সকালে মায়ের দিকে তাকিয়ে মরিয়মের মনে হয়, গত রাতের কথাগুলো ছিল তার প্রলাপ। তিনি কলাপাতা মাথায় দিয়ে তুমুল বৃষ্টিতে এঘর-ওঘর করছেন। তার হাঁকডাক বর্ষণের একঘেয়ে শব্দ ছাপিয়ে কানে বেঁধে। ভেজা পাটখড়ি আর চ্যালাকাঠ দিয়ে রান্না করেন দিনের অর্ধেক সময়। চুলায় লম্বা ফুঁ দিয়ে, মরিয়ম ভাবে, তিনি আসলে দমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে চাচ্ছেন। এ বাড়িতে রত্না-ছন্দা ছাড়া তারা তিনজনই একপ্রকার মৃত। জীবিত মানুষের চরিত্রে জনসমক্ষে অভিনয় করছে। কিন্তু অভিনয়ই তোক আর বাস্তবই হোক বেঁচে থাকলে মানুষের খেতে হয়। বীজধানের ডুলি একে একে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। অগত্যা কামলা ছেলে দুটি বুকে কলসি বেঁধে পানির তল থেকে ধানের ছড়া তুলে আনে। মুগুর দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে শিষ থেকে ধান ছাড়ায়। মেরি আর মনোয়ারা বেগম অপুষ্ট ধান টিনের পাত্রে ছড়িয়ে দিয়ে চুলার ওপর নেড়েচেড়ে গরম করে। তারপর মুষল দিয়ে পাড় দিতে দিতে একসময় এ থেকে চাল না, খুদ বেরোয়। তাই দিয়ে থকথকে জাউভাত, সারা দিনের খাবার। প্রত্যেক বেলায়। তাতে ভাগ বসায় গলাপানি ভেঙে হেঁচোড়-পেঁচোড় করে আসা গায়ের দু-চারজন অনাহারী মানুষ। এ প্রক্রিয়ায় আহারের সংস্থান করতে চ্যালাকাঠ, পাটখড়ি ফুরিয়ে গেলে মা-মেয়ে রান্নাঘরের খুঁটি উপড়ে ফেলে, চালের ছন টেনে টেনে চুলায় দেয়। ধান ভানার বড় ঢেঁকিটাও তাদের কুঠারাঘাত থেকে রেহাই পায় না। এভাবে আগুন জ্বেলে, মাথার ওপরের ঠাই আর নিত্য ব্যবহার্য জিনিস ধ্বংস করে, বীজের ধান চাল করে ভাত রাঁধতে রাঁধতে দুজন নারী একে অন্যের খুব কাছে চলে আসে। তাদের চাওয়াগুলোও এক। বাঁচার উপায়ও অভিন্ন। যা অনিবার্য, যা রোধ করা যাবে না, তা আগলে রেখে কী লাভ। মরিয়মের মনে হয়, যুদ্ধের পর সে এই প্রথম একজন যথার্থ বন্ধু পেল। যার অবস্থা তারই মতো। দুজনের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। হাত পেতে কারো কাছে কিছু চাওয়াটাই বিড়ম্বনা, মিথ্যা আশ্বাস আরো ভয়ংকর–মা হাতে-কলমে মেয়েকে এই শিক্ষা দিচ্ছেন।
পেছনে পলিমাটি রেখে বন্যার পানি তরতরিয়ে নেমে গেছে। সেই নরম মাটির ওপর নিঃশব্দে পা ফেলে আসে দুর্ভিক্ষ। ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ তোবড়ানো বাটি আর মাটির সানকি হাতে খিদার ঘোরে অন্ধের মতো ঘুরছে। কফিলউদ্দিনের ভিটেয় সারা দিন তাদের আনাগোনা। ভাত চাই, ফ্যান চাই কলরব। একজনের পাতে ফ্যান-ভাত দিতে-না-দিতে মানুষ আর কুকুরে কামড়াকামড়ি বেধে যায়। কফিলউদ্দিন আহমেদ বগলে ছাতা নিয়ে হয় সদরে যান খবরের কাগজ পড়তে, না হয় বাড়ি বসে স্বাধীনতার শাপান্ত করেন। তার ছেলে আস্ত একটা গাধা। এমন স্বাধীনতার জন্য কেউ জীবন দেয়! পঞ্চাশ সনের দুর্ভিক্ষের কথা ভেবে, তার চোখ দুটি জ্বালা করে। সেই বছর তার পাগল মা ছেলেকে শামুক-গুগলি তোলার জন্য অঠাই পানিতে নামিয়ে দিয়েছিলেন। মৃত্যুর সঙ্গে সেই তার প্রথম সাক্ষাৎ। ডুবতে