ঘণ্টাখানেক জলে থাকার পর যখন শরীরের চামড়ায় সাদা রং ধরে গেছে, আর চোখ লাল, তখন। ছটকু দারোয়ান এসে তাকে জল থেকে তুলল, কর্তাবাবু কখন থেকে ডাকতেছেন। চলল।
খুব ভয়ে আর সংকোচে মাথা নিচু করে বাড়িতে ঢোকে কৃষ্ণকান্ত।
কনককান্তি সদ্য স্নান করে আহ্নিক সেরে এসে ওপরের বারান্দায় বসেছে। রংটা যেন চারদিকে আললা করে আছে।
কত বড় হয়ে গেছে, আঁ!— কনকের বিস্ময় নিখাদ।
কনক হাত বাড়িয়ে ভাইকে কাছে টেনে নিল। কৃষ্ণকান্তের রূপবান চেহারাটা বোধহয় খুবই পছন্দ হল তার। মুখের দিকে কয়েক পলক মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থেকে বলল, বুঝলে চপল, কৃষ্ণ আমাদের বংশে সবচেয়ে সুপুরুষ হবে।
বউদির অবস্থানটা চোখ তুলে দেখেনি কৃষ্ণকান্ত। লজ্জা করছিল। চপলা বারান্দার আর-এক প্রান্তে রোদে চুল শুকোচ্ছিল দাঁড়িয়ে। পুঁচকে দেওরের দিকে চেয়ে একটু হেসে বলল, এই সেদিনও তো আমার কোলে পেচ্ছাপ করে দিয়েছিল।
লজ্জায় মরে গেল কৃষ্ণকান্ত। অখোবদন।
বড়দাদা তাকে ছেড়ে দিয়ে বলে, অত লজ্জা পাচ্ছিস কেন আমাদের? শুনলাম সারা সকাল নাকি পালিয়ে ছিলি!
ছিল গো বড়দা।–বিশাখা বউদির ছায়ায় দাঁড়ানো, সেই বলো।
লজ্জা সংকোচ সব কেটে গেল বিকেলের মধ্যেই। ভারী অদ্ভুত ভাল লাগতে লাগল কৃষ্ণকান্তর।
বড়দাদা একটু গম্ভীর মানুষ। খুব বেশি কথাটথা বলে না। প্রাথমিক কুশল প্রশ্নাদির পর বড়দাদা সকলের সঙ্গে খেতে বসল, দুপুরে ঘুমোল, বিকেলে সাজগোজ করে গাড়ি নিয়ে বেরোল পুরনো বন্ধুদের খোঁজে। খুব নাকি তাস খেলার নেশা বড়দাদার। তাড়াতাড়ি ফিরবে না।
বউদি চপলাকে ভাল লাগল অন্য কারণে। বাড়িতে পা দিয়েই বউদি যেন এ বাড়িতে একটা অন্যরকম আবহাওয়া তৈরি করে দিয়েছে। ঘোমটা টানা বউ, সিথিতে সিঁদুর এ দৃশ্যটাই কৃষ্ণকান্তর কাছে একটু সুদূর। সে তো বাড়িতে এরকম কাউকে দেখে না।
সারাদিন ঘুরে ঘুরে বউদি অনেক কাজ করতে লাগল। এ বাড়িতে কাজের লোকের অভাব নেই, কিছু করলেও চলে। কিন্তু বউদি বসে থাকল না। দুপুরে বাচ্চা দুটোকে ঘুম পাড়িয়ে গাছকোমর বেঁধে ঘরদোরের আসবাবপত্র চাকরদের দিয়ে এধার ওধার করাতে লাগল। সঙ্গে আঠার মতো কৃষ্ণকান্ত।
কিছুক্ষণ পরপরই বউদি তাকে জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁ রে কৃষ্ণ, এই খাটটা দক্ষিণের জানালার ধারে পাতলে ভাল হবে না? টেবিলটাকে এই কোনায় আনলে কেমন হয় রে?
কৃষ্ণকান্ত এই যুবতীর মোহময় নৈকট্যে এক ধরনের সম্মোহনে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল। সব কথাতেই সায় দেয়।
বউদি মানুষটা যে চমৎকার তা কৃষ্ণকান্ত আরও বুঝতে পারল ছোড়দির সঙ্গে তার ভাব দেখে। ছোড়দি অর্থাৎ বিশাখা বড় সহজে কাউকে সহ্য করতে পারে না। সেইজন্য ওর তেমন বন্ধুও নেই। কিন্তু বউদির সঙ্গে তার বেশ ভাবসাব লক্ষ করে সে।
বিকেলে ছাদের ওপর মস্ত পাটি পেতে বসল বউদি। তাকে ডেকে বলল, আজ বিকেলে আর তোকে খেলাধুলো করতে হবে না। আমার সঙ্গে বসে গল্প করবি আয়।
কৃষ্ণকান্ত এক কথায় রাজি। ফুটবলের অমোঘ আকর্ষণ ত্যাগ করে সে বউদির কাছটিতে বসে পড়ল।
তুই নাকি ভাল ছাত্র হয়েছিস!
