চপলা এসে প্রণাম করতে তিনি তার মাথাটি স্নেহভরে স্পর্শ করলেন। নাতি আর নাতনিটির থুতনি নেড়ে দিলেন মাত্র। বাচ্চাদের কী করে আদর করতে হয় তা তার জানা নেই। সব পরিস্থিতিতেই তিনি অপ্রতিভ বোধ করেন।
দায়সারা গলায় বললেন, যাও বিশ্রাম করো। গাড়ির ধকল তো কম যায়নি।
সামনে থেকে ওরা সরে যাওয়ার পর হেমকান্ত হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
এই গৌরকান্তি দীর্ঘকায় লোকটি যে তার বড়দাদা এটা বুঝতে কৃষ্ণকান্তর অনেক সময় লেগে গেল। ধারে কাছে ঘেঁষবার কোনও ইচ্ছে সে বোধ করল না।
পিছনে বিশাল এবং অগাধ আমরাগান। বিপ্লবী শশিভূষণ অভুক্ত অবস্থায় গত শীতে এখানে তিন দিন গা ঢাকা দিয়ে ছিল। সেই থেকে এই আমরাগানটা কৃষ্ণকান্তের কাছে একটা গুরুত্বপূর্ণ ও রহস্যময় জায়গা হয়ে উঠেছে। অবসর সময়ের অনেকটাই সে এই আমরাগানে কাটায়। সঙ্গে থাকে গুলতি, এয়ার গান, তিরধনুক বা পেনসিলকাটা ছুরি। আমরাগানের আলো-আঁধারিতে সে হয়ে যায় পলাতক এক দেশপ্রেমিক। ইংরেজের শত্রু। কল্পনার বলগা ছাড়া পক্ষীরাজ তাকে কঁহা কাহা মুল্লুক নিয়ে যায়। গাছের একটি ডালে সে ফাঁসির দড়ি টাঙিয়েছে। কখনও কখনও একদৃষ্টে দড়ির ঝুলে থাকা ফসটির দিকে সে সম্মোহিতের মতো চেয়ে থাকে।
কনককান্তি আসার পর সে এই আমরাগানেই গা ঢাকা দিল। জানে, লাভ নেই। আমরাগানে তার এই গুপ্ত ঘাঁটির কথা অনেকেই জানে। দিদি বিশাখা, চাকর হরি, মনুপিসি, হর কম্পাউন্ডার! কেউ না কেউ ঠিক এসে ধরে নিয়ে যাবে।
আমরাগানে বসে সে সারা বেলা ধরে ভাবল, বড়দাদা তাকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার জন্যই এসেছে কি না। কলকাতায় যেতে যে তার ইচ্ছে করে না তা নয়, কিন্তু সে বেড়ানোর জন্য। কিন্তু এই ব্ৰহ্মপুত্র, চর, আমরাগান আর এই মায়াবী বাড়িটা দীর্ঘদিনের জন্য ছেড়ে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। সে মরে যাবে। বড়দাদাকে তত ভাল করে চেনেই না। বউদির সঙ্গে তার কোনওদিন তেমন করে ভাব হয়নি। ওদের ছেলেমেয়ে দুটিকে সে তো বলতে গেলে এই প্রথম দেখছে।
অনেকক্ষণ ধরে ভাবতে ভাবতে সে কয়েকটা কাঁচা আম খেয়ে ফেলল। তারপর হাঁটতে হাঁটতে বাগান পেরিয়ে একটা পগারের ধারে এসে দাঁড়িয়ে মুখের সামনে হাতের পাতা লম্বালম্বি ভাবে রেখে বিচিত্র একটু ড়ু ড়ু শব্দ করল। এটা তার সংকেত।
পগারের ওপাশে কিছু গরিব প্রজার বাস। এদের বেশির ভাগই নমশুদ্র। খুব তেজি টগবগে মানুষ। কৃষ্ণকান্তর বয়সি গোটা বিশেক ছেলে আছে ওইসব টিন আর বাঁশের ঘরের বসতিতে। তারা সবাই তার বশংবদ। প্রজা বলে নয়, এমনিতেই তারা কৃষ্ণকান্তকে ভালবাসে।
কৃষ্ণকান্তর ডাক শুনে ঝটপট পাঁচ-সাতজন বেরিয়ে এল। ওদের সর্দার হল ঝড়। সবচেয়ে দীর্ঘকায় সবচেয়ে বলিষ্ঠ তাব গড়ন। পাথরে কেঁদা চেহারা। যেমন ডানপিটে, তেমনি পরোপকারী।
কৃষ্ণকান্ত ঝড়ুকে বলল, স্নান করতে গাঙে যাবি?
