যুদ্ধ নিয়ে পরিবারের পাঁচজন প্রাণী কেউ কথা বলে না। গাঁয়ের লোকেরা মরিয়মকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে বাড়ি চলে যায়। কয়েকজন আবার উঠানের মধ্যিখানে হাঁটু ভেঙে ঠায় বসে থাকে। মনোয়ারা বেগম বাসি বা টাটকা যে-কোনো খাবার সাধলেই নিঃশব্দে মাথা দোলায়। মরিয়মের ব্লাউজের কাট, শাড়ি পরার শহুরে ঢং, হাঁটাচলা, পরিষ্কার হাত-পা এসবই আপাতত তাদের কৌতূহলের বিষয়। কাপড়ের নিচের মিলিটারির অত্যাচার-খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখেও ঠিক আন্দাজ করা যায় না। তবে কলঙ্কের খবর–যা রটে তা বটেই।
মনোয়ারা বেগম সময়-অসময় কান্নাকাটি করেন। সবাই মনে করে, মেরিকে দেখে তার মন্টুর কথা মনে পড়ছে। কিন্তু ওই নাম এ বাড়িতে কখনো উচ্চারিত হয় না। গ্রামের টিনের দোচালা প্রাইমারি স্কুলটার নাম এখন শহিদ সাইফুদ্দিন আহমেদ ফুলতলি প্রাথমিক বিদ্যালয়। মুখের জবান থেকে সরে সে জায়গা নিয়েছে এক টুকরা টিনের সাইনবোর্ডে। উপমন্ত্রী জিপে করে এসে তা উদ্বোধন করে গেছেন। সঙ্গে আসা মুজিব কোট পরা সদরের লোকগুলো মন্টুকে বাদ দিয়ে উপমন্ত্রীর নামে আসা যাওয়ার সারাটা পথ শ্লোগান দেয়। কফিলউদ্দিন আহমেদ রেগে টং। শহিদের পিতার নাম ডেকে কিছু বলতে বলা হলে মঞ্চে উঠে তিনি কাঁপতে থাকেন। সদরের অচেনা লোকগুলো ভাবে পুত্রশোক। স্বয়ং চিফ গেস্ট চেয়ার ছেড়ে উঠে আব্বাকে জড়িয়ে ধরে পাশের চেয়ারে বসিয়ে দেন। তখন খই ফোঁটার মতো কতগুলো হাততালি পড়ে। মাঝখানে শ্লোগানের যা ধুয়া ওঠে, সব উপমন্ত্রী আর বঙ্গবন্ধুর নামে। রত্না-ছন্দা হারমোনিয়াম বাজিয়ে দেশাত্মবোধক গান গায়–আমায় গেঁথে দেওনা মাগো, একটা পলাশ ফুলের মালা/ আমি জনম জনম রাখব ধরে ভাই হারানোর জ্বালা। গানটা পুরো গাওয়া হয় না। তারই শোকে কোকিল ডাকে, ফোটে বনের ফুল পর্যন্ত গেয়ে দু’বোন ওড়নায় মুখ চেপে মঞ্চ থেকে নেমে আসে। প্রতিবার রিহার্সেলেও তারা এইটুকুই গাইতে পেরেছে। স্টেজে বসে রুমালে চোখ মোছেন উপমন্ত্রী। কালো মুজিব কোট পরা পেঙ্গুইনের মতো লোকগুলো স্তম্ভিত। তারা বিলম্বে হলেও নেতার দেখাদেখি পকেট থেকে রুমাল বের করে। চোখে পানি নেই শুধু কফিলউদ্দিন আহমেদের। তিনি বাড়ি ফিরে দাদার আমলের উঁচু খাটে সটান শুয়ে পড়েন। টানা দু’দিন খাওয়াদাওয়া দূরে থাক, এক ফোঁটা পানি স্পর্শ করানো গেল না তাকে দিয়ে। মনোয়ারা বেগম চিন্তিত। কাছে গেলে স্বামী মুখ ঘুরিয়ে রাখেন। রাগ কমার পর কথা বলতে শুরু করেন থেমে থেমে। মরিয়মের মা, দেশটা রাজাকারে ছাইয়্যা গেল। মানুষ আর মানুষ নাই। সরকার যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করছে, কারে জিগাইয়্যা করছে? তোমার-আমার পারমিশন নিছিল শেখ মুজিব? মনোয়ারা বেগম ফ্যালফ্যাল করে স্বামীর মুখের দিকে তাকান। খবরের কাগজের সঙ্গে তার সম্বন্ধ নেই। ‘ইসব কী কন, কে কারে জিগ্যাইব, রাজা প্রজারে জিগায় কখনো? পাগল-ছাগলের কথাবার্তা!’ কফিলউদ্দিন আহমেদ চেতে আগুন, ‘তোমার মাথা আর আমার মুণ্ডুরে কই। অশিক্ষিত মাইয়্যা মানুষ!’
