সন্ধ্যার পর রমনা পার্কে বেশ্যার শরীর বেচাকিনির হাট। ওখান থেকে একদল খদ্দের দলচ্যুত হয়ে একদিন বেরিয়ে পড়ে। ঘাসের ওপর দিনের পর দিন বেশ্যাগমন একঘেয়ে, ক্লান্তিকর। তার ওপর পুলিশের উৎপাত। তারা হাঁটতে হাঁটতে নির্জন রাস্তায় প্রবেশ করে, যেখানে মরিয়মরা সেজেগুজে আগে থেকেই ঘোরাঘুরি করছিল। মেয়েরা চানাচুর-ঝালমুড়ির ঠোঙাগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। পুরুষদের হাত ধরে নাট্যশালায় ঢোকে। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে পাশাপাশি দুটি চেয়ারে একজন বীরাঙ্গনা আর রমনা পার্কের একজন প্রাক্তন খদ্দের–তারা জোড়ায় জোড়ায় ঝালমুড়ি চানাচুর খায়, নাটক দেখে। যাদের উচ্চমার্গের নাট্যকলা বুঝতে অসুবিধা, তারা জোড় বেঁধে চলে যায় বলাকা, নাজ বা মধুমিতায়। সিনেমাহলগুলোতে বধূ মাতা কন্যা, কাঁচের স্বর্গ, জীবন সঙ্গীত দ্বিতীয় সপ্তাহেও হাউসফুল। তুলনায় গোপালভাঁড় ছবিটা পাত পায় কম। বাঙালি আসলে হাসতে ভুলে গেছে। রমনা পার্কের প্রাক্তন খদ্দেরদের কেউ কেউ ভাড়ামি দেখতে চাইলে মেয়েরা তাতে বাদ সাধে। বলে, ‘গোপালভাড় নামটা শুনলেই খালি হাসি পায়। লোকটা জানি কেমন!’ এসব কথার কথা। আসলে রঙ্গ-তামাশা দেখার জন্য তারা এই জোড় বাঁধেনি। একঘেয়েমি কাটানো বা রুচি বদলের মতো বিলাসিতাও তাদের নেই। দেশ বা জাতি যে সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ, যাকে বলে বীরাঙ্গনার সামাজিক পুনর্বাসন–সেই গুরুদায়িত্ব এখন তাদের কাঁধে। যে সকল নেতা-নেত্রী বলে বেড়াচ্ছিলেন, ‘এত বড় একটা দুর্যোগ আমরা তো ওভারকাম করেছি,’ তাদের আত্মতৃপ্তির ফাটল দিয়ে মরিয়মরা রাস্তায় এসে পড়েছে। যা করার এখন নিজেদেরই মেরে-কেটে করতে হবে। এ ব্যাপারে পত্রিকাগুলো সহায়ক ভূমিকা নেয়। তারা চুলে মুখ ঢাকা এক বীরাঙ্গনার ছবি অনবরত কাগজে ছাপিয়ে আগে থেকেই তাদের অবয়বশূন্য করে রেখেছিল। আর সরকারের পক্ষে-বিপক্ষে স্লোগান দেওয়া বা প্রেস কনফারেন্স করা থেকে বিরত থাকায় বরাবরই তারা কণ্ঠহীন। ফলে অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহ তো বটেই দিনের আলোতেও কেউ তাদের শনাক্ত করতে পারে না। তারা একরাশ ঘন কালো চুলের আড়াল নিয়ে, চানাচুর-ঝালমুড়ি খেতে খেতে, নাটক বা সিনেমা দেখতে দেখতে জাতীয় সমস্যা সমাধানে এগিয়ে যায়।
মমতাজ নামটা মরিয়ম এযাবৎ ভেবেছে মেয়েদের। তবে সে পুরুষই। পরিচয় পর্বে লোকটা সদর্পে জানায়, রমনা পার্কের বেশ্যাদের সে একজন প্রাক্তন খদ্দের। পেশায় ব্যবসায়ী। অস্ত্রহাতে যুদ্ধ না করলেও মনেপ্রাণে একজন মুক্তিযোদ্ধা। সেই সুবাদে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট জোগাড় হয়ে গেছে। তাই দিয়ে ব্যবসার লাইসেন্সও জুটেছে। কাজটা যে রিলিফের চাল, গম, কম্বল কালোবাজারে কিনে খোলা বাজারে বিক্রির, মরিয়ম পরে তা জানতে পারবে। আপাতত হবু বর ঘাসের শয্যা ছেড়ে ঘরের নিরাপদ বিছানায় ফিরতে চায়। মরিয়মেরও ঘরে ফেরা দরকার। প্রথম ঘর, তারপর সমাজ–বিয়ের মাধ্যমে বীরাঙ্গনার সামাজিক পুনর্বাসন।
