বন্ধ জানালার কাচের শার্শি দিয়ে সে সমুদ্রের দিকে তাকাল। কালো, বিশাল ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে বেলাভূমিতে। ভয়ংকর। একজনও লোক দেখা যাচ্ছে না কোথাও?
রেমি একবার ঢোক গিলল। তারপর দাঁতে দাঁত চাপল সে। ক্ষতি কী? সমুদ্র যদি তাকে নেয় তো নিক। সে সুখী না অসুখী তা আজও ভাল বুঝতে পারেনি সে। মরতেও কোনওদিন ইচ্ছে করেনি তার। কিন্তু বেঁচে থাকাটাও তো বড় আলুনি।
কবিতাটা সে আর-একবার পড়ল। কবে থেকে আমি একা? ঠিক বুঝতে পারিনি হে আমার প্রিয়। আজ বুঝি, যেদিন তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমাকে সেদিন থেকেই তুমি আমার চারধারে তুলে দিয়েছ প্রতিরোধ। আমাকে কেড়ে নিলে পৃথিবীর সব কিছু থেকে, নিজেকেও দিলে না।
কবিতার পাতাটা বিছানার ওপর খুলে রাখল রেমি।
তারপর তোয়ালে নিয়ে নিঃশব্দে নেমে গেল নীচে।
সমুদ্রের ধারে প্রবল বাতাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে সে অকপট ভয়ে এবং বিস্ময়ে ঢেউ দেখছিল। নামবে?
ক্ষণিক একটু দ্বিধা আর জড়তা। তারপর আচমকা গাছকোমর বেঁধে রেমি তরতর করে নেমে গেল। যেতে হল না বেশিদূর। মাঝপথেই আকাশ-পাতাল জোড়া একটা কালো ঢেউ কয়েক হাজার টন জল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর।
চেতনা হারানোর আগে রেমির মনে হল, সে একটা রেলগাড়ির চাকার তলায় নিষ্পেষিত হয়ে যাচ্ছে। প্রবল এক চোরাস্রোত তাকে টেনে নিচ্ছে গভীর সমুদ্রের দিকে।
আসলে তা নয়। রেমিকে কয়েকবার জলের কুম্ভীপাকে চক্কর দিয়ে মহাকায় ঢেউ তাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল তীরে।
আর-একটা ঢেউ নিশ্চিত নিয়ে যেত তাকে। কিন্তু তার আগেই একজন দুঃসাহসী ছুটে এসে রেমিকে হিড়হিড় করে টেনে অনেকটা ওপরে তুলে নিয়ে শুইয়ে দিল।
রেমি জল খায়নি, তেমন চোটও লাগেনি তার। কয়েক মুহূর্তের সংজ্ঞাহীনতা কাটিয়ে সে চোখ মেলে লোকটাকে দেখল।
লোক নয়। অল্পবয়সি একটা ছেলে।
ছেলেটা বলল, আপনার তো দারুণ সাহস! আজ কেউ নামে? উঠুন! উঠুন!
রেমি উঠল। একটা ঢেউ এইমাত্র তার কোমর অবধি ড়ুবিয়ে দিয়ে ফিরে গেল। পরেরটা হয়তো তাকে ভাসিয়ে নেবে।
ছেলেটা রেমির কনুই ধরে তুলে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে যেতে যেতে বলল, আমি দূর থেকে খুব চেঁচিয়ে আপনাকে সাবধান করছিলাম। শুনতে পাননি?
হতভম্ব রেমি মাথা নেড়ে বলল, না।
হাওয়ার জন্য।
রেমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
ছেলেটা বলল, পুরীর সমুদ্র এমনিতে সেফ, কিন্তু এসব দিনে ভীষণ ডেঞ্জারাস। আর স্নান করতে হবে না, হোটেলে ফিরে যান।
রেমির মাথার মধ্যে অদ্ভুত একটা বোবা ভাব। সব ভাবনা-চিন্তা থেমে গেছে। কথা খেলছে না। সে উঠল এবং নীরবে হোটেলের দিকে হাঁটতে লাগল।
আশ্চর্যের বিষয়, দোতলার বারান্দার দিকে চেয়ে সে দেখতে পেল ধ্রুব নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাওয়ায় তার লম্বা চুল উড়ছে। সে দেখছে তাকে। কিন্তু অনুওেজিত, উদ্বেগশূন্য।
ধ্রুবকে দেখে একটু থমকাল রেমি। আজ হঠাৎ সন্দেহ হল তার। তাকে সমুদ্রে বিপন্ন হতে দেখেও ধ্রুবর উদ্বেগ নেই কেন! তবে কি ধ্রুবর কাছে তার মৃত্যু খুব একটা শোকের হবে না? ধ্রুব কি মনে মনে এই বন্ধন থেকে ছাড়া পেতে চায়?