মরিয়ম একদিন স্কুল ছুটির পর রত্না-ছন্দার সঙ্গে মন্টুর নাম লেখা সাইনবোর্ডটি দেখতে যায়। স্কুলমাঠের ঘাসে বসে যমজ দু’বোন মেরিকে বলে, ‘তাদের আব্বা স্কুলের উন্নতির জন্য এখন মাসে মাসে টাকা দেন।’ মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলেন, ‘পোলাপানরে পড়ালেখা করাও গো। এইডা পুণ্যের কাজ। আখেরাতে ফল পাইবা।’ আখেরাতের চেয়ে তাদের দরকার ইহকালের সুখ-সুবিধার। বাপের সঙ্গে কামলা দিলে হাতে হাতে নগদ টাকা আসে। পরকালের ভাবনাচিন্তার সময় কোথায়। পুত্রহীন লোকটার কথা কেউ শোনে, কেউ শোনে না। আব্বার পীড়াপীড়িতে বয়স্করাও কিছু দিন খড়ের ব্যানা জ্বালিয়ে নাইট স্কুলে গেছে। আব্বা সরাসরি তদারক করতেন। নাইট স্কুলে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাও করেছিলেন একটা হ্যাঁজাকবাতি কিনে দিয়ে। কিন্তু ছাত্রদের পান-জর্দা খাওয়া জিব সব মোটা মোটা। মাথায়ও পড়া ঢোকে না। ঢুকলেও অদৃশ্য ছিদ্রপথে বেরিয়ে যায়। জিগ্যেস করলে মস্ত বড় হাই তোলে। কেউ কেউ হ্যাজাকের শোঁ-শোঁ গর্জনে নাক ডাকিয়ে ঘুমায়। স্যারের অবস্থা শোচনীয়। বেত নিয়ে বসেও ছাত্রদের মারতে পারেন না। সবাই তার বাবার বয়সি। স্যার ছিলেন অবৈতনিক। তিনি হাল ছেড়ে দিলেন।
রত্না-ছন্দা, তারা যার সুনাম কি দুর্নাম কোনোটারই সমকক্ষ নয়, এমন বোনের সঙ্গে কথা বলে বলে অন্তরঙ্গ হতে চায়। মরিয়ম ধরা দেয় না। তার মনোযোগ অন্যত্র । সে খেয়াল করে, কফিলউদ্দিন আহমেদ মমতাজের চিঠির জন্য রোজ একবার করে সদরে যান। আরো ক্লান্ত আরো অবনমিত হয়ে বাড়ি ফেরেন। বাড়ির কেউ কিছু মুখ ফুটে বলার আগে মরিয়মের ঢাকা চলে যাওয়া উচিত। সেই দিনটা বেশি দূর নয়। কিন্তু ঢাকা গিয়ে উঠবে কোথায়–পুনর্বাসনকেন্দ্রে নাকি বেশ্যাপাড়ায়?
চিন্তায় মরিয়মের রাতে ঘুম হয় না। খালি দুঃস্বপ্ন দেখে। কে যেন তার বুকের ওপর বসে হৃৎপিণ্ডটা চাপছে। লোকটার মুখ দেখা যায় না। চোখ দুটি বিড়ালের চোখের মতো জ্বলজ্বল করে। বুক থেকে গলার কাছে চলে আসে দুটি লোমশ হাত। আঙুলগুলো তামার আংটার মতো। গলা টিপে মারার চেষ্টা করছে। মরিয়ম চিৎকার করে–গলায় গরু জবাই দেওয়ার গোঁ-গোঁ আওয়াজ। কফিলউদ্দিন আহমেদ যখন কুড়াল দিয়ে দরজা ভাঙছেন, তখনো সে সমানে চিৎকার করছে। মনোয়ারা বেগম হারিকেন ধরে আছেন। রত্না-ছন্দা হুমড়ি খেয়ে পড়ে বিছানার ওপর। মরিয়মের নাক দিয়ে মুখ দিয়ে গাঁজলা বের হয়। চোখ দুটি মরা মাছের মতো ওল্টানো, মণি দেখা যায় না এমন।
