বিজ্ঞাপনটা পড়ে যে কালবিলম্ব করেনি, কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে পুরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছে, সে মন্টুর সহযোদ্ধা সরফরাজ হোসেন। ট্রেনিং ক্যাম্পে থাকার। সময় মন্টু বলেছিল, যদি কখনো দরকার হয়, ফুলতলি গাঁয়ের সন্ধানে তাকে গ্রামাঞ্চলে যেতে হবে না, ঢাকা শহরে খুঁজলেই চলবে। সেইমতো সরফরাজ একটা নদী পার হয়। নদীর পাড়েই কুমারদের আবাস। সেখানে ঘূর্ণায়মান চাকার ওপর তাল তাল। মাটি নানান তৈজসপত্রে রূপান্তরিত হচ্ছে। কুম্ভকারের আঙুলের ফাঁকে হাতি, ঘোড়া, টেপা পুতুল। পইন থেকে অগ্নিদগ্ধ হয়ে বের হচ্ছে অবিশ্বাস্য সব জন্তু-জানোয়ার। ভাঙা হাঁড়িকুড়ি আর স্তূপীকৃত ভাঙা ফুলের টবের পাশ দিয়ে সরফরাজকে পথ চিনিয়ে। নিয়ে চলে মন্টু। অদূরের ট্যানারির সে গন্ধ শুঁকে মন্টুরই নাক দিয়ে। কিন্তু বাড়ির সামনে এসে ওর কথামতো বাঁশঝাড়টা দেখতে পায় না। এমনকি বাড়ির ভেতর থেকে। মেরিবু’র যে বেরিয়ে আসার কথা, সে না-এসে আসেন মন্টুর বাবা-মা। তাদের পেছন পেছন ঘরে ঢোকার পর সরফরাজকে ছেড়ে মন্টু পালিয়ে যায়। সে একা এখন কী করবে। তার সামনে উদগ্রীব দুজন মানুষ। দেশের বিজয় নিয়ে তারা এমন মেতেছিল যে, সহযোদ্ধার মৃত্যুসংবাদটিও সময়মতো পরিবারকে জানানোর দায়িত্ববোধ করেনি। সে নিজের ওপর বিরক্ত হয়। হাতের মুঠোতে ভরা খবরের কাগজের টুকরাটার মতো গলার ভেতর মৃত্যুসংবাদটা দলা পাকাতে থাকে। মন্টুর মা সে কিছু বলার আগে কাঁদতে শুরু করেন। বাবা একদম চুপ। ঝড় আসার আগ মুহূর্তে আকাশটা যেমন থমথম করে, বাতাস যেমন বন্ধ হয়ে যায়, সেরকম তার অবস্থা। অতীতকালের রাজা বাদশারা দূরদূরান্ত থেকে যে মৃত্যুখবর বয়ে আনত, তার গর্দান ফেলে দিত।
সরফরাজ গর্দানসহ মন্টুদের বাড়ি থেকে যখন বের হয়, তখনো দিন শেষ হওয়ার অনেকটা সময় বাকি। কিন্তু সে আর দেরি করে না। মন্টু এত দিন যেন বেঁচেই ছিল। তার মৃত্যু হলো আজ, যখন তার বাবা-মা খবরটা জানতে পারলেন। সরফরাজ জোরে জোরে পা চালায়। কারণ ভাঙা হাঁড়িকুড়ি, ফুলের টব, অবিশ্বাস্য সব জন্তুজানোয়ারের পাশ দিয়ে, ট্যানারির গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে তাকে এখন একা ফিরতে হবে।
সেই রাতে মনোয়ারা বেগম নিজের কান্নার শব্দ শুনতে পান না। তবে কুয়ার মাটিচাপা ক্রন্দনটা গুমরে গুমরে ওপরে উঠে সারা পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে। তাতে পড়শিদের ঘুম ভেঙে যায়। তারা রাতের প্রহরে প্রহরে যে ছেলেটার মায়ের বিলাপ শোনে, সে যুদ্ধের আগে কালো কালিতে দেয়ালে শ্লোগান লিখত। তার হস্তাক্ষর ছিল ছাপার অক্ষরের মতো সুন্দর আর পরিচ্ছন্ন। মিলিটারির ভয়ে চুনকাম করে তারা সেসব ঢেকে দিয়েছে। আজ তার মৃত্যুসংবাদ এসেছে। ঘুমভাঙা মানুষদের নিজের হাতে মুছে ফেলা সুন্দর আর পরিচ্ছন্ন সারবাঁধা সব অক্ষর মনে পড়ে। কিন্তু স্লোগানের কথাগুলো স্মরণ হয় না।
