নির্জন দুপুরগুলোতে একটা অবয়বহীন বেশ্যালয় যখন মরিয়মের পায়ে পায়ে নাছোড়বান্দার মতো ঘোরে, দালালের মতো প্ররোচিত করে, তখন রত্না-ছন্দার যুগলবন্দি চিঠি আসে ফুলতলি গ্রাম থেকে। চিঠিতে স্বামীসহ মরিয়মকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বি. দ্র. কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় সুন্দরীর জলার ওপর কাঁচা সড়কের নির্মাণকাজ সমাপ্ত। দুলাভাইকে পায়ে হেঁটে শ্বশুরালয়ে আসতে হবে না। ঢাকার বাস থেকে নেমে ভ্যান বা সাইকেল রিকশায় তারা বাড়ির উঠান পর্যন্ত নির্বিঘ্নে পৌঁছে যাবে। তবে বর্ষাকালে ভুখা মানুষের গমের লোভে তৈরি মাটির রাস্তাটার কী দশা হবে কেউ জানে না। তাই মেরি যেন অতিসত্বর স্বামীসহ একবার বেড়িয়ে যায়। চিঠিটা যমজ বোনদের হাত দিয়ে লেখা হলেও মরিয়ম জানে, তাতে বাবা-মায়ের সায় আছে। যে মেয়ে স্বেচ্ছায় ঘরত্যাগী, তাকে তারা স্বহস্তে চিঠি লিখে নিজেদের ছোট করেননি। মরিয়ম নড়েচড়ে বসে। মমতাজের সঙ্গে সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটেছে। বর্তমানে পাকাপাকিভাবে স্ত্রীর জায়গায় বেশ্যা আর ঘরের জায়গায় পার্ক। এই অবস্থায় বেশ্যা হওয়ার চিন্তা স্থগিত রেখে বাবা-মায়ের কাছে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয় সে।
২২. ফেরা
রিকশা থেকে মরিয়মের একা নেমে আসাটা মনোয়ারা বেগম রান্নাঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। চুলার আগুনের তাপে মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। হঠাৎ হাতের খুন্তিটা মাটিতে পড়ে যায়। মরিয়ম উঠানে দাঁড়িয়ে ডাইনির মতো হাসে। মা বিচলিত। সারা দিন এক হাতে চোখ মুছে আরেক হাতে রান্না করেছেন। শেষবার মেরি যখন বাড়ি আসে, সঙ্গে মন্টু ছিল। এবার নিজের নয়, পরের ছেলের আসার কথা। সে জামাই তো। তাই ভালো-মন্দ রাঁধছিলেন। সে-ও আসবে বলে এল না। ঘরের বেড়ায় ঠেস দিয়ে খুন্তিটা মাটি থেকে তুলতে তুলতে তিনি মেয়েকে শুধান, ‘জামাই কই, মরিয়ম? তুই একলা আইলি যে বড়! মেরি তৈরিই ছিল। তার বাড়ি ফেরার ছাড়পত্র মমতাজের জন্য। কিন্তু লোকটা আসেনি। আসবেও না কোনো দিন। দু’দিন আগে-পরে সবাই যা জানতে পারবে, আজ নিজের মাকেও তা বলা যায় না। রত্না-ছন্দা দুই আমন্ত্রণকারী, ছুটে এসে রিকশা থেকে সুটকেস নামায়। মরিয়ম তাদের শেষবার দেখেছে হাফ প্যান্ট পরা, খালি গায়। এখন ব্যালবটম পায়জামা, খাটো কামিজ আর চুলে ঝুঁটি বেঁধে তারা জানতে চাচ্ছে, ‘দুলাভাই কই, মেরিবু? কী ব্যাপার, গরিবের বাড়ি অপছন্দ নাকি সাহেবের?
