বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর মরিয়ম ঘুমাতে যায় রিনার ঘরে। সারা দিন সে পাগলের মতো বকবক করেছে। তার মধ্যে কটা সত্য, কটা মিথ্যা–ভেবেছিল গুনতে গুনতে ঘুমিয়ে পড়বে। রিনা ঘ্যান ঘ্যান করে তাকে সে সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করে। যুদ্ধের বছরটা মাত্র ন’মাসের হলেও অনেক লম্বা। আর বিরক্তিকর। রিনা তাই লুডুখেলা ধরেছিল। ওর ১৩-১৪ বছরের ভাই দুটি ধরেছিল বিড়ি ফোকা। তারা তখন মামার বাড়িতে।
আবার শুরু হলো যুদ্ধ! মরিয়মের মাথার মধ্যে ধুমধাম আওয়াজ। সেখানে কালভার্ট, স্কুলঘর, দালানকোঠা ভাঙতে শুরু করেছে। ততক্ষণে রিনা আবার যুদ্ধ ছেড়ে সোজা চলে যায় ভালোবাসা, মন দেওয়া-নেওয়ার। গাঁয়ে মিলিটারি ঢুকে মেয়েদের কখন ধরে নিয়ে যায়, এ নিয়ে চিন্তা করে করে তার বাবা-মায়ের যখন পাগল হওয়ার জোগাড়, সে তখন চুরিচামারি করে লুডুর গুটি পাকাতে ব্যস্ত। শুরুতে এই কাজে বাগড়া দিলেও মামাদের পাশের বাড়ির একটি ছেলে হঠাৎ তাকে সাহায্য করতে শুরু করে। খেলার পার্টনার হিসাবে ছেলেটা তার বিপক্ষে। তাহলেও সাপের ছোবল থেকে বাঁচিয়ে মইয়ের চূড়ায় রিনাকে সে কয়েকবার পৌঁছে দেয়। তাতে করে খেলা জমে না ঠিকই, প্রেম জমজমাট হয়। একটা চারকোনা কাগজের ওপর কয়েকটা ছোট-বড় সাপ। আর মই নিয়ে তারা যুদ্ধের ভেতর যুদ্ধকে বাদ দিয়ে এক ঝুঁকিপূর্ণ ভালোবাসায় মেতে ওঠে। সে এক তুলকালাম কাণ্ড। তাদের একবার সাপে খায়, তারপর মই বেয়ে তারা ঊর্ধ্বে উঠে যায়, সেখান থেকে পিছলে পড়ে নিচে, তার পরও থামে না, মইয়ের দিকে ছুটে যায়, যার চূড়ার পাশের ঘরেই এক মস্তবড় সাপ হাঁ করে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এ ছাড়া সংখ্যাগুলো দ্রুত বাড়ে-কমে তাদের পতন ও উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু তারা প্রেমপ্রতিজ্ঞায় থাকে অবিচল। এমনকি বিষয়টা জানাজানি হয়ে যাওয়ার পরও।
ছেলেটা যুদ্ধের বাজার হিসাব করলে সুপাত্রই। তবে নিচু বংশের। বাপ-দাদারা কোত্থেকে এসেছে, কী বৃত্তান্ত-কারো জানা নেই। এ গাঁয়ে আবাস স্থাপনের পর রিনার মামার বড় আব্বার রায়ত ছিলেন তারা। রিনার বাবা-মা-মামার এ বিয়েতে তাই ঘোর আপত্তি। তারা সাপখোপ মইটইসহ লুডুর ঘর পুকুরে ফেলে দিয়ে মেয়েকে। ঘরবন্দি করেন। আশ্চর্য, যুদ্ধের দিনে ছেলেমেয়ে দুটি পালিয়ে যেত কোথায়! ভারতের শরণার্থী ক্যাম্প ছাড়া তো অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না। ঘরবন্দি হয়েও বিপদ কাটেনি। মাথায় কোরান শরিফ নিয়ে তওবা কাটার দিন রিনা যখন মইয়ের ওপর ভয়ে টলমল করছে, ছেলের বড় বোন তখন জানালা পথে