ডুবন্ত চাঁদের আলোয় কফিলউদ্দিন আহমেদ মাটি খুঁড়ছেন। ষাটোর্ধ্ব পেশি শাবলের সঙ্গে ওঠানামা করছে স্বাভাবিকের চেয়ে ক্ষিপ্রগতিতে। তালহীন। এ বেতাল অবস্থাটা বিছানা থেকে তার সঙ্গ নিয়েছে। কাকভোরে বাড়ির চারকোনায় বড় বড় চারটি গর্ত তৈরি হয়। তা থেকে বেরোয় পবিত্র চারটি বোতল, যা টুটাফাটা। তিনি সেসব আছড়ে-আছড়ে গুঁড়ো করে টুকরিতে ভরেন। এবার দ্বিতীয় অভিযান। স্থান পাতকুয়া। দিনের আলোয় ঘামে ভেজা মানুষটি বিকট আকার ধারণ করে। মনোয়ারা বেগম ছোট মেয়ে দুটিকে নিয়ে বাধা দেন। কাজ হয় না। তাদের চেঁচামেচিতে পড়শি একজন বেরিয়ে আসে। সে জানায়, কুয়া খোঁড়ার এখতিয়ার কফিলউদ্দিন আহমেদের নেই। যদিও তার নিজের জায়গায় নিজস্ব খরচে তৈরি এই পাতকুয়া। যারা কুয়াটা বন্ধ করেছে, সরকারের অনুমতি নিয়ে তারাই কেবল খুঁড়তে পারবে। তা ছাড়া পাড়ার মুরুব্বি হাজি সাহেব মন্টুর কুলখানির রাতেই ফিরে এসেছেন। এসব কাজে এখন। থেকে তার পারমিশন আবশ্যক।
হাজি সাহেবের নাম শুনে কফিলউদ্দিন আহমেদ শাবল ছেড়ে দেন। কাঁচ-ভাঙায় ভর্তি টুকরিটা উল্টে পড়ে। শিশুর মতো ভীত একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। যাদের লুকিয়ে থাকার কথা, তারা আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে আসছে! যেন গর্ত থেকে সাপ। মন্টুর মৃত্যুসংবাদ শোনার পর হাজি সাহেব আর বিলম্ব করেননি। পথের কাঁটা চিরতরে সরে গেছে। এই সুবর্ণ সুযোগ। এবার তাহলে গোলাম মোস্তফার মতো আমেরিকাপন্থি হয়ে তিনি ফাইট করবেন? কী হলো দেশটার? যুদ্ধ তাহলে শেষ হয়নি! পুত্রকামনায় গত রাতে যে মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন, তিনি যুদ্ধে হারানো মৃত সন্তানদের জন্য চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। রত্না-ছন্দা বিচলিত। মন্টুর কুলখানির রাতে হাজি সাহেবের ফিরে আসার সম্পর্ক তারা বুঝতে পারে না। এ বাড়ির ইতিহাসও তাদের অজানা। তাই বোতল আর পাতকুয়া রহস্যজনক মনে হয়। এসব রহস্যের প্রদর্শনী কেবল একটি আদর্শ জাদুঘরেই হওয়া সম্ভব। তবু বাবা-মায়ের সঙ্গে ফুলতলি গায়ে ফেরার আগে, ছোট ছোট হাতে মাটি দিয়ে তারা গর্ত চারটি ভরে দেয়। আর কুয়ার বুনো ঘাস সাফ করে তাতে একটা হাস্নাহেনার চারা রোপণ করে। বুদ্ধিটা যমজদের নিজস্ব। হাস্নাহেনা ফুলের সুবাসে রাতের বেলা সাপ আসবে। তাদের একমাত্র ভাই যুদ্ধে মারা গেছে। বড় বোন ঘরত্যাগী। যমজদের বড় হওয়া পর্যন্ত বাড়িটা পাহারা দেবে মন্ত্রপড়া বোতলের পরিবর্তে বিষধর সর্পকুল।
২১. পার্কের বিকল্প ঘর, ঘাসের বিকল্প তোশক
পুত্রসন্তানের জন্য বাড়ি তৈরি হলেও এর প্রথম বাসিন্দা মরিয়ম। কোনো-না কোনোভাবে তার হক থেকেই যায়। যদিও সে এখন ঘরছাড়া, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ক্রমাগত ঠিকানা বদলে চলেছে। তবে যুদ্ধের সময়ের মতো দল বেঁধে নয়। একা একা। রিনাদের বাসা, পুনর্বাসনকেন্দ্র, তারপর নিউ ইস্কাটন রোডের বাড়ি হয়ে সে এখন কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে। তার মতো আরো ক’জন বীরাঙ্গনা আছে এখানে। তাদের চাকরিস্থল ভিন্ন ভিন্ন। যে দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে এই মেয়েরা ধর্ষিত হলো, চাকরি করা ছাড়া সেই দেশের পুনর্গঠন কাজে কি লুটপাটের মধ্যে তারা নেই। তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিপ্লবী মনোভাব নিয়ে চোরাচালান প্রতিরোধে এগিয়ে আসুন’ ডাকে সাড়া দেয়নি। কলকারখানা রাষ্ট্রীয়করণে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। ঘন ঘন পাটের গুদামে অগ্নিসংযোগ বা আগুন নেভানো কোনোটাই করছে না। খুন-ছিনতাই-রাহাজানি সংঘটনে বা এর প্রতিরোধে তারা কখনো এগিয়ে আসেনি। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন, নতুন নতুন আইন তৈরির সময় তারা হাত গুটিয়ে বসে রইল। ‘দালাল আইন ১৯৭২’-এর ফাঁকফোকর নিয়ে মাথা ঘামায়নি। বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা চুপ করে শুনল। রক্ষীবাহিনীর নৃশংসতার বিরুদ্ধে তারা একবারও নিন্দা জানায়নি। সর্বহারাদের শ্রেণিশত্রু খতম অভিযানেও শরিক হলো না। ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইবুনাল অ্যাক্ট, ১৯৭৩’ পাস হওয়ার পর আইনমন্ত্রীকে হাততালি দিয়ে স্বাগত জানায়নি। যদিও অ্যাক্টের ২(ক) ধারায় ‘ধর্ষণ’কে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতিকে যখন জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতা দেওয়া হয়, তখনো এ নিয়ে তারা উচ্চবাচ্য করেনি। তারা বাকশালে যোগ দেয়নি। আসলে তারা একটা লড়াইয়ের মধ্যে ছিল। এজেন্ডা তাদের একটাই–বীরাঙ্গনার সামাজিক পুর্নবাসন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে, যৌতুকের প্রলোভন দেখিয়ে সরকার যে কাজে ব্যর্থ হয়েছে, তারা তা সমাধা করতে অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
কর্মজীবী মেয়েদের হোস্টেলের পাশে জাতীয় নাট্যশালা, অদূরে রমনা পার্ক। আশপাশের রাস্তাগুলো সন্ধ্যার পর নির্জন। লাইটপোস্টের আর গাছগাছালির আলো আঁধারে মরিয়মরা ভালো কাপড়চোপড় পরে ঘুরে বেড়ায়। কাগজের ঠোঙা থেকে চানাচুর, ঝালমুড়ি বের করে ভাগাভাগি করে খায়। টাকা নষ্ট করে টিকিট কিনে নাটক দেখতে যায় না। আলোর নিচে বসে পড়া বা দাঁড়িয়ে থাকা থেকেও বিরত থাকে। তারা কেবল একের পর এক অন্ধকার নির্জন রাস্তায় পাক খেয়ে খেয়ে অন্ধের মতো ঘোরে।
