ছেলেমানুষিতে ভরা ও কাঁচা এই কবিতা পড়ে রেমি নিজেই লজ্জায় রাঙা হল, হাসল আপন মনে। বারকয়েক পড়ে তার মনে হল, এ ঠিক ঢেউকে নিয়ে লেখা নয়। এসব ঢেউয়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে একজন মানুষও।
রাত্রে সে খুব সংকোচের সঙ্গে ধ্রুবকে বলল, আমি একটা কবিতা লিখেছি, পড়বে?
ধ্রুব যথারীতি একখানা শক্ত বই পড়ছিল। এম এন রায়ের দি রাশিয়ান রিভোলিউশন। খাটের বাজুতে বালিশের ঠেকা দিয়ে খুব আয়েস করে আধশোয়া খুব বিস্মিত চোখে রেমির দিকে চেয়ে বলল, তুমি আবার কবিতাও লেখো নাকি! এত গুণ তো জানতাম না।
ইয়ার্কি কোরো না। একেই তো আমার মন খারাপ।
কেন, মন খারাপের কী?
কবিতাটা ভাল হয়নি।
ওঃ তাই বলো। দেখি। বলে হাত বাড়ায় ধ্রুব।
রেমি এক্সারসাইজবুকটা আঁকড়ে ধরে থেকে বলে, হাসবে না বলো।
আরে না। কবিতা খুব সিরিয়াস জিনিস। ও নিয়ে হাসিঠাট্টা চলে!
এই তো ইয়ার্কি করছ।
মাইরি না। যে জিনিস বুঝি না তা নিয়ে ইয়ার্কি চলে না।
কবিতা তোমার ভাল লাগে না জানি।
ঠিকই জানো। আসলে বুঝি না বলেই তেমন করে ভালবাসি না।
সব কিছুই কি স্পষ্ট করে বোঝা যায়?
ধ্রুব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তা বটে। তবে আমি যেসব বিষয় ভালবাসি অর্থনীতি রাজনীতি বা বিজ্ঞান তাদের মধ্যে কোনও অস্পষ্টতা নেই। সলিড যুক্তি এবং নির্ভুল অংকের ওপর দাঁড় করানো জিনিস। দাও, দেখি আমার নিরেট মগজে তোমার কবিতার কোনও এফেক্ট হয় কি না।
খুব কাচুমাচু হয়ে খাতাটা এগিয়ে দিল রেমি। তারপর তার ভীষণ লজ্জা করতে লাগল। বুক কাঁপছে। আশ্চর্য, এই মানুষটার সঙ্গে তার শরীরের ব্যবধান নেই। লজ্জা নেই। সারা রাত প্রায় এর বুকের মধ্যে লেপটে সে শুয়ে থাকতে ভালবাসে। তবে একটা কবিতা দেখাতে এত লজ্জা কেন!
ধ্রুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই কবিতাটা পড়ে গেল। মুখে একটু গা জ্বালানো হাসির ছিটে। চোখের পলকে পড়া হয়ে গেল। খাতাটা বিছানায় রেখে বলল, বেশ হয়েছে। চালিয়ে যাও।
একথায় রেমি একদম নিভে গেল। মনটা ভারী খারাপ লাগতে লাগল। অপমান বোধ করল সে।
অনেকক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্ধকার সমুদ্রের দিকে চেয়ে রইল সে। অবিরল জল ভাঙার শব্দ কানে তালা ধরিয়ে দেয়। আশ্চর্য, ধ্রুব কি বুঝতে পারল না যে, ওই ঢেউয়ের বিবরণ আসলে সমুদ্রের ঢেউ নয়। ধ্রুব নিজেই!
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল রেমি। আশা করল, সে যে রাগ করেছে তা ধ্রুব বুঝতে পারবে এবং রাগ ভাঙাতে আসবে। কিন্তু এই পুরুষটির কাছে কোনও কিছু আশা করাই অন্যায়। যাকে বলে আনপ্রেডিকটেবল ধ্রুব হচ্ছে তাই। রুশ বিপ্লব তার কাছে বউ বা বউয়ের ঘেঁদো রাগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব জিনিস।
খাওয়ার সময়েও দুজনেই চুপচাপ। ধ্রুব অন্যমনস্ক। রেমি অন্যমনস্কতার ভান বজায় রাখতে সতর্ক।
রাত্রে ঘরের দরজা বন্ধ করার পরই ধ্রুব তাকে বলল, রেমি, ওটার নাম বদলে দাও।
কোনটার?