যমজ কিশোরীরা টেক্কা দিয়ে মরিয়মের সামনে স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করছে। শহর তো দূরস্থ, একটা পাকা সড়ক থেকেও তাদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল বিশাল এক জলাভূমি। হালের মেলবন্ধন-ভুখা মানুষের তৈরি মাটির রাস্তা। সেই সুবাদে ব্যালবটম, খাটো কামিজের চলতি ফ্যাশন। বাড়তি সাজসজ্জা মায়ের পেটের এমন এক বোনের আগমন উপলক্ষে, যে তাদের অচেনা। দেখা-সাক্ষাৎও হয়নি বিশেষ। যমজদের বুঝ হওয়ার আগেই মরিয়ম ঢাকায় নির্বাসিত। তারা বড় হয়েছে অচেনা বড় বোনের ভালোমন্দ কাহিনি শুনতে শুনতে। মা : বইনের স্বভাব পাইছ! কথায় কথায় রাগ করো! বায়না ধরো! বড় চাচি : ওড়না বুহে থায় না, ইক্কিরে মেরির স্বভাব। খেলার সঙ্গীরা : ঘর পালানির বইন, অহ, ঘর পালানির বইন। মিলিটারি তোর দুলাভাই, যাইবি কই পাকিস্তান (কোরাস)। নোয়াখালী থেকে আগত স্কুলের মৌলবি স্যার : তোর বইনের লাহান অইলি না কিল্লাই? হেতি সব কেলাসে ফার্স্ট অইতো! গ্রামের লোকজন : যমইক্কারা ঘোমটা ছাড়া ইস্কুলে যায়। বইনের লাহান দুনিয়া এক করব।
অবশ্য মরিয়মের বিয়ের খবর রাষ্ট্র হওয়ার পর, গত ছয় মাসে গাছের পাতাও বাতাসে নড়া বন্ধ। মা থেকে থেকে শুধু বড় মেয়ের শিশুকালের গল্প বলেন। কবে দাঁত পড়ে দাঁত উঠল। গোসল করাতে নিলে দু’হাতে খালি পানি ছানত, খালি পানি ছানত। হাসলে ছোট থাকতেই গালে টোল পড়ে তার বড় মেয়ের। হায় আল্লা, শাশুড়িআম্মা তো পাগল ছিলেন! কোলে বসিয়ে ঠাট্টা করতেন–অহ্, কফি! তোর মাইয়্যার দি। হাসলে গালোত টোল পড়ে! বড় অইলে ছিনাল অইব। আব্বা হাসতেন। যমজেরা বড় বোনের রূপ-গুণের ছিটেফোঁটাও যে পায়নি, এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর দুঃখ আর ধরে না। এখন উপায়? যার জন্য এত আয়োজন-আদিখ্যেতা, সেই জামাইতো এল না!
মরিয়ম যমজদের ছেড়ে রান্নাঘরে দৌড়ে যায়, মা, মাগো। আমি আইছি। ইশ, কত দিন পরে মা! তোমার জামাই ব্যস্ত মানুষ। খালি কাজ আর কাজ। একদম সময় পায় না। মনোয়ারা বেগমের শরীরটা যেন গাছের খোড়ল থেকে সদ্য পড়া পাখির ছানা। তিরতির করে কাঁপে। তার কম্পন থামাতে শিশুর মতো মাকে বুকে জড়িয়ে ধরে মরিয়ম।
কফিলউদ্দিন আহমেদ দূর থেকেই দেখেছেন, সুন্দরীর জলার ওপর দিয়ে মেরি রিকশা করে আসছে। সঙ্গে জামাই নেই। তিনি কাছারিঘরের বারান্দায় আর দাঁড়িয়ে না থেকে নিঃশব্দে ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়েছেন। মা-মেয়ের টুকরা-টাকরা কথাবার্তা আর কান্নাকাটির পর মরিয়ম ঘরে ঢোকে। সব শুনেও না-শোনার ভান করে আব্বা অবেলায় শুয়ে আছেন বিছানায়। তবে তার পায়ের পাতা জোড়া লুঙ্গির বাইরে, নাঙা। মেরি পা ছুঁয়ে সালাম করতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে বসেন। মেয়ে খাটের কিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। পিতা পালঙ্কে আসীন। দুজনেরই চোখ জানালাপথে বাইরে–দূরে। যুদ্ধের দমকা হাওয়ায় তাদের জীবন ওলট-পালট হয়ে গেছে। কারো মুখে কথা নেই। তারা বাইরে তাকিয়ে গোধূলির ম্লান আলোয় কী যেন খোঁজে। সন্তানদের সঙ্গে কফিলউদ্দিন আহমেদের সম্পর্কটা অদ্ভুত। ভালো সময়ও কে কী নিয়ে কথা বলবে বুঝতে পারে না। রত্না হারিকেন হাতে ঘরে ঢুকতে নীরবতায় ছেদ পড়ে। ‘রাত না অইতে বাত্তি কা?’ আব্বা তেড়ে ওঠেন, নিবা নিবা! কেরোসিনের যা দাম! এরপর মাগরিবের আজান, পড়ার আগ পর্যন্ত তিনি মরিয়মের সঙ্গে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি, শেখ সাহেব যে একজন অযোগ্য শাসক এ নিয়ে কথা বলে, মাথায় টুপি চড়িয়ে মসজিদে চলে যান।