পরদিন তিক্ততা ভুলে গোলাম মোস্তফা সপরিবারে ছুটে আসেন। গ্রাম থেকে আনানো হয় ছোট দুটি মেয়ে রত্না আর ছন্দাকে। তারা মনোয়ারা বেগমকে সারা দিন জড়িয়ে ধরে রইল দুধের শিশুর মতো। যে বাড়িতে বড় বোনের পাহারাদারির জন্য মন্টুকে পাঠানো হয়েছিল, সেখানে তার কুলখানির আয়োজন হয়। মেরির নাম একবারও উচ্চারিত হয় না। গোলাম মোস্তফা শুধু বললেন, ছেলেমেয়ে দুজনের নামেই কোরান খতম হোক। কথা শুনে ডুকরে কেঁদে উঠলেন মনোয়ারা বেগম। মেয়ে তো বেঁচে আছে, তার ভাই কী নিষ্ঠুর! তিরিশ জন মাওলানা কুয়ার বুনো ঘাসের ওপর বদনির পানি ঢেলে অজু করে, সাদা চাদরের চারদিকে গোল হয়ে বসেন পবিত্র কোরানপাঠে। তবে দিনকাল ভালো নয় বলে কাজটা এত দ্রুততার সঙ্গে তারা শেষ করেন যে, মনে হলো, এক দরজা দিয়ে ঢুকে আরেক দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। তাদের পবিত্র গুঞ্জন আতর-আগরবাতির সুগন্ধি ধোঁয়ায় পরকালের ভীতিসঞ্চার করে খানিকক্ষণ ভেসে থাকল।
ঢাকার পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে সরফরাজের আগমনের দিনটা মন্টুর মৃত্যুদিন বলে সাব্যস্ত হলো। কারণ কবে কোথায় সে মারা গেছে, ছেলেটি এক-দু’বার বললেও কফিলউদ্দিন আহমেদ বা মনোয়ারা বেগমের অবস্থা ছিল না তা মনে রাখার। এ ছাড়া সংবাদবাহক নিজের ঠিকানা না-দিয়েই যে পথে এসেছিল, সেই পথেই ফিরে গেছে। তার নির্গমনের চতুর্থ দিনে বাড়িতে মিলাদ পড়ানো হয়, সঙ্গে কাঙালিভোজ। যে দেয়ালে যুদ্ধের আগে মন্টু সুন্দর আর পরিচ্ছন্ন হস্তাক্ষরে স্লোগান লিখেছিল, তার কিনার ঘেঁষে ফকির-মিসকিনরা কলাপাতা পেতে খেতে বসেছে। মহিষের মাংস আর লাউয়ের তরকারিতে ভাত মেখে যতবার তারা মুখ উঁচু করে লোকমা তোলে, ততবারই চুনকাম করা একটা সাদা দেয়াল তাদের দৃষ্টি রোধ করে দাঁড়ায়। কারো কারো তাতে অস্বস্তি হয়। তারা রাস্তায় ঝোল ফেলতে ফেলতে একবার এপাশে আসে, আরেকবার ওপাশে যায়। দেশ স্বাধীন হয়েছে, তারা তো এখনো ভিখিরি। কাঙালিভোজে ভালোমন্দ খেতে এসেছে। মানুষের এত অভাব-অভিযোগ থাকতে খালি থাকে নাকি শহরের উঁচু-লম্বা দেয়াল! তবে অল্প কদিনের মধ্যেই সেসব আর সাদা থাকবে না। ভিক্ষুকদের দাবিদাওয়াসহ অন্য রকম অভিযোগ আর ভর্ৎসনায় ভরে যাবে। লিখবে মন্টুর বদলে আরেকজন–সুন্দর আর পরিচ্ছন্ন হস্তাক্ষরে, যে এখন তারই বয়সি।
