সেই রাতে মরিয়মকে সাপে কাটে, মই থেকেও সে পড়ে যায়।
পরদিন অফিসে ঢোকার আগে বড় রাস্তার মুখে দারোয়ান মরিয়মের জন্য অপেক্ষা করে। নতুন পোশাকটার নিচে সে দরদরিয়ে ঘামছে আর সময় জানার জন্য হাতে ঘড়ি না থাকায় ঘন-ঘন আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। আবেদ ভাতিজা হয়েছে তো কী, হঠাৎ বড়লোক, তাই পয়সার গরমি দেখায়। তা না হলে কেউ নিজের অফিসে পুলিশ ডেকে আনে একটা মেয়েকে ধরিয়ে দিতে! তারও তো ঘরে মা-বোন আছে। তাদের পুলিশ ধরলে কেমন লাগবে আবেদ মিয়ার? সব রক্তের দোষ। আবেদের বাপ-চাচারা মামলাবাজ ছিল। নিজের ভালো করতে না পারলেও অন্যের ক্ষতি করতে পিছপা হতো না। আবেদের আপন দাদা, দারোয়ানের আব্বার সব জমিজমা জাল দলিল করে দখলে নিয়ে নেয়। সেই কারণে আবেদ মিয়া আজকে স্যার, সে দারোয়ান। নিকুচি করি চাকরির। রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে দারোয়ানের ইউনিফরম খুলে ফেলে। আর মামলাবাজের নাতির গোলামি নয়, সে একজন মুক্ত মানুষ। স্বাধীন দেশের নাগরিক।
রাস্তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যে রিকশা থামায়, মরিয়ম প্রথম তাকে চিনতে পারে না। ভাবে, রিনার ভাষায় বদমাশদের একজন; পেটকাটা-হাতকাটা, নাভির নিচে শাড়ি পরা মেয়েদের বিরুদ্ধে জাগ্রত যুবসমাজের নামে বাজারে যারা লিফলেট ছেড়েছে, তাদেরই একজন হয়তো ল্যাঙ্গট পরে তার রিকশায় চড়াও হচ্ছে। কিন্তু লোকটা সেরকম নয়, ভদ্র আর বিনয়ী, হাতজোড় করে তাকে সামনে এগোতে বারণ করছে। কেন? আল্লাহর দোহাই, আবেদের দূরসম্পর্কের চাচা ল্যাঙ্গট পরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মরিয়মকে বলে, আবেদ তার ভাতিজা হয়েছে তো কী। অফিসে পুলিশ। মরিয়ম একপাও যেন আর না এগোয়। খোদা সাক্ষী। তাকে সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হবে। আবেদ এখন অফিসের লনে বসিয়ে তাদের চা-নাশতা খাওয়াচ্ছে।
রিকশার চাকা আবার হাতিরপুলের বাসার দিকে ঘুরে যায়। বাসাসংলগ্ন মাঠে বক্তৃতার মঞ্চ বাঁধা হচ্ছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে হাতুড়ি-কাস্তে খচিত লাল ঝান্ডা আর দাবিদাওয়ার অসংখ্য প্ল্যাকার্ড। সর্বহারার মুক্তি আসন্ন। শুধু মজুরি বাড়ালে চলবে না, চাই সমাজতন্ত্র। শিল্প-কারখানার জাতীয়করণ ত্বরান্বিত করতে হবে।
দরজা খুলে দেন রিনার মা। মরিয়মের আজ তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরাটা চাকরির ব্যাপারে তাকে আশান্বিত করে। এখন আর এ বাড়িতে যুদ্ধ নিয়ে, পাকিস্তানি আর্মির অত্যাচার নিয়ে কথা হয় না। বাজারদর, চুরি-ডাকাতি আলোচনার মূল বিষয়। মন্টুর প্রতি যতখানি সহানুভূতি তাদের ছিল, খবরের কাগজে মুক্তিবাহিনীর লুটতরাজ আর খুনখারাবির সংবাদ পড়ে তা-ও উবে গেছে। বেঁচে থাকলে সে তো ডাকাতই হতো। তবু ভালো, ছেলেটা শহিদ হয়ে কলঙ্কের দায় থেকে বাবা-মাকে মুক্তি দিয়ে গেছে। মরিয়মের গলায় তাদের তুলে দেওয়া ভাত আটকে যায়। টেবিলের চড়া দামে কেনা খাবারগুলো মনে হয় দূরের এক ভোজসভার। তাতে হক নেই ওর। রিনা অন্যমনস্ক। গাছ থেকে নামার জন্য তার একটা মই দরকার ছিল, সে তা পেয়েও গেছে।