যাব।
চল তা হলে।
দলবল নিয়ে কৃষ্ণকান্ত মানে চলল।
ঝড়ু জিজ্ঞেস করে, তুমি নাকি বন্দুক চালাতে শিখে গেছ।
হ্যাঁ। শরৎদা শিখিয়েছে।
পাখিও মেরেছ অনেক!
অনেক নয়। একটা।
বন্দুক চালাতে কীরকম লাগে? শুনি নাকি এমন ধাক্কা মারে যে উলটে ফেলে দেয়।
ধাক্কা মারেই তো। কায়দা জানা চাই।
তোমাদের তো বন্দুক আছে। একদিন চুরি করে চলো চরে যাই। আমাকে শিখিয়ে দেবে।
দেব। দাঁড়া, বড়দাদা চলে যাক। তারপর।
বড়দাদা কি তোমাকে নিয়ে যাবে?
নিয়ে যেতে তো চাইছে। কিন্তু আমি যাব না।
গেলেই তো ভাল। কলকাতায় কত মজা! মনুমেন্ট, চিড়িয়াখানা, ট্রাম।
ধুস। আমার ওখানে থাকতে ভাল লাগে না।
তা হলে আমাকে পাঠিয়ে দাও না!
তোকে! তুই গিয়ে কী করবি?
আমি গিয়ে ওখানে কাজ-কারবার শিখব। বড়লোক হব।
কী কাজকারবার?
সে কতরকম আছে! তোমার বড়দাদাকে বলবে ছোটবাবু, আমাকে নিয়ে যেতে?
কৃষ্ণকান্ত প্রস্তাবটা ভেবে দেখল। ঋভু চলে গেলে তার নিজের কিছু অসুবিধে আছে। তার দলে ঝড়ুই সবচেয়ে সাহসী। ওরকমটা আর কেউ নেই। সে বলল, আচ্ছা ভেবে দেখি।
ঝড় বলল, তোমার বড়দাদার নিজের তো বিরাট ব্যাবসা। আমি তার মধ্যে ঢুকতে পারব না?
তা পারবি না কেন?
অবশ্য দরকার হলে বাড়িতে চাকরের কাজও করতে পারি। ঘর ঝটপাট দেওয়া, বাসন মাজা, খোকাখুকিদের হাওয়া খাওয়ানো।
কৃষ্ণকান্ত থমকে যায়। তারপর হঠাৎ রেগে উঠে বলে, কেন চাকরের কাজ করবি কেন? তুই আমার বন্ধু না!
ঝড়ু অবাক হয়ে বলে, তাতে কী? বড়দাদা তো নিজেদের লোক। ওর বাড়িতে কাজ করলে কী হয়? বড়কর্তা বললে আমার বাবা গিয়ে কামলার কাজ করে আসে না?
তা হোক। বাবার কথা আলাদা। বাবা কাউকে চাকর বলে মনে করে না। কিন্তু বড়দাদা কলকাতার বাবু, ওদের বাড়িতে কাজ করবি কেন?
ঝড়ু একটু মিইয়ে গিয়ে বলে, এমনি বললাম কথাটা। আমরা প্রজা তো। তোমরা হলে রাজা লোক।
তারা যে রাজা তা খানিকটা মানে কৃষ্ণকান্ত। তবু তার মধ্যেও একটু কিন্তু আছে। সে আজকাল শুনতে পাচ্ছে, রাজ্যের অবস্থা ভাল নয়, সম্পত্তি বিক্রি হয়ে যেতে পারে। এই কথাটা ভাবলে কৃষ্ণকান্তর কেন যেন ভয় করে। রাজ্য যদি না থাকে তবে সে রাজা হবে কেমন করে? রাজা হওয়ার জন্যই যে তার জন্ম!
কৃষ্ণকান্ত গাঙের ধারে এসে একটু আনমনা উদাস চোখে ব্রহ্মপুত্রের বিশাল বিস্তারের দিকে চেয়ে রইল। রাজ্য রাজা এসব শব্দ তার রক্তে এক ধরনের তরঙ্গ তোলে। রাজা কৃষ্ণকান্ত। রাজা কৃষ্ণকান্ত।
