যমজরা কোনোভাবে বড়বোনের মুখাপেক্ষী নয়। তারা তাকে কাছে টানার মতো দূরে ঠেলে দেওয়ার আশ্চর্য ক্ষমতা রাখে। মরিয়ম চলে আসার দিন রিকশায় সুটকেস টেনে তোলা নিয়ে দু’বোনের মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা হলো না। তারা ঘরের পাল্লা ধরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকল। তত দিনে দুজনই জেনে গেছে, বড় বোন দেউলিয়া, বিয়েটা তার ভেঙে গেছে। মরিয়মের জীবনের পরবর্তী অধ্যায় কারো কাছে দৃষ্টান্ত হতে পারে না। বোনের একের পর এক ব্যর্থতা তারা মনে রাখবে, কখনো সেসব নাগালে আসতে দেবে না। রত্না-ছন্দা দূরে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে মরিয়মকে বিদায় জানায়।
কফিলউদ্দিন আহমেদ বানের পানি নেমে যাওয়ার পর থেকে বেশিরভাগ সময় সদরে কাটান। বাজারের চায়ের দোকানগুলো তার উপুড় করা ট্র্যাকের পয়সায় এত বড় দুর্ভিক্ষ সত্ত্বেও টিকে আছে। তিনি দফায় দফায় সেখানে জমি বেচা-কেনার পার্টির সঙ্গে দরদস্তুর করতে বসেন। কাপের পর কাপ ধূমায়িত চা ওড়ে। সঙ্গে নিমকি, গরম গরম জিলিপি। মেয়ের স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে শুনে বাড়িতে সেই যে মৌব্রত নিয়েছেন, মেরি চলে আসার দিনও তা ভাঙেনি। সকাল সকাল রঙচটা কালো ছাতাখানি বগলদাবা করে তিনি আজকেও সদরে গেছেন।
মনোয়ারা বেগম আগে থেকে কিছু জানান না দিয়ে একেবারে শেষ মুহূর্তে মরিয়মের সঙ্গী হলেন। তাতে বাড়ির আধমরা আশ্রিতরা শুধু বিপদের গন্ধ পেল। অন্নদাত্রী বাড়ি নেই তো ফ্যানও নেই। যমজ মেয়ে দুটি তামাশা দেখা ছাড়া তাদের। কোনো কাজেই লাগে না। তারা ঝটপট যার যার থালা-বাটি গুছিয়ে নেয়। মা-মেয়ের খোলা ভ্যানের পেছনে লম্বা এক ভুখা মিছিল। যেন মনোয়ারা বেগম নেতৃত্ব দিচ্ছেন আর মিছিলটা যাচ্ছে রাজধানী অবরোধ করতে। তাদের পেছনে পড়ে থাকে একজোড়া। হতভম্ব মেয়ে আর তিনটা টিনের ঘর। কাঁচা ঘরগুলো ভেঙেচুরে চুলোয় দিয়ে মা-মেয়ে নিশ্চিহ্ন করেছে।
২৩. স্বর্ণযুগ
শহরে ঢুকেই মনোয়ারা বেগমের আত্মবিশ্বাসে টোল খায়। মেয়ের হাত না-ধরে এক কদমও চলতে পারছেন না। ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে কফিলউদ্দিনের ভিটেয় যিনি দাবড়ে বেড়াতেন, শহরের আলো-ছড়ানো রাস্তায় পদে পদে তাকে এখন হোঁচট খেতে হচ্ছে। ‘অহ্, মরিয়ম, জুতাজোড়া খুইল্লা হাতে নে তো মা, মউত্যার জিনিস পিন্দা মানুষ ক্যামনে হাঁটে!’ বাসস্ট্যান্ড থেকে বেরিয়ে মেরি তাড়াতাড়ি একটা রিকশা নেয়। এখন যাবে কোথায়? রায়েরবাজারের বাসায় দু’বছর আগে গোলাম মোস্তফা ভাড়াটে বসিয়েছেন। তা না হলে লুটপাট আর দখলের যা হিড়িক, সেই কবেই বাড়িটা বেহাত হয়ে যেত। আগে তারা ঢাকা শহরে ঢুকেই সরাসরি উঠেছে মগবাজারের বাসায়। এখন দুজন স্বামীবিচ্ছিন্ন নারীর জন্য অপরিচিত ভাড়াটের আশ্রয়, না আত্মীয়ের বাড়ি ভালো? মনোয়ারা বেগমকে জিগ্যেস করেও জবাব মেলে না। রিকশায় আরাম করে বসে তিনি চারপাশটা মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলেন। বাচ্চাদের মতোই তার কৌতূহল। প্রশ্নও অনেক। অনেকদিন পর ঢাকা এসেছেন। শহরটা কেমন হতচ্ছাড়া। এত দালানকোঠা, গাড়িঘোড়া, আলোর ঝলকানি–তবু অন্ধকার দূর হয় না। বোঁচকা বাচকি, বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে দলে দলে মানুষ সব কোথায় যায়? এই না-খাওয়া হাড্ডিসার ছিন্নমূল মানুষগুলো? রিকশাঅলা বলে, লঙ্গরখানায়। সরকার লঙ্গরখানা খুলছে না! ওইহান খাইতে-থাকতো যায়। মনোয়ারা বেগমের তখন ফুলতলি গাঁয়ের ভুখা মিছিলটার কথা মনে পড়ে। শহরে আসতে পারলে লোকগুলো হয়তো খেয়ে-পরে বাঁচত। ভাড়ার অভাবে তিনি তাদের বাসে তুলতে পারলেন না। গন্ডায় গন্ডায় মানুষ, আস্ত একটা বাস তাদের জন্য রিজার্ভ করতে হতো। এ তো হাজার টাকার মামলা। এত টাকা পাবেন কোথায়। মা-মেয়ের বাস ভাড়াই কফিলউদ্দিন আহমেদের পকেট থেকে আগের রাতে সরিয়ে রাখতে হয়েছে। তা-ই দিয়ে দুজন মানুষ কোনোক্রমে বাসে লাফিয়ে ওঠেন। ভুখা মিছিলটা বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তার কিনারে। সারাটা পথ তিনি যেন সাপুড়ের মতো তালি বাজিয়ে বাজিয়ে তাদের বাসস্ট্যান্ডে এনে ছেড়ে দিয়েছেন। লোকগুলো প্রতারিত, ক্ষুব্ধ। কন্ডাক্টর আর দেরি করেনি। জনতা ছোবল মারার আগেই সে উল্টো তালি বাজাতে ড্রাইভার বাস ছেড়ে দেয়।
মনোয়ারা বেগমের আফসোস শেষ হওয়ার আগে পথ শেষ হয়। তাদের রিকশা থামে কফিলউদ্দিন আহমেদের নাম-ঠিকানা লেখা কালো গেটের সামনের অন্ধকার রাস্তায়। গেট খোলা পেয়ে নিঃশব্দে ডাকাতের মতো দুটি নারী বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ে। ঘরের বাইরে বাড়ন্ত হাস্নাহেনার ঝোঁপ, ভেতরে এক দঙ্গল বাচ্চাকাচ্চাসহ এক দরিদ্র কেরানির সংসার। লোকটা স্বভাবে নিরীহ। সময়মতো ভাড়া পরিশোধ করতে না পারলেও সে যে গোবেচারাসাত চড়ে রা করবে না, গোলাম মোস্তফা এ বিষয়টি শুরুতেই বিবেচনায় রেখেছিলেন। এখন তা মা-মেয়ের কাজে লাগে। বাড়িঅলাকে যে স্বচক্ষে দেখেনি, তার পরিবার কেমন, কী বৃত্তান্ত কিছুই যার জানা নেই, সে মরিয়ম আর মনোয়ারা বেগমকে এক কথায় বিশ্বাস করে। রেশনের আটার রুটি থেকে তাদের ভাগ দেয়। বড় ঘরটা মা-মেয়েকে ছেড়ে দিয়ে আধপেটা হাফ ডজন ছেলেমেয়ে নিয়ে চলে যায় পাশের ছোট ঘরে। আগন্তুকরা যেন তার কুটুম। তাদের জন্য সব সে করে পরম নিষ্ঠাভরে, যত্নসহকারে। অন্যদিকে কেরানির স্ত্রী শুরু থেকেই বাকরহিত। তার কাগজের মতো সাদা মুখটা আতঙ্কে আরো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। দুর্ভিক্ষের বাজারে দুজন বাড়তি মানুষ। তার ওপর মৃত্যুর ফরমান হাতে আজরাইলের মতো তারা বাড়িছাড়ার নোটিশ নিয়ে হাজির হয়েছে। মুখে কিছু বলেনি বটে, তবে মা-মেয়ের চেহারা-সুরত দেখেই বোঝা যায়, তারা কষ্টেসৃষ্টে একঘর লোকের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার লোক নয়। হাত-পা ছড়িয়ে থাকাটাই তাদের অভ্যাস। কেরানির বউয়ের ভাবনাটা পরদিনই সত্য হয়।