চাকরির পরিবর্তে মরিয়মকে জেলে পাঠানোর ব্যবস্থা আবেদ যেদিন করে, সেদিনই রিনার নামে মই আঁকা একটি চিঠি আসে। মই আর সাপ। সাপ আর মই । দুর্ভাগ্য আর সৌভাগ্য একটা চৌকো ঘরে পাশাপাশি অবস্থান করে। ছেলেটি চিটাগাং থেকে ঢাকা বদলি হওয়ার যে তদবির করছিল, তা হয়ে গেছে। সে মুক্তিযুদ্ধ করেনি। তবে নয় মাস চাকরি না করায় এই তার পুরস্কার। রিনা খুশিতে অস্থির হয়ে হাফ ডজন পেটকাটা-হাতকাটা ব্লাউজ মরিয়মকে দুম করে দিয়ে দেয়। বলে যে, ছয়টার একটাও তাকে আর ফেরত দিতে হবে না। তবে তার প্রশ্ন–যুদ্ধের নয় মাস, মরিয়ম কী নিয়ে ব্যস্ত ছিল যে, তার সাপ-লুডো খেলা হলো না? তাহলে কি আজকে চাকরি চাকরি করে পথে পথে ঘুরতে হতো! ইশ, কী বোকা মেয়ে, রিনা মরিয়মকে তিরস্কার করে–সে কী করে জানে না যে, সাপ যেখানে, মেয়েদের সৌভাগ্যও সেখানে!
পরদিন মরিয়ম ব্যাগ গোছায়। চাকরির সম্ভাবনা নেই যখন, ঢাকা বসে থেকে কী হবে। খালাম্মা, খালুজানকে বলে, সে আপাতত ফুলতলি গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। তারা খুশি হন। রিনা পেটকাটা-হাতকাটা ব্লাউজের সঙ্গে ম্যাচ করে বড় বড় সূর্যমুখী ছাপার রুবিয়া ভয়েলের শাড়ি তার নাভির নিচে পরিয়ে দেয়। হাতে তুলে দেয় লম্বা ডান্ডার একটা কালো ছাতা, যা জাগ্রত যুবসমাজের মাথায় ব্যবহারের জন্য রাস্তায় তার দরকার হতে পারে। যদিও লিফলেটটা দেখেছে শুধু মরিয়ম আর রিনা কিন্তু খালাম্মা-খালুজান একসঙ্গে হেসে ওঠেন। একটি সুখী-সমৃদ্ধিশীল পরিবারকে পেছনে ফেলে রাস্তায় নামে মরিয়ম। সে ফিরে যাচ্ছে ফুলতলি গায়ে নয়, নারী পুনর্বাসনকেন্দ্রে। সেখানে পৌঁছেই তার প্রথম কাজ হবে পরনের পোশাক ছেড়ে বিনা মূল্যের মিলের শাড়ি আর লম্বা হাতার ব্লাউজ ঝটপট পরে ফেলা।
২০. পিতা-পুত্র
মনোয়ারা বেগম রোজ রাতে মরিয়মের গলায় কার যেন কান্না শোনেন। শব্দটা আসে বোজা কুয়াটার তল থেকে। কী আছে ওখানে, কেন টলটলে পানির কুয়াটা এভাবে মাটি দিয়ে বুজিয়ে ফেলা হলো–স্বামীকে বারবার জিগ্যেস করেও এর কোনো সদুত্তর পান না। তার সান্ত্বনা যে, মেরি যেখানেই থাকুক, বেঁচে আছে। কান্নার আওয়াজটা হয়তো তার কল্পনা। এত বড় একটা যুদ্ধ গেল, কত শত মানুষ মারা গেছে, কত শত স্বজনহারা কণ্ঠের ক্রন্দন, বাতাস কি এর কণামাত্রও ধরে রাখেনি! তার ভেতরটাও তো নিরালে কাঁদে। সময় সময় নিজের কান্নার শব্দে তিনি চমকে ওঠেন। এক মা ছাড়া দুনিয়ার কেউ এর আওয়াজ পায় না। ছেলেটা তার কোথায় গেল। কুয়াটা মন্টুর কবর নয় তো, যা তার কাছে গোপন রাখা হচ্ছে? মনোয়ারা বেগমের পীড়াপীড়িতে মন্টুর নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি পুনরায় ছাপা হয় পত্রিকায়।
