কফিলউদ্দিন আহমেদ পকেট উজাড় করে টাকা খরচ করেছেন। একমাত্র ছেলে, যে সবে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েছিল, তার জন্য সামনে অনেক খরচাপাতির ব্যাপার ছিল। সেই তুলনায় শত শত কাঙালিভোজ বা পঞ্চাশ-একশ মাওলানা খাওয়ানো কিছুই নয়। তা ছাড়া ছেলেই যখন নেই, কার জন্য ঘরবাড়ি, জমিজমা আর ধনসম্পদ। গোলাম মোস্তফা পরামর্শ দেন, ‘দুলাভাই, বাসাটা ভাড়া দিয়া দেন।’ আগে ঢাকা ছিল প্রাদেশিক রাজধানী, এখন সারা দেশের প্রাণকেন্দ্র। সাহায্য করতে এসে এর ওপর বিদেশিদেরও নজর পড়েছে। হু-হুঁ করে ধানচালের দামের মতো বাড়িভাড়াও বাড়বে। ঢাকার মাটি বিকোবে সোনার দরে। কিন্তু মেরি? নামটা উহ্য থাকলেও সবার মাথায় সে নড়াচড়া করে। এ ব্যাপারেও গোলাম মোস্তফার বক্তব্য আছে। মেয়েটা এবার নিজের পায়ে দাঁড়াক। মানুষ জন্মায় যেমন নিঃস্ব আর একা, কেউ চাক-না-চাক যুদ্ধ তাকে সেই অবস্থায় ফেলে রেখে গেছে। তেইশ বছর বয়সে সে একবার মরে আবার জন্ম নিয়েছে। দ্বিতীয়বার জন্মদানের ভাগিদার তার বাবা-মা নয়। মন্টুর কুলখানিতে মেরির নামেও কোরান খতম হয়েছে। ধরা যাক, এই পাতকুয়াটাই তার কবর। মা-বাবা ওখানে মেয়ের গোর দিয়েছেন। সব চুকেবুকে গেছে। এখন এই নতুন জীবনের দায় তার নিজের, না হয় স্বাধীন বাংলাদেশের। গোলাম মোস্তফা নগণ্য মানুষ। জীবনে লেখাপড়ার ধার ধারেন নাই। তবু সাহস করে শিক্ষিত ভাগনির ভাঙাচোরা জীবনটা গড়ে দিতে চেয়েছিলেন। খোদা যা করে, মানুষের ভালোর জন্যই করে। দুলাভাই, একবার আমার কথা ভাবেন দেখি! একদিকে নিজের ছেলে, আরেক দিকে মায়ের তুল্য বড় বোনের মেয়ে। আমি কার স্বার্থ দেখলাম, নাকি দেখলাম না? কফিলউদ্দিন আহমেদ তার জ্বলন্ত দৃষ্টির সামনে উশখুশ করেন। শোকের বাড়িতে পুরোনো কথা তুলে আর অপমান করা কেন! গোলাম মোস্তফা নাছোড়বান্দা। সুযোগের তিনি কখনো হাতছাড়া করেন না। ছেলেটার যদি খুঁত থাকে, মেয়েটারও আছে, ঠিক কি না। এত যে বুঝলেন দুলাভাই, বলেন দেখি কার খুঁত বেশি–আপনার মেয়ের, না আমার ছেলের?