ঘরে আসতে খুব শীত করছিল রেমির। খুব শীত। নিঃসঙ্গতা তো ভীষণ শীতল।
ধ্রুব তাকে ঘরে ঢুকতে দিয়ে নিজেও পিছু পিছু ঢুকল। দরজাটা ঠাস করে বন্ধ করে দিয়ে বলল, কী সিস্টার, মরতে পারলে না?
রেমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, তুমি তাই চাও?
আমার চাওয়াটা কোনও ব্যাপার নয়। তুমি কি চেয়েছিলে?
রেমি বাথরুমে গিয়ে গা থেকে নোজল ধুয়ে কাপড় পালটে বেরিয়ে এল। শরীরটা দুর্বল। মনটা ফাঁকা।
ধ্রুব বিছানায় বসে বাথরুমের দরজার দিকেই চেয়ে ছিল। সে বেরিয়ে আসতেই বলল, ওই হিরোটি কে?
কোন হিরো?
যে তোমাকে মৃত্যুর কবল থেকে এইমাত্র বাঁচাল।
জানি না।
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলল, নাম জেনে নাওনি? ঠিকানা?
কে বলো তো?
এই রকম পরিস্থিতি হৃদয়চর্চার পক্ষে দারুণ ফেবারেবল।
তার মানে?
ঘরে এসে তোমার একা কবিতাটা আমি পড়ে ফেলেছি। তারপর বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখেছি তোমার সুইসাইডাল অ্যাটেম্পট।
তবু এগিয়ে যাওনি?
স্পিডে পেরে উঠতাম না। তবে দু-একবার চেঁচিয়েছিলাম। বৃথা। এই ঝোড়ো বাতাসে সে ডাক তোমার শোনার কথা নয়। তা ছাড়া হয়তো শুনলেও ফিরতে না।
তাই বুঝি?
তাই তো। তুমি যে বড় একা। হঠাৎ দেখলাম এক ছোকরা তোমাকে জল থেকে টেনে তুলছে। বেশ লালটু দেখতে।
হবে। আমি ভাল করে দেখিনি।
আমি দেখেছি। পাশের হোটেলটার দিক থেকে বেরোল।
তাই নাকি?
চালিয়ে যাও।
তার মানে?
ছোকরা তোমাকে বাঁচিয়েছে, সুতরাং তোমার ওপর ওর খানিকটা হক বা দাবিও জন্মায়।
ইতরের মতো কথা বলো না।
মাইরি সিস্টার, তোমার সঙ্গে ঠাট্টা করাও মুশকিল।
ঠাট্টা নয়। ওটা তোমার মনের নোংরামি।
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলল, মাইরি না। আমি কী রকম তা আমি জানি। আমি ঢেউ, আমি চেঙ্গিস খাঁ। সব ঠিক। কিন্তু ভাই, আমি এও বলি, বি এ গুড গার্ল, গো অ্যান্ড লাভ সামওয়ান এগেন। আমি তাতে খুব খুশি হব।
ঠিক আছে। চেষ্টা করব।
এই পাত্রটা আমার বেশ পছন্দ। ছোকরা দারুণ লালটু।
রেমি রাগে ফেটে যাচ্ছিল। প্রাণপণে মুখ টিপে রইল শুধু।
খাওয়ার পর রেমি আজ একটু ঘুমোল। রাত্রে ভাল ঘুম হয়নি।
বিকেলে ধ্রুব তাকে ডেকে তুলল, আরে দেখো, কাকে ধরে এনেছি।
রেমি অবাক হয়ে দেখল, সেই ছেলেটা।
০৩৫. চপলার বাবা মস্ত শিকারি
চপলার বাবা মস্ত শিকারি এবং ভয়ংকর সাহেব! চপলা নিজে থাকে কলকাতায়। তার মধ্যে শহরের হেঁয়া আছে, আর আছে বাপের বাড়ির সাহেবিয়ানা। সে চমক্কার অর্গান বাজায়, ফুটন্ত ইংরিজি বলে, সাহেবদের সঙ্গে বসে নির্দোষ ম্যানারসে ডিনার খেতে পারে। আবার কলকাতাও তার মধ্যে সঞ্চার করেছে কিছু আধুনিকতা। দুয়ে মিলে চপলা খুবই সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারত এই পরিবারের পক্ষে। কিন্তু সেটা হয়নি। হয়নি চপলা বুদ্ধিমতী বলেই। এই সেকেলে, রক্ষণশীল এবং পুরনো মূল্যবোধের ভিত্তিতে স্থাপিত পরিবারের আবহটা সে প্রথম থেকেই বুঝে গিয়েছিল।