ডুবতে খালি হাতে ভেসে উঠলে মা তীর থেকে মাথায় লাঠির বাড়ি মারতেন। এক জীবনে দু-দুটি দুর্ভিক্ষ! একটা করল ব্রিটিশ সরকার আর অন্যটা ডেকে আনল চাল রপ্তানি বন্ধ করে দিয়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। গরিব নিরন্নের ওপর ধনী রাষ্ট্রের কী নির্মম জুলুম! এদিকে মনোয়ারা বেগমের পাগল পাগল ভাব। স্বামী-সন্তান নিয়ে খেতে বসলে কঙ্কালসার হাতগুলো জানালা-দরজায় নিঃশব্দে সানকি বাড়িয়ে দেয়। তাদের চোখ মৃত। পেটের খাঁচা ডেবে পিঠের চামড়ার সঙ্গে মিশে গেছে। মুখে রা করার শক্তি নেই। রাতের বেলায় উঠানে-বারান্দায় এমনভাবে পড়ে থাকে যে, ভয়ে পা ফেলা যায় না।
এমন এক রাতে বাড়িভর্তি মানুষের ভেতর মনোয়ারা বেগম আবার চুপিচুপি বিছানা ছেড়ে উঠে আসেন। মেরি জেগেই ছিল। মায়ের হাতের ধাক্কায় উঠে বসে। ‘তুই এহানে আর থাকিস না মা। কালই চইল্যা যা।’
‘কেন মা?’
‘কথা বাড়াইস না মরিয়ম। নে ধর।’ মেরির দিকে এগিয়ে দেওয়া তার হাতের পুটলিটা অন্ধকারে ঝনঝনিয়ে ওঠে। ওজনে ভারী। মনোয়ারা বেগমের সব স্বর্ণালংকার এখানে। মেয়ে অবাক হওয়ারও সময় পায় না। মা প্রসঙ্গান্তরে চলে যান। ‘তোর বিয়েটা যে হাচা বিয়া না, আমি আগেই বুঝছি। এসব পাতানো খেলা। তোর বাপ। খবর শুইন্যা নাচ্ছে। আমার কথা কানে তোলে নাই। হায় রে, অভাইগ্যা মানুষ!’
যে স্বর্ণালংকার মন্টুর স্ত্রীর প্রাপ্য ছিল, রত্না-ছন্দার বিয়ের যৌতুক হতে পারত, সেগুলো এখন মরিয়মের বেঁচে থাকার পুঁজি। মনোয়ারা বেগম পুটলিটা মেয়ের হাতে তুলে দিয়ে বলেন, ‘সাবধানে খরচ করবি। ছোট দুইডারে বঞ্চিত করে আমি তোরে দিলাম। তাতে কোনো দুঃখ নাই। অরা অগো মতো বাঁচব।’
তাদের বাঁচার সম্ভাবনা যে মোলোআনা, মায়ের মতো মেরিও তা বুঝতে পারে। মেয়ে দুটি বাঁচাল হলেও হিসেবি। মহুয়া হলে সিনেমা দেখার বদলে তারা সিনেমার কাগজ কিনে নায়ক-নায়িকার কেচ্ছা ঘরে বসে মুখস্থ করে। এদের চটকদার ছবি কেটে পড়ার ঘর সাজায়। বন্যা, দুর্ভিক্ষ, বাপের পাগলামি, মায়ের ধ্বংসযজ্ঞ, বড় বোনের দুর্ভাগ্য তাদের বিচলিত করে না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দুজনের মুখে কোনো প্রকার বাগাড়ম্বর নেই। একমাত্র ভাই যুদ্ধে শহিদ হবে–তারা যেন আগে থেকেই জানত। বড় বোনের অতীতের পথের খোদলগুলো তারা বাঁচিয়ে চলে। যতই ভঙ্গুর হোক পথ পথই। সেই পথে অঙ্কে লেটার মার্ক পাওয়ার মাইলফলক আছে। বীজগণিতের সূত্র মুখস্থ করার জন্য জসিমুল হকের অনুপ্রেরণার তাই তাদের দরকার হবে না। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে পড়ার জন্য বিয়ে না-হওয়ার মতো কলঙ্কেরও তাদের প্রয়োজন নেই। বোন বিএ। তারা বিএ পাস করবে, এটাই স্বাভাবিক। মানুষ ভুল করলে, সেই ভুল শুধরাতে গিয়ে আরেকটা ভুল করে। তাদের জীবনে জসিমুল হক থাকছে না যখন, আবেদের মতো সুযোগসন্ধানী পুরুষও আসবে না। আর যুদ্ধ তো বছর বছর হয় না! প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আর দ্বিতীয়টির মাঝখানে নয় নয় করেও সতেরো বছরের ফারাক ছিল।
