মরিয়মের একাত্তরের ক্ষতে মমতাজ দাঁত বসায়, মুখ দিয়ে অনবরত খিস্তি-খেউড় করে। মদ মমতাজ আগেও খেত। টাকা হওয়ার পর বেশি বেশি খাচ্ছে। একদিন মাতাল অবস্থায় এক বোতল হুইস্কি উপুড় করে ঢেলে দেয় স্ত্রীর যৌনাঙ্গে। পরদিন আহত স্ত্রীকে বিছানায় ফেলে কাজে যেতে তার ভয় হয়। মেয়েটি পালিয়ে যেতে পারে। যদি না-ও পালায়, পাড়াপড়শি কেউ এ অবস্থায় দেখে ফেললে থানা-পুলিশ করবে। এসব ঝুটঝামেলা থেকে বাঁচার জন্য তখন সে যা করে, তা যুদ্ধের সময় পাকিস্তান আর্মি মরিয়মদের সঙ্গে করেছে। মমতাজ জানালার কপাট পেরেক ঠুকে বন্ধ করে, দরজায় তালা লাগিয়ে, চাবি নিয়ে চলে যায়। কিন্তু মরিয়মকে উদ্ধার করতে খোলা জিপ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা আর আসে না। দূর থেকে মা মা চিৎকারটা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো বারবার ফিরে আসে, চলেও যায় দূর থেকে দূরে। বহু আগে নিয়াজির আত্মসমর্পণের পর্ব সমাপ্ত হয়েছে। মিত্রবাহিনী বিজয়ীর বেশে ফিরে গেছে নিজের দেশে। দিল্লি চুক্তি অনুসারে পাকিস্তান থেকে বাঙালিদের প্রত্যাগমনও শেষ। অভিযুক্ত জেনারেলরা ভারতে কয়েদ খেটে চলে গেছে ভাঙা পাকিস্তানে। একটা দেশ কতবার স্বাধীন হবে?
তবে এসব দিনে মমতাজ খুব তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরে। আতঙ্কই তাকে বেশি সময় বাইরে থাকতে দেয় না। ঘরে ফিরে কাপড়চোপড় না ছেড়েই স্ত্রীর শুশ্রূষায় লেগে যায়। হাতে-পায়ে ধরে মাফ চায়, কান্নাকাটি করে। এ বিষয়টা নতুন-যা পাকিস্তান আর্মি করত না। মরিয়ম সঙ্গে সঙ্গে মাফ করে দিয়ে ভাবে, ক্ষমার মধ্য দিয়ে তাদের বিবাহিত জীবন নতুন করে শুরু হবে। তা না হলে আবারও কর্মজীবী হোস্টেল-বিকাল-সন্ধ্যায় ঝালমুড়ি-চানাচুর খাওয়া, আলো-আঁধারে রাস্তায় পায়চারি করা, নাটক-সিনেমা দেখতে দেখতে আবার একটা ভঙ্গুর বিয়ের প্রস্তাব। তার সঙ্গের বহু মেয়ের এখনো সামাজিক পুনর্বাসন বাকি। প্রতিদ্বন্দ্বী এখনো আছেই। তার ওপর খেলার নিয়মানুযায়ী একটা চেয়ার কম। মরিয়ম সেই ঝুঁকি দ্বিতীয়বার নিতে চায় না। কয়েকটা দিন মমতাজের সঙ্গে তার ভালো কাটে। বর শাড়ি, চুড়ি, ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে কাজ থেকে ফেরে। সিল্ক শাড়ি কিনলেও কখনো লাল গোলাপ আনে না। গজল শোনার, আবৃত্তি করার অভ্যাসও তার নেই। তবু মেজর ইশতিয়াকের কথা মরিয়মের মনে পড়ে না। সম্পর্ক ভালো থাকার কয়েকটা দিন মমতাজ স্ত্রীকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যায়। দীপ জ্বেলে যাই বা হারানো সুর। হল ভাঙার পর উত্তম-সুচিত্রার রোমান্টিক মেজাজে তারা