শ্যালকের মুখের দিকে কফিলউদ্দিন আহমেদ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। খোদা দিন দিয়েছে, যা খুশি বলুক। এসব কথা সহ্য হয় না মনোয়ারা বেগমের। তিনি জায়নামাজ হাতে পাশের ঘরে চলে যান। তাতে গোলাম মোস্তফার যেন হুশ হয়। তিনি সযত্নে কথার মোড় ঘোরান। খোদা যা করে বান্দার ভালোর জন্যই করে। হঠাৎ খুশির চোটে জোরে একটা চাপড় মারেন কফিলউদ্দিন আহমেদের উরুতে, ‘দুলাভাই, রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধা ক’দিন পরই দেখবেন এক ঘাটে জল খাচ্ছে। অবস্থা যত খারাপ ভাবছেন অত খারাপ না। মনে মনে যতই আপনার-আমার শত্রুতা থাক, মুসলমান মুসলমান মাত্র ভাই-ভাইই তো! আর পাক-ভারতও দুইটা দেশ–হিন্দুস্থান আর পাকিস্তান। মাঝখানে বাংলাদেশটা ফাউ। আইজ আছে কাইল নাই।’
গোলাম মোস্তফার বাঁচালতার কারণ বিলম্বে হলেও জানা গেল। আসন্ন বকরি ঈদে তিনি যাচ্ছেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধুকে মোবারকবাদ জানাতে। সরকারের খুব কাছের একজন এই সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এখন লড়াইটা বোঝলেন দুলাভাই, হিন্দুস্থানে আর পাকিস্তানে নাই, তামান দুনিয়াই জড়াই গেছে। খোদার কিরা–এক্কেবারে ভিতরের খবর। গোলাম মোস্তফার মুখ আর কফিলউদ্দিন আহমেদের কান এক জায়গায় চলে আসে। তার কথা শোনা না গেলেও বিষয়টা হলো, আওয়ামী লীগের মধ্যেই এখন দুটি দল–একদল ভারত আর রাশিয়াপন্থি, আরেক দল আমেরিকাপন্থি। দুই পন্থিরা সংখ্যায় সমান সমান। মাঝখানে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছেন বঙ্গবন্ধু। আজন্ম ভারতের শত্রু গোলাম মোস্তফা আওয়ামী লীগের ভেতরে ঢুকে আমেরিকার পক্ষেই এবার ফাইট দেবেন। তার কাজকর্ম শুরু হবে পবিত্র ঈদুল আজহার পরদিন থেকে।
কফিলউদ্দিন আহমেদ মাঝরাতে জেগে ওঠেন প্রচণ্ড এক হাহাকার নিয়ে। স্বপ্নটা কী ছিল মনে নেই। তবে সত্য যা, তিনি পুত্রহীন এবং এ অবস্থায় একদিন দুনিয়া থেকে তাকে বিদায় নিতে হবে। কিন্তু কেন। কার ক্ষতি করেছেন যে, এত বড় সাজাটা তাকে মাথা পেতে নিতে হবে? দিনের বেলায় তিনি যে নিজহাতে মিলাদের মিষ্টি বেঁটেছেন, পকেটের টাকা গুনে গুনে তুলে দিয়েছেন মওলানাদের হাতে, সেসব ছিল লৌকিকতা, যা কেবল দিনেই সম্ভব। মধ্যরাতে তার চিত্ত বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। মৃতপুত্রের আত্মার মাগফেরাত না চেয়ে তিনি চান একটি জীবন্ত পুত্র–যে তার কবরে একদিন মাটি ফেলবে, যখন তিনি থাকবেন না তার রক্ত প্রবাহিত হবে যার ধমনিতে, যে তার নাক দিয়ে দম নিয়ে তারই ফুসফুসে বায়ু সঞ্চালন করবে, যখন তার নাক এমনকি ফুসফুসও থাকবে না। কফিলউদ্দিন আহমেদের একটি পুত্রসন্তান চাই-ই চাই। সেই মতো পরিপূর্ণ তেজ নিয়ে তিনি অগ্রসর হন। মন আর দেহ দুই-ই প্রস্তুত। কিন্তু তার আরোহণ আরেকটা ক্রোধের জন্ম দেয়। স্ত্রী যে আর রজস্বলা হন না, রাতের কুহক এমন যে, তা ভুলিয়ে-ভালিয়ে তাকে ভুল পথে চালিত করেছিল। কাজটা ক্ষমাহীন। শোকার্ত একজন মায়ের জন্য নির্যাতনতুল্য। পুত্রপ্রত্যাশী পিতার বেলায় অপূরণীয় ব্যর্থতা, যা তাকে আরো বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এভাবে একটা ক্রোধ থেকে আরেকটা ক্রোধ-রাতের সঙ্গে সঙ্গে তা বেড়ে চলল। মনোয়ারা বেগম দুঃখে-অপমানে কাঁদতে কাঁদতে দেখলেন, লোকটাকে ঘর ছেড়ে ছায়ার মতো বেরিয়ে যেতে। তার এক হাতে শাবল আরেক হাতে একটা টুকরি।