শক্তপোক্ত মই আঁকা একটা কাগজ ছুঁয়ে তাকে কিরা কাটতে বলে। আর বলে যে, আসলে আগের তওবাটা সাপ ছিল। বোনের মারফত ছেলেটি তাকে সাপের ছোবল থেকে বাঁচানোর আর মইয়ের চূড়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করছে। রিনা কিরা কাটে আবার। একদিকে সাপ, আরেক দিকে মই। ভারত-পাকিস্তান তখন যুদ্ধ বেধে গেছে। মাত্র বারো দিনের মামলা। রিনার বাবা-মা জানালাপথে চিঠি আসার খবর ঠিকই জানতে পেয়েছিলেন মামাতো বোন পিচকির মারফত। তাতে শুধু মই আছে, কিছু লেখাজোখা নেই শুনে তারা নিশ্চিন্ত হন। কিন্তু সে নিজে কোনোক্রমে বিষয়টার ফয়সালা করতে পারছে না। তার পক্ষে যোগাযোগ করার উপায় নেই। কারণ ছেলেটা এখন কোথায়–তাও সে জানে না। সময় সময় মনে হয়, তাকে গাছে তুলে মইটা বুঝি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সেই রাতে রিনাকে স্বপ্নে সাপে কাটে, মরিয়ম মই থেকে পড়ে যায়।
পরের রাতে ঠিক উল্টো। তৃতীয় রাতে প্রথম রাতের স্বপ্নটা ফিরে আসে। মরিয়মের ঘুমের ওষুধ ফুরিয়ে গেছে। এদিকে চাকরিবাকরির খবর নেই। রিনার পেটকাটা, হাতকাটা ব্লাউজ একেক দিন একেকটা গায় দিয়ে সে আবেদের অফিসে যায়। কিছুটা সময় মুখোমুখি চেয়ারে বসে যেসব কথা রিনাদের বাসায় গোপন রাখে, সেসব কথা সে আবেদকে শোনায়। হাতিরপুলের বাসায় সে শহিদ মুক্তিযোদ্ধার বোন, যে চাকরি খুঁজছে। এখানে সে বীরাঙ্গনা, চাকরি যার প্রাপ্য। আবেদকে তা দিতেই হবে, কারণ সে এখন তখতে বসে আছে। আবেদ প্রথম দিনের মতো প্রতিশ্রুতি দিয়ে রোজ তাকে বিদায় করে। পরদিন আবার পেটকাটা-হাতকাটা ব্লাউজ, রিনার যেসব বাইরে পরে যাওয়ার সুযোগ নেই, তা পরে মরিয়ম বেরোয়। আবেদের মুখোমুখি বসে। সামনের টেবিলের ওপর অদৃশ্য চৌকো কাগজে সাপ আর মই। তাতে তারা দুজনেই গুটি চালে। সেখানে সাপে কাটার বা মই বেয়ে উর্ধ্বে ওঠারলাভ-লোকসানের ঝুঁকি সমান সমান। তার মধ্যে একদিন মরিয়মের অসতর্কে চাল দেওয়া গুটি মেজর ইশতিয়াকের ঘরে পড়ে যায়। তাতে সর্বাঙ্গে সর্পদংশনের জ্বালা অনুভব করে আবেদ। সে এই বলে মরিয়মকে শাসায় যে, তার তেজ কোত্থেকে আসে এখন সে বুঝতে পারছে। মেরি আসলে দালাল, ভুয়া বীরাঙ্গনা। যুদ্ধের সময় মিলিটারির রক্ষিতা ছিল। আরেকবার চাকরি চাইতে এলে সে তাকে পুলিশে দেবে। কত মেয়ে-দালাল এখন সেন্ট্রাল জেলে পচে মরছে! মরিয়মও গুটি-ঘর সব উল্টে দিয়ে তাকে জানায়, মুক্তিযোদ্ধার আসল আর নকল বাজারে আছে। মানুষ সুযোগ পেলে পিটিয়ে মারে নকলদের। আবেদ যে আসল না, তা সে আগে থেকেই জানত, এখন জনে জনে তা রটিয়ে দেবে। মরিয়ম আর্মির রক্ষিতা হলে আবেদ কী। সেও তো অবাঙালি সওদাগর আর তার মেয়ের পয়সায় কেনা গোলাম।