কবিতাটার।
তার মানে?
ওই তুমিটা কে? ঢেউ?
তা ছাড়া আবার কে?
ধ্রুব একটু হেসে বলল, তা হলে অবশ্য আলাদা কথা। আমি ভেবেছিলাম ঢেউটা বোধ হয় বকলমে আমিই।
রেমি রাগ করে বলল, না, তুমি কেন হতে যাবে!
খুব রেগেছ ডার্লিং। কবিরা খুব টাচি হয় শুনেছি।
আমি মোটেই কবি নই।
তা অবশ্য ঠিক। তবে এতদিন পরে আমি বুঝতে পারছি তোমার মধ্যে একটা কবিসুলভ ব্যাপার আছে। নইলে এত টাচি হবে কেন!
আমি মোটেই টাচি নই।
রাগছ কেন? টাচি হওয়া তত ভাল। আমার মতো গাছ হওয়াটা একদম কাজের কথা নয়।
রেমির গনগনে অভিমান আরও ফুসে উঠল এইসব ইন্ধন পেয়ে। সে জবাব দেওয়া বন্ধ করল।
ধ্রুব দিব্যি পাশে শুয়ে চটপট ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন মেঘলা আকাশ নিয়ে ভোর হল। একটা ঝোড়ো হাওয়া বইছে। সমুদ্রকে দেখাচ্ছিল নিকষ কালো। ঢেউগুলো আগের দিনের তুলনায় দ্বিগুণ, তিনগুণ। একজনও সমুদ্রে নামেনি আজ। এমনকী বিস্তীর্ণ বেলাভূমিতেও লোক নেই। ঝোড়ো দামাল দিন। আজ বোধহয় আর ঢেউয়ের সঙ্গে ভাব-ভালবাসা হবে না রেমির।
ধ্রুব বেলা অবধি ঘুমোচ্ছিল। রোজ তাকে রেমি ডেকে তোলে। কিন্তু কাল থেকে রাগ করে আছে বলে আজ আর রেমি ডাকেনি। খানিকক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে সমুদ্রের ভয়ংকর চেহারাটা দেখতে দেখতে কয়েকবার শিউরে উঠল সে। ঢেউ আজ অনেকটা ওপর অবধি ধেয়ে আসছে। উত্তাল কালো জল। রেমির একটু শীত করছিল। গায়ে আঁচলটা ভাল করে জড়িয়ে নিয়ে সে নীচে খাবার ঘরে এসে একা-একা চা খেল। কারও সঙ্গেই কথা বলার নেই। কিছু করারও নেই আজ। কেমন যেন কলকাতার জন্য মন কেমন করছে। শ্বশুরমশাই নিশ্চয়ই তাদের কথা ভাবছেন। তার বাবার শরীরও ভাল ছিল না।
ঘণ্টা খানেক বাদে রেমি ঘরে এসে দেখল, ধ্রুব নেই।
নেই তো নেই-ই। বাথরুমে নেই, খাওয়ার ঘরে নেই। কোথাও নেই। এরকম মাঝে মাঝে বেপাত্তা হয়ে যায় বটে ধ্রুব। কোথাও এই এক বেলা কাটিয়ে ফিরে আসে। চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু আজ এই মেঘলা ঝোড়ো দামাল দিনে রেমির বড় একা লাগছে। মনটা বিস্বাদ। তেতো।
এক্সারসাইজ বুকটা বের করে সে কবিতাটা পড়ল। বাজে, অখাদ্য কিন্তু তার আজ সকালে আর-একটা কবিতা লিখতে ইচ্ছে করছে। একটা ডটপেন নিয়ে সে বসে গেল। কবিতার নাম দিল একা।
দুপুর হয়ে এল। সকাল থেকে কিছু খায়নি রেমি। চনচনে খিদে পেয়ে গেছে। ধ্রুবর জন্য বসে থেকে লাভ নেই। সে উঠল। বাথরুমে যাবে যাবে করেও একটু থমকাল সে। বাথরুমে স্নান করতে ভাল লাগবে কি?
