেন বটে, কিন্তু সত্যিকারের বিচ্ছিন্ন করতে পারেননি। চপলা সেতুবন্ধ রচনা করে রেখেছিল। ইচ্ছে করলেই কনককান্তিকে মেনিমুখো স্ত্রৈণ ও ব্যক্তিত্বহীন এক পুরুষে রূপান্তরিত করতে পারত সে। করেনি। কারণ, ওরকম পুরুষকে স্বামী বলে ভাবতে তার কষ্ট হয়। নিজের স্বার্থেই কনকের ওপর খোদকারি করা থেকে বিরত থেকেছে।
বুদ্ধিমতী এই মেয়েটিকে হেমকান্তও শ্রদ্ধা করেন। তবে সেটা তাঁর খুব অভ্যন্তরের ব্যাপার। বাইরের লোক তা টের পায় না।
হেমকান্ত বউমাকে সন্ধেবেলা ডাকিয়ে আনলেন নীচের বৈঠকখানায়। ঘরটা খালিই থাকে। নিরালাও।
বোসস বউমা। একটু কথা আছে।
চপলা সশ্রদ্ধ দুরত্ব রেখে সংকোচের সঙ্গে বসল। মাথায় অনভ্যস্ত ঘোমটা। হেমকান্ত বললেন, সংসারটা আমার কাছে বড় জটিল। তোমার শাশুড়ি বেঁচে থাকলে ততটা বিপন্ন বোধ করতাম না। পরামর্শ দেওয়ারও কেউ নেই। মুশকিলটা বিশাখাকে নিয়ে।
চপলা মৃদু একটু হাসল। তারপর হাসি গোপন করতে মুখ নামিয়ে নিল।
হেমকান্ত অতটা লক্ষ করলেন না। বললেন, রাজেন মোক্তারের ছেলের সঙ্গে ওর সম্বন্ধ করেছি। আমাকে তো সরাসরি কিছু বলে না। কিন্তু শুনেছি, এ বিয়েতে ও রাজি নয়।
কেন তা কিছু বলেছে?
আমাকে বলেনি। শুনেছি ওর নাকি কোকাবাবুর নাতি শরৎকে পছন্দ।
পছন্দ?
হ্যাঁ, ব্যাপারটা অদ্ভুত। শরৎকে ও কোথায় দেখেছে কে জানে। আজকাল যা সব হচ্ছে আমাদের আর কোনও ভূমিকাই নেই।
চপলা বলল, রাজেনবাবুর ছেলেটি কেমন?
খুব ভাল। সেলফ-মেড ম্যান। স্বাবলম্বী। এরা কখনও খারাপ হয় না। সঞ্চিত সম্পদের অভিশাপ থেকে মুক্ত।
আপনার যদি পছন্দ হয়ে থাকে তবে বিশাখার আপত্তি কানে তুলছেন কেন?
জোর করতে বলছ?
জোর নয়। বিশাখা তো আর বাধা দেবে না।
তা দেবে না। তবে মা-মরা মেয়ে, হিতে বিপরীত হয় যদি! সেই জন্যই তো পরামর্শ করার লোক খুঁজছিলাম।
আমাকে একটু ভাবতে দিন।
ভাবো। তবে আমার মনে হয় শচীনই বরণীয় পাত্র। শরৎ খারাপ বলছি না। তবে একটু উগ্র প্রকৃতির। তা ছাড়া সে বিয়ে করতে রাজি নয়। বিলেত যাবে।
তা হলে? সমস্যা তো মিটেই গেল।
হেমকান্ত মাথা নাড়লেন, না বউমা, মিটল না। শচীনকে যদি বিশাখা পছন্দ না করেই থাকে তবে শরতের বিলেত যাওয়াতে কিছু যায় আসে না। মেয়েদের মনে কোনও পুরুষের ছাপ পড়ে গেলে সেটা একেবারে উৎখাত না করে বিয়ে দিলে খারাপ হয়। আমি চাই শচীনকে ও বরণ করুক। তুমি কি সে কাজটুকু করতে পারবে?
তা হলে আমি বিশাখার সঙ্গে কথা বলে দেখি।
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, সেটা বড় কথা নয়। তুমি আগে নিজে বুঝে দেখো শচীন কেমন পাত্র। তোমার যদি এ সম্বন্ধ করণীয় মনে হয় তবেই পরবর্তী কাজের কথা ভাববে।
শচীনকে কোথায় পাব?
