ফুলতলি গাঁয়ের পর মরিয়মের প্রতিটা আবাস কোনো-না-কোনোভাবে উচ্ছেদ হওয়া মানুষের। তারা রাজনৈতিক উদ্বাস্তু। একেকবার একেকটা নতুন দেশের জন্মের সঙ্গে ভিটেছাড়া হয়েছে। ঘটনাচক্রে মরিয়ম ভোগদখলকারী। সে চাকরি ছেড়ে দিয়ে (বিয়ের শর্ত ছিল) অন্যের ঘরবাড়ি নিজের মতো করে সাজায়। বিছানায় জাজিম পাতে। ওপরে তুলোভরা নরম তোশক বিছায়। তোশকের আবরণে পুনর্বাসনকেন্দ্রের অসমাপ্ত ফুল-পাতা রঙিন সুতোয় নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তোলে। বালিশের ওয়াড়ে ভালোবাসার দরদি পদ্য লেখে। এ ছত্রগুলো তার যৌবনের সূচনায় ফুলতলি গায়ে থাকতে মালার মতো গাঁথা হয়েছিল। তারপর আবেদের প্রতারণায় আর যুদ্ধের টানাটানিতে ছিঁড়ে গেলেও বিয়ের নাম শুনে অমরসংগীতের মতো বেজে উঠেছে। বিয়ে বিয়েই–যার-তার সঙ্গে হলেও স্বস্তিকর। বিয়ের ছত্রচ্ছায়ায় দুপুরগুলো মরিয়মের একার। সে এর অতুল বৈভব, সীমাহীন নিরাপত্তা উপভোগ করে। তবে তা মাত্র কয়েক দিন। তারপর সে আর একা থাকে না। নির্জন দুপুরগুলোতে মন্টু, অনুরাধা আর তার জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো দফায় দফায় অতিথি হয়ে আসে। মরিয়মের সাজানো সংসার ঘুরেফিরে দেখে, সূচিকর্মের তারিফ করে, দু-চারটা আজগুবি উপদেশও দেয়। মন্টু বলে, ‘কী হলো মেরিবু, তুমি না বীরাঙ্গনা! তোমার ছাদের অ্যান্টেনায় বাংলাদেশের পতাকা কই?’ অনুরাধা উঠতে-বসতে বাড়িটার খুঁত ধরে। তর্জনী উল্টিয়ে ঠোকা মারে কংক্রিটের দেয়ালে আর পালিশ করা সেগুনকাঠের দরজায়। তার ভবিষ্যদ্বাণী, বাড়িটা কাঁচের স্বর্গ। ‘দেখো মেরি, ঘুমের মধ্যে খান খান হয়ে ভেঙে পড়বে।’ শোভা রানী খিলখিলিয়ে হাসে, ‘ট্যাকা-ট্যাকা–দুনিয়ায় শুধা টাকার খেলা।’ মেজর ইশতিয়াক চোরের মতো বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে চলে যায়। ঘরে ঢোকার তার সাহস হয় না। রমিজ শেখ বাহুল্য, তার অস্তিত্ব না থাকলেই যেন। ভালো ছিল। যদিও ঝক ঝক গুলি কচুরিপানার মতো দু’হাতে ঠেলে মরিয়মের দিকে সে সাঁতরে আসছিল। তারপর আর পারেনি, সেখান থেকেই উড়াল দেয় শূন্যে। আলো-বাতাসের বানডাকা দুপুরেও মরিয়মের নতুন সংসারে একাত্তরের হলঘরের গুমোট ভাব। দরজা-জানালা খুলে দিলে হারানো দিনের মানুষেরা ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে। একে একে দখল নেয় বিছানা, চেয়ার, সোফা, কার্পেট, দরজার চৌকাঠ-সব।
