মাঝরাতে ডাক্তার ডাকাও সমস্যা। পরদিন এক কান থেকে দশ কান হবে। কফিলউদ্দিন আহমেদ নিজের ঘুমের ওষুধ মেয়েকে খেতে দেন। দিনের বেলা একই চিকিৎসা চলে। এদিকে মরিয়মের গায়ে একশ চার ডিগ্রি জ্বর। রাতের বেলা ঝাড়ফুঁক আর পানিপড়া দিতে একজন দরবেশ আসেন। বড় চাচি তহুরা বেগম নিজেও তুকতাক জানেন কিছু। দরবেশ বিদায় নিলে তিনি রোগীর শুশ্রূষায় নেমে যান। দোয়া পড়ে পড়ে রোগীর জ্বরতপ্ত শরীরে ফুঁ দিচ্ছেন। অন্যদিকে ঘন-ঘন কপালের জলপট্টি বদলাতে হচ্ছে। লোমশ দুটি হাত কুপির আলোয় কেঁপে কেঁপে গলার ওপর দিয়ে কপালে উঠে যায়। মরিয়ম খপ করে ভিজা ত্যানাসহ হাতটা ধরে ফেলে। একদিকে চাচি চিল্লাচ্ছেন, আরেক দিকে মরিয়ম। রোগীর কথা অস্পষ্ট। তবে বোঝা যায়, জীবন গেলেও সে হাত ছাড়বে না। চাচির মুখটা কাগজের মতো সাদা হয়ে গেছে। তিনি ছাড়া পাওয়া মাত্র ঘর ছেড়ে দৌড়ে পালান। রত্না-ছন্দা পেছনে মুখ টিপে হাসে–কি, শাস্তিটা কেমন হলো? বুক থেকে ওড়না সরে গেলে কিছু বলতে আসুক, তারা বড় বোনকে লেলিয়ে দেবে। মেয়ে দুটির শরীরে মায়াদয়ার বালাই নেই। বয়সটাই হয়তো এমন।
মরিয়মের জ্বর নেমে গেছে। তখনো দুর্বলতা কাটেনি। ভোরবেলায় বাজ পড়ার শব্দে তন্দ্রা ভাঙে। সকাল থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি। ওর ইচ্ছার সঙ্গে সায় দিয়ে সমস্ত দিন একনাগাড়ে বৃষ্টি পড়ে। রাতে, তারপর দিন, তারপর দিন। লাগাতার বৃষ্টি। মহাপ্লাবন আসন্ন। পৃথিবী ভেসে যাক। নুহ নবি ডিঙা নিয়ে হাজির হলেও মরিয়ম ডাঙা ছাড়বে না। সবার সঙ্গে ভেসে যাওয়ার এ সুবর্ণ সুযোগ। কফিলউদ্দিন আহমেদের সদরে যাওয়া বন্ধ। জামাইয়ের চিঠি না আসার দুঃখ নেই। পিয়নও তো রক্তমাংসের মানুষ। বৃষ্টি থামার আগ পর্যন্ত না-পাঠানো চিঠিগুলো ডাকবাক্সেই নিরাপদে থাকুক। মরিয়ম বহুদিনের অনিদ্রা আর জ্বরের পর রাতদিন ঘুমাচ্ছে। বৃষ্টি আর ঘুম। ঘুম আর বৃষ্টি। তার ঘুমন্ত চেতনায় বৃষ্টি হোসপাইপ দিয়ে আশীর্বাদ বর্ষণ করে।
মনোয়ারা বেগমের ধাক্কাধাক্কিতে মরিয়ম একদিন সত্যি সত্যি জেগে ওঠে। মাঝখানে কত দিন কত রাত চলে গেছে হিসাব নেই। মাথার কাছের জানালা খুলে দিয়ে মা খুশিমনে মেয়েকে সুন্দরীর জলাটা দেখান। বন্যার পানিতে তা এখন সমুদুর। রাস্তার চিহ্নমাত্র নেই। ‘মরিয়ম, জামাই কেমুন বোকা মানুষ, দ্যাখ।’ মা হাসতে হাসতে বলেন, ‘খরা থাকতে আইলো না। দুনিয়া অহন ভাইস্যা যাচ্ছে, আইবো ক্যামনে?’ রত্না-ছন্দা বৃষ্টির পানিতে বই-খাতা ভিজিয়ে বাড়ি ফিরেছে। স্কুল পর্যন্ত যেতে পারেনি। তারাও খুশি, ‘মেরিবু কী মজা! দুলাভাই পানি না কমলে আসতে পারবে না। তোমারও ঢাকা যাওয়া বন্ধ। কফিলউদ্দিন আহমেদ মৃদু হেসে দলে যোগ দেন। মেরি ছাড়া বাকি সবাই এখন বিশ্বাস করে, জামাই ঢাকা থেকে আসতে পারছে না, কারণ ফুলতলি গাঁয়ে আসার সব কটা রাস্তাই জলে নিমজ্জিত। এ তাদের তৈরি বিশ্বাস। যে বিশ্বাসের জোরে মৃত্যুর বছর খানেক পরও মন্টু তাদের মাঝে বেঁচে ছিল।