হেমকান্ত হেসে বললেন, বেশি কষ্ট করতে হবে না। কাছারিঘরে বসে এ সময়ে সে রোজ কাগজপত্র দেখে। তাকে আমি এস্টেটের উকিল ঠিক করেছি। যদি সংকোচ বোধ না করে তবে তাকে ডেকে পাঠাতে পারি। এ ঘরে বসেই কথা বলবে।
চপলা বলল, তার দরকার নেই বাবা। আমি দেখা করে নেবোখন। আপনি ভাববেন না।
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, তোমরা দূরে থাকো বলেই আমি বড় অসহায় বোধ করি। সমস্যাটা হয়তো তেমন জটিল কিছু নয়। কিন্তু একা-একা বসে ভাবতে ভাবতে ক্রমশ সবটা জটিল হয়ে ওঠে।
চপলা আবার একটু হাসল। বলল, আপনি ভাববেন না। সবদিক যাতে বজায় থাকে আমি দেখব। একটা কথা বলব বাবা?
বলো।
বন্দুকের ঘরের চাবিটা আমাকে একটু দেবেন?
হেমকান্ত অবাক হয়ে বলেন, কেন মা, হঠাৎ বন্দুকের ঘরের চাবি কেন?
মাথা নিচু করে চপলা খুব লজ্জা আর সংকোচের সঙ্গে বলে, এমনি, আমি শিকারির মেয়ে তো। বন্দুকগুলো একটু পরিষ্কার করে তেল-টেল দিয়ে রেখে দেব।
হেমকান্ত হো হো করে কখনও উচ্চস্বরে হাসেন না। এখন হাসলেন। বললেন, তা বটে। বন্দুকের অযত্ন তোমার সহ্য না হওয়ারই কথা। ঠিক আছে। আমার খাটের পায়ের দিকে আলমারিতে যে হাতবাক্স আছে তার মধ্যে রেখেছি। যখন খুশি নিয়ে নিয়ো। তুমি তো বোধহয় বন্দুক চালাতেও
পারো, না?
চপলা মটু হাসল।
হেমকাও দুশ্চিন্তার গলায় বললেন, কৃষ্ণটাও নাকি বন্দুকের জন্য পাগল। বাচ্চাদের বন্দুক নিয়ে খেলা আমার পছন্দ নয়। ওকে একটু সামলে রেখো।
কোনও ভয় নেই বাবা। কৃষ্ণ খুব বাধ্য ছেলে।
তা হবে। আমি আর ওকে কতটুকু জানি।
আমি জানি।
তুমি যদি এখানে থাকতে পারতে তবে বোধহয় কৃষ্ণটা মানুষ হত।
তার চেয়ে আমাদের কাছে কলকাতায় গিয়ে থাক না।
সে প্রস্তাবটাও ভাবছি। কিন্তু মুশকিল, ও যেতে চায় না।
আপনারও কষ্ট হয় বোধহয়।
হয়। বিশাখার বিয়ে হয়ে গেলে আমি কতটা একা হয়ে পড়ব সে তো আন্দাজ করতেই পারো।
পারি বাবা। আর সেইজন্যই চাপাচাপি করি না।
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
হেমকান্তর কাছ থেকে উঠে বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে চপলা সোজা কাছারিঘরে এসে উঠল। বাড়ির বউ সচরাচর বার-বাড়িতে আসে না, কাছারিঘরে তো নয়ই। চাকর, বাকর, দারোয়ান, মুনশি, খাজাঞ্চিরা তটস্থ হয়ে উঠল।
চপলা দরজা দিয়ে উঁকি মেরে শচীনকে অপলক চোখে কয়েক সেকেন্ড দেখল। লম্বা গড়নের চমৎকার চেহারা। মাথায় একরাশ মিশমিশে চুল। উকিলের পোশাক ছেড়ে সাহেবি বা বাবু পোশাক পরলে রূপ অনেক বেড়ে যাবে।
কাজটা ঠিক হবে কি না তা নিয়ে মাথা ঘামাল না সে। নিঃশব্দে ঘরে ঢুকল এবং শচীনের মুখোমুখি মস্ত নিচু চৌকিটার এক ধারে বসে বলল, নমস্কার।