রিকশায় ওঠে। মমতাজ শিস বাজায়–এই রাত তোমার আমার/ শুধুই দুজনার। রাতে মরিয়মের কোলে মাথা রেখে, স্টুডিওর ব্যাকড্রপের শিউলিগাছ থেকে বিছানায় টুপটাপ কাগজের ফুল পড়ার সে স্বপ্ন দেখে। ডাগর নয়না সুচিত্রা সেন কোল পেতে দিয়েছে। নিজে সে কখনো বসন্ত চৌধুরী কখনো উত্তমকুমার। মোহিনীর কণ্ঠে ঝরে, তুমি যে আমার দিশা অতল অন্ধকারে…। মরিয়ম নির্বাক। পীড়াপীড়ি করলে অর্থহীন আওয়াজ করে। শিউলি ফুলের বদলে মুখের ওপর চোখের পানি টুপটাপ ঝরে পড়লে মমতাজের স্বপ্নটা ছুটে পালায়। সামনে ড্রিম লাইটের আলোয় ঠিকরে বেরিয়ে আসা একজোড়া মরা মাছের চোখ। মোহিনীর মাথাটা পেছনে হেলানো। হলরুমের কড়িবর্গার কম্পন মরা চোখে ঝড় তোলে। সেই ঝড়ে দেয়ালগুলো কাপে ঠকঠকিয়ে। ছাদটা সরে সরে যায়। তখন মমতাজের মাথার ঠিক থাকে না। যার যুদ্ধের কোনো স্মৃতি নেই, গল্প নেই, সে একের পর এক পাকিস্তানি আর্মির মতো আচরণ করতে থাকে।
মরিয়ম নিজেকে ধিক্কার দেয়–হাঁদারাম! বিয়ে কী এখনো জানে না। লোকটাকে যদি পার্কেই ফিরে যেতে হয়, সে ঘরে বউ রাখবে কেন। মরিয়ম চিন্তা করে দেখে, ভালোবাসাহীন শরীরী সম্পর্ক একপ্রকার ধর্ষণই, পুরুষটি স্বামী হলেও। এখন প্রশ্ন হচ্ছে–ভালোবাসার অর্থ কী। সংগম আর ধর্ষণের ফারাক কতখানি। মমতাজ হলঘরের লোকগুলোর মতো মদের গন্ধ নিয়ে বারে বারে আসে। তার হুইস্কির গন্ধটাও উকট। বন্দিজীবনের স্মৃতি-জাগানিয়া। মরিয়ম তাকে মদ খেতে বারণ করলে মমতাজ বলে মদ জিনিসটা খারাপ–সে জানে। বেশ্যা আরো খারাপ। মরিয়ম তার কাছে একজন বেশ্যা। তবে ভদ্র, শিক্ষিত আর মার্জিত রুচির। এ ছাড়া সে পার্কে থাকে না, ঘরে ঘুমায়।
বিবেচনাটা অতি সংকীর্ণ। ঘর না হয় পার্ক, পার্ক না হয় ঘর।
অনুরাধার ভবিষ্যদ্বাণী দেরিতে হলেও ফলতে শুরু করে। এখন মরিয়ম কেন বেশ্যার আসন আলোকিত করে একজন পুরুষের ঘর করবে? তাতে সুবিধা কী? সুবিধা এই যে, সারা দিন লাইনে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যায় রেশন নিয়ে তাকে বাড়ি ফিরতে হয় না। কাপড়-চোপড়ের কষ্ট নেই। বাড়িতে বন্দি থাকতেও সে অভ্যস্ত। তা একাত্তরের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের এক্সটেনশন। যুদ্ধটা টুকরো টুকরো হয়ে তার জীবনে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু ধর্ষণ-নির্যাতন কারো ওপর জীবনভর চলতে পারে না। তাহলে কি সে ঠাই বদলাবে? পুনর্বাসনকেন্দ্রে কতবার ফেরা যায়! সেখানে যেতে না চাইলে বা জায়গা না পেলে বাকি থাকে যা, তা বেশ্যালয়। সে জায়গাটা দেখতে কী রকম? সেখানে মেয়েরা একবার ঢুকলে আর বেরোতে পারে না। কবরের মতো স্থায়ী এমন এক ঠিকানাই হয়তো তার দরকার।