কফিলউদ্দিনের ভিটেবাড়িটা সাগরের বুকে জাহাজের মতো ভাসছে। জলের সীমাহীন বিস্তার তাই অক্লেশে দেখা যায়। আউশ ধান খোসার ভেতর দুগ্ধাবস্থায় তলিয়ে গেছে। দুর্ভিক্ষ আসন্ন। এটা ভাববার বিষয় এই পরিবারেরও। কফিলউদ্দিন আহমেদ যুদ্ধের পর ঘরে কিছু গচ্ছিত রাখা পারত পছন্দ করেন না। তাতেও তার হিসাব আছে। মানুষ সঞ্চয় করে পুত্রসন্তানের জন্য। কন্যারা আজ বাদে কাল চলে যাবে অন্যের বাড়ি। তার দান-খয়রাত তাই মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এখন ঘরে সম্বল বলতে মাটির এক মটকা চাল, গোবর লেপা বাঁশের ছোট ছোট ডুলিতে আগামী মৌসুমের কয়েক পদের বীজধান। মনোয়ারা বেগম বড় মেয়ের সঙ্গে উৎকণ্ঠা ভাগাভাগি করতে চান। কারণ স্বামীকে এসব বলে ফায়দা নেই। মানুষটা মন্টুর নিখোঁজ হওয়ার পর দিন-দুনিয়া থেকে আলগা হয়ে গেছে। যে জায়গাজমির ভার কফিলউদ্দিন আহমেদ আর বইতে পারছেন না, তা পানিতে নিমজ্জিত হয়ে যাওয়ায় তাকে খুশি খুশি দেখায়। একদিন জাহাজের ডেকের মতো বসতবাড়ির কিনারায় দাঁড়িয়ে মেরিকে তিনি তর্জনী তুলে নিজের জমিজমার সীমানা দেখান। পানির নিচের সম্পত্তির হিসাব। ব্যাপারটা পাগলামি। সে ভয়ে ভয়ে আব্বার হাতের স্খলিত চামড়ার ভাঁজ লক্ষ করে। উদ্যত অঙ্গুলি বাতের রোগীর মতো কাঁপছে। সব আমার! অপরাজেয় নাবিকের জলদগম্ভীর কণ্ঠে তিনি উচ্চারণ করেন। সাগরের ঢেউ আরো উত্তাল হয়। দীর্ঘ সামুদ্রিক ভ্রমণের পর বৃদ্ধ নাবিক জাহাজভর্তি মণিমুক্তা হারিয়ে যেন। স্বদেশে ফিরছে। সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে মৃত্যু।
সেই রাতে মা চুপিচুপি বিছানা ছেড়ে উঠে আসেন। ‘মরিয়ম উঠ-উঠ। কী মরার মতো ঘুম মাইয়্যার! আমার যে কেয়ামত অইয়্যা গেল মা। আমি আর পারছি না।’ মনোয়ারা বেগম মেয়ের সামনে বসে খনখনে গলায় কথা বলেন। পাশের ঘরে ছোট মেয়ে দুটি ঘুমাচ্ছে। পাতলা মশারির মতো চারপাশ আবছা অন্ধকার। মা সতর্কতার সঙ্গে এদিক-ওদিক তাকান। ‘তোর বাপ বাঁচবে না, মা।’ মায়ের গলার স্বর খাদে নামে, ‘পুত পুত করে লোকটা শেষ অইয়্যা গেল। আমি চাই–হে আবার শাদি কইর্যা পোলার বাপ হউক।’ মেরি চমকে উঠে বাধা দেয়, ‘না, আম্মা না, এসব কী বলেন, ঘুমাতে যান তো!’ মা থামেন না। ‘আমারে বলতে দে। কথার মাঝখানে হামলাইয়া পড়স ক্যা? আমার অ্যাম্নেও শেষ, ওমেও শেষ। বিয়া করতে চাইলে আমি হ্যাঁরে বাধা দিব না, মরিয়ম।‘’ মেঘভরা আকাশটা আরো ভারী হয়ে তাদের মাথার ওপর নেমে আসে। বজ্রনিনাদে তোলপাড় হয়।’ সব নিরানন্দ, বিস্বাদ। মা-মেয়ে মুখোমুখি। মনোয়ারা বেগমের কথা শেষ হয় না। ‘তুই না কইলে কী, আমি মা, আমি তোর কষ্ট জানি। কপাল একবার ভাঙলে মা গো, আর জোড়া লয় না। কান্দিস না, মরিয়ম। পানি নামলে পর তুই চইল্যা যা। ঢাকার বাড়ি দখল নে। তোর বাপ জাগা-জমি শ্যাষ কইর্যা তই কবরে যাইব।’