নাটক-সিনেমা দেখতে দেখতে, ঝালমুড়ি-চানাচুর চিবোনোর এক ফাঁকে মমতাজ একদিন তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মরিয়ম তাতে মিউজিক্যাল চেয়ারে ত্বরিত বসে পড়ার রেফারির বাঁশির সংকেত শোনে। আর বিয়েটাও হয়ে যায় সামনের খালি চেয়ারে ঝপ করে বসে পড়ার মতো। বীরাঙ্গনা, অ-বীরাঙ্গনা মিলিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলই। তার ওপর খেলার নিয়মানুযায়ী একটা চেয়ার কম। তবে ভয়টা তার অন্যত্র। শিরীষ অরণ্যের ছত্রচ্ছায়ার বাদাম-পর্বে আবেদও বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। বিছানায় যাওয়ার পর দিনক্ষণ পেছাতে পেছাতে একসময় প্রস্তাবটা নাই হয়ে যায়। একই ভুল মানুষ দুইবার করতে পারে না, যার আবার নয় মাসের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সে হোস্টেল-বান্ধবীদের পরামর্শ বাতিল করে দিয়ে, বীরাঙ্গনার মুখের ওপর থেকে নেকাব সরানোর মতো কেশগুচ্ছ সরিয়ে নেয়। মমতাজ উদার পুরুষ। বীরাঙ্গনাকে জীবনসাথিরূপে পেলে, সে বলে, তার পুরুষজনমই সার্থক। এত দিন পর সে এমন একটা কাজ করতে যাচ্ছে, যা দশটা মুক্তিযুদ্ধের সমান গৌরবের। সেলাই মেশিন, হড়িকুড়ি কিছুই চাই না। শামিয়ানা টাঙিয়ে মাইক বাজানোরও দরকার নেই। পত্রিকায় সচিত্র-সংবাদ না-ছাপিয়ে বীরাঙ্গনার বিয়ে হবে। মরিয়ম সব জানিয়ে বাবা-মাকে একই খামে আলাদা দুটি চিঠি পাঠায়।
ছুঁচোর লাথি খাওয়া হাতি শেষ পর্যন্ত গর্ত থেকে উঠে দাঁড়াল। তাদের বীরাঙ্গনা কন্যার লালা-ঝরা, জড়বুদ্ধির অমানুষের সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে না। পাত্র রীতিমতো অবস্থাসম্পন্ন, উদার, লেখাপড়া জানা। কফিলউদ্দিন আহমেদ সেদিনের ডাকেই সুখবরটা গোলাম মোস্তফাঁকে জানিয়ে দেন। মরিয়ম নয় মাসের যুদ্ধ, অগণিত লাশ, ভাঙা ব্রিজ ও কালভার্ট, পোড়া ঘরবাড়ি আর দোকানপাট পেছনে ফেলে, একটা মৃত্যুর পর, চব্বিশ বছর বয়সে নতুন জীবনে প্রবেশ করে।
নবদম্পতির সংসার শুরু হয় এক অবাঙালি পরিবারের পরিত্যক্ত বাড়িতে। এর। দরজা-জানালা, স্যানেটারি ও ইলেকট্রিক ফিটিংস মমতাজ দখল নেওয়ার আগে উধাও হয়ে গেছে। আসবাবপত্র সরানো হয়েছে নিশ্চয় তারও আগে। সে দেদার টাকা খরচ করে বাড়িটা মেরামত করে। অদৃশ্য মালিককে টেক্কা দিয়ে কেনে অট্টালিকার সঙ্গে মানানসই দামি আসবাব আর ঘর সাজানোর জিনিসপত্র। তারপর আনে বউ। ঘর পার্কের বিকল্প আর বিছানাটা বিকল্প ঘাসের শয্যার।