কৃষ্ণকান্ত লাজুক ভাবে বলে, না না।
শুনেছি। কই চিঠি লিখে তো জানাসনি যে ক্লাসে তুই হার্স্ট হোস।
আমি তো চিঠি লিখি না।
লেখো না কেন হনুমান?
এবার লিখব।
আর লিখতে হবে না। তোকে এবার আমি আঁচলে বেঁধে নিয়ে যাব।
প্রস্তাবটা এবার আর তেমন খারাপ লাগল না কৃষ্ণকান্তর। লাজুক লাজুক হাসতে লাগল।
যাবি তো!
বাবা বললে যাব।
আচ্ছা, বাবাকে আমি রাজি করাব। কী সুন্দর দেখতে হয়েছিস রে? কদিন বাদে তো মেয়েরা পাগল হবে তোকে দেখে।
কথাটা কৃষ্ণকান্ত ভাল বুঝল না। মেয়ে পুরুষের সম্পর্ক তার কাছে তেমন স্পষ্ট নয়। কিন্তু এসব তো অভ্যস্ত সংস্কারের মধ্যেই থাকে। কাজেই সে রাঙা হয়ে উঠল।
চপলা মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেওরটিকে খানিকক্ষণ দেখে বলল, একমাথা চুল হয়েছে, কণ্ঠায় ময়লা, কানে ময়লা, কেউ নজর দেয় না তোর দিকে।
মাঝে মাঝে মনুপিসি ঘষে দেয়।
মনুপিসি ঘষে দিলে কী হবে! তোমার নিজের দায়িত্ব নেই।
বউদি তুমি থেকে তুইতে নামতে দেরি করেনি একটুও।
কী মিষ্টি যে লাগছিল বউদিকে তার।
০৩৪. ঢেউয়ের সঙ্গে ভাব হয়ে গেল রেমির
ঢেউয়ের সঙ্গে ভাব হয়ে গেল রেমির। ভয় ভেঙে গেল।
এর আগেও সে কয়েকবার পুরী এসেছে। কিন্তু সাঁতার জানে না বলে কোনওদিন সমুদ্রে নামেনি। কেউ তাকে জোর করে নামায়ওনি। ঢেউয়ের করাল চেহারা দেখে বুক দুরদুর করত। কোনওদিন ঢেউয়ের মুখোমুখি হবে না, ভেবে রেখেছিল। দৈত্যের মতো সেইসব অচেনা ঢেউয়ের সঙ্গে চেনা করিয়ে দিল ধ্রুব। ভয় ভাঙল। নেশা এসে গেল।
আকাশ আড়াল করা উঁচু, রেলগাড়ির মতো গতিময় ও পাহাড়ের মতো বিশাল এক-একটা ঢেউ যখন আসে তখন মনে হয় তাকে বুঝি নিষ্পিষ্ট করে দিয়ে যাবে। বেলাভূমি ছাড়িয়ে ভাসিয়ে নেবে শহরের ঘরবাড়ি। লাফিয়ে বা ড়ুব দিয়ে ঢেউয়ের সঙ্গে খানিকটা বেলাভূমির দিকে ভেসে যাওয়ার পর পায়ের নীচে সর্ষেদানার মতো চলন্ত বালির ওপর দাঁড়িয়ে টালমাটাল রেমির এখন মনে হয়, সব দুঃখ শোক বুঝি ভেসে গেল। প্রথম-প্রথম ধরে থাকত ধ্রুব, আজকাল ধরে না, তবে কাছাকাছি থাকে। ঢেউ কাটিয়ে দিয়ে দুজনে দুজনের দিকে চেয়ে হাসে।
স্কুল ম্যাগাজিনে রেমি এক সময়ে কয়েকটা কবিতা লিখেছিল। সমুদ্রের সঙ্গে চেনাজানার পর সে এক দুপুরে সংগোপনে বহুকাল বাদে আর-একটা কবিতা লিখে ফেলল। নাম দিল তুমি। ঢেউ নিয়ে লেখা। অর্থটা দাঁড়াল অনেকটা এরকম: তুমি ঠিক এক রাগী ও অভিমানী পুরুষের মতো। ধেয়ে আসা পাহাড়। কালো ও গভীর। মনে হয় বুঝি চুরমার করে দেবে আমাকে। কিন্তু যখন এলে, যখন ভাসিয়ে নিলে আমাকে দম বন্ধ করা উচ্ছ্বাস ও আবেগে, পায়ের তলা থেকে কেড়ে নিলে মাটি, তখন ঠিক ভয় করল না, রোমহর্ষ হল। এতকাল যা ঘটেছে আমার জীবনে, কিছুই ঠিক এরকম নয়। কত কোমল তুমি, ফের সযত্নে স্থাপন করলে আমায় চলন্ত বালির ওপর। ভাল করে ভারসাম্য ফিরে পাওয়ার আগেই আবার ভাসিয়ে নাও তুমি, আবার স্থাপন করো। আমি তোমাকে বুঝি না, একটুও না। সেই ভাল। ওরকমই রহস্যময় থাকো তুমি আদিগন্তের ঢেউ। কত দেশ ছুঁয়ে আসা জল। বারবার দোলাও আমাকে, বারবার ভাসাও আমাকে। কে চায় স্থির মাটি, স্থায়ি ভিত, সংসারে সোনার বিগ্রহ হয়ে থাকা!