মমতাজ সন্ধ্যায় ফিরে এলে মরিয়ম অভিযোগ করে, দুপুরে একা একা তার সময় কাটে না। ঘর গোছানোর কাজ শেষ। এখন সে কী করবে। বাসায় চাকরবাকর থাকলেও কথা ছিল। এটা-সেটা বলে, কাজের ফরমাশ দিয়ে সময় কাটানো যেত। মমতাজের কাজের লোক রাখতে আপত্তির কারণ, মরিয়ম যে বীরাঙ্গনা তারা তা জানার পর দুপুরে আর ঘরে থাকবে না। মহল্লার ঘরে ঘরে হানা দেবে। এ বাড়ির চাকর থেকে আরেক বাড়ির চাকর। এক কান থেকে দশ কান। ওই আমগাছঅলা বাড়ির বিবিসাবরে মিলিটারিরা বেইজ্জত করছে। হেই দুঃখে রাইত অইলেই সাহেবডায় বোতল খুইল্যা বসে। এসব রটনার পর বাড়িটা আর বাড়ি থাকবে না, সকাল-বিকাল দর্শনার্থীদের ভিড়ের ঠেলায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর হয়ে যাবে। তাহলে কি মরিয়ম চাকরিতে ফিরে যাবে? তাতেও বর রাজি নয়। অফিসে তার পরিচয় একজন স্টাফের চেয়েও বীরাঙ্গনার। পিয়ন থেকে বস সবাই তা জানে। বর্তমানে ঘরে স্বামী আছে কি নেই, গ্রাহ্যও করবে না। উল্টো ফাউ খেতে চাইবে, ‘খানেদের দেহ দিতে পারলে, আমরা কী অপরাধ করছি, আমাদের একটু-আধটু দিলেই হয়!’ বাকি থাকে মরিয়মের শ্বশুরকুলের আত্মীয়স্বজন। যারা গ্রামে থাকে বলে মমতাজ দাবি করে, এত বড় বাড়ি, তারা স্বচ্ছন্দে এখানে এসে থাকতে পারেন। ‘তা পারেন।’ মমতাজ রাগ গোপন করে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, ‘তবে কথা হচ্ছে কি, সুখে থাকলে ভূতে কিলায়। শাশুড়ি-ননদে চুল ধইরা হ্যাঁচকা টান মারলে ভালো লাগবে? বলে যদি একাত্তরের খানকি মাগি–তখন!’
সব কথার শেষ কথা–খানকি মাগি নয়, বীরাঙ্গনা। মমতাজ নিজে বলে না। অদৃশ্য মানুষদের ছুতোয় সে তার ‘আসল’ পরিচয়টা বারবার শুনিয়ে দেয়। এ ছাড়া যুদ্ধ নিয়ে কথা নেই। সে নয় মাস কোথায় ছিল? রমনা পার্কে? রমনার কালীমন্দিরটা ভাঙা হলো যখন, তখন কোথায় ছিল। নাকি ওখানেও ছিল না! এই লোকের অতীত। কী, ভবিষ্যৎ কোথায়। এখন দু’হাতে টাকা কামাচ্ছে আর উড়াচ্ছে। মরিয়ম কেন। তাকে বিয়ে করল? বীরাঙ্গনার সামাজিক পুনর্বাসনের জন্য? নাকি সে বাচ্চা চায় বলে? পাকিস্তান আর্মির নয়, বাঙালির বাচ্চা। মমতাজ বলে, ‘এত তাড়াতাড়ি বাচ্চা কীসের। সবে তো বিয়া অইলো। জীবনটা আগে উপভোগ করি, তারপর দেখা যাবে।’
উপভোগের বিষয়টা আরো বিভ্রান্তিকর। মমতাজ তাকে জাপটে ধরলে, মরা মাছের মতো মরিয়মের চোখ দুটি বেরিয়ে আসে। আগেভাগে শরীর খুলে যায়। জোরে জোরে দম নিতে শুরু করে। ফাঁদে পড়া ইঁদুরের মতো হৃৎপিণ্ডটা বেদম লাফায়। প্রথম প্রথম মমতাজের বিষয়টা অস্বাভাবিক লাগেনি। কারণ পার্কের বেশ্যারাও এক হাতে টাকা নেয়, আরেক হাতে পোশাক ফাঁক করে ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ে। আদর-সোহাগ সেখানে অবান্তর। পুলিশ অকুস্থলে পৌঁছোনোর আগেই যত তাড়াতাড়ি কাজ শেষ হয়, ততই উভয়ের জন্য মঙ্গল। কিন্তু ঘর পার্কের বিকল্প আর বিছানাটা বিকল্প ঘাসশয্যার। তবে স্ত্রী কেন বেশ্যার মতো আচরণ করে? স্বামীর সঙ্গে যখন-তখন শোয়ায় না’ নেই। কার্যত সে অংশও নেয় না। পুরোটা সময় পিস্তলের মুখে যেন সারেন্ডার করে পড়ে থাকে। এ অবস্থায় স্ত্রীকে সক্রিয় করার তাগিদে মমতাজ দিনে দিনে রূপ নেয় ধর্ষকের–চার বছর আগেকার পাকিস্তান আর্মির।
