আবেদের মাথায় কিছু কথা ঢোকে, কিছু ঢোকে না। অবাক হওয়ার পর সে হতাশ হয় এই ভেবে যে, তাকে হারিয়ে মেয়েটার মনে কোনো হাহাকার নেই। সে যদি চাকরি চাওয়ার পরিবর্তে তার গালে দুটি চড় মারত, আবেদের ভালো লাগত। তার নবলব্ধ ক্ষমতা সার্থক হতো। অর্থবিত্ত, ভালো একটা বাড়ি, সুন্দরী স্ত্রী পুরুষের সব নয়। আরো লাগে। এসবের একটা হলো, যাকে সে ছেঁড়া কাপড়ের পুটলি বানিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে, কুকুরীর মতো পুরুষটির পদতলে তার বারবার ফিরে আসা। মেয়েটা সেইভাবে আসেনি। সে নিজের তালে আছে। কিন্তু যুদ্ধের আগে তো এমন ছিল না! তখন বিয়ে ছাড়া যে মেয়ে কিছু বুঝত না, কয়টা পুরুষের নিচে শুয়েছে যে, এখন আর পুরুষ নয়, হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছে? চেহারায়ও কেমন রাভি রান্ডি ভাব। যেন দুনিয়া জয় করে ফিরেছে। বীরাঙ্গনা মানে অসহায়-নির্যাতিত নারী, সহানুভূতির আড়ালে সর্বান্তঃকরণে সকলে তাদের ঘৃণাই করে। তারপর এত সাহস সে কই পায় যে, প্রাক্তন প্রেমিকের কাছে প্রেম ফেরত না-চেয়ে, চাকরি চাইতে আসে? শুধু নিজের জন্য নয়, একটা মরা লোকের জন্যও, যে বেঁচে থাকলে নাকি এই অফিসের দারোয়ান হতো। কোথাও একটা গলদ আছে। তা খুঁজে বের করতে সময় আর ভাবনা দরকার। আবেদ তাকে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অনতিবিলম্বে বিদায় করে।
মরিয়ম সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে ওঠে না। চাকরি পাওয়া-না-পাওয়া নিয়ে তার মনে এক রাজ্যের সংশয়। আবেদকে ঠিক বিশ্বাস করা যায় না। তাই বসে থেকেই সে বলে, মরিয়ম তার প্রাক্তন প্রেমিকা, তাকে সে বিয়ে করেনি, তা না করুক, মেয়েটার এখন যখন একটা চাকরি দরকার, তা তো দিতেই পারে। মৃত লোকটা, যে বেঁচে থাকলে আবেদের অফিসের দারোয়ান হতে পারত, তার কথা না-হয় বাদই দেওয়া গেল। যদিও ক্ষমতার তখতে যে বসে আছে, তার জন্য শহিদ আর বীরাঙ্গনা উভয়ের সেবা করা ফরজ। এর ব্যত্যয় ঘটলে, আবেদ কি নিশ্চিত আরেকটা যুদ্ধ হবে না?
আবেদের ড্রয়ারে পিস্তল থাকা বিচিত্র নয়। কোনো কোনো মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র জমা দিলেও কেউ কেউ দেয়নি। সে তাকে গুলি করতে পারে। পুলিশ ডেকে বলতে পারে, মেয়েটা একজন ছিনতাইকারী বা পাকিস্তানি গুপ্তচর বা সিআইএ’র এজেন্ট, টাকা খেয়ে একজন স্বনামধন্য মুক্তিযোদ্ধার জান কবজ করতে এসেছে। এসবের কোনো একটা ঘটার আগে মরিয়ম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যায় রুম থেকে। তাকে সালাম ঠুকে গেট খুলে দেয় সেই লোকটা, যার জায়গায় বেঁচে থাকলে রমিজ শেখের চাকরির আবেদন সে করতে পারত।
অ্যাডভেঞ্চারের সুখ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। সেগুনবাগিচা থেকে হাতিরপুল। বাংলাদেশের জাগ্রত যুবসমাজের এক পাতার একটি লিফলেট মরিয়মের চলন্ত রিকশায় উড়ে আসে। যার লোমহর্ষক শিরোনাম পেটকাটা মানুষ। তাতে মহিলাদের অশালীন পোশাক পরিহারের জন্য ১৫ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। তার পরও যদি এমতাবস্থায় রাস্তায় কাউকে দেখা যায়, দুর্ভাগ্যজনক ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে। জাগ্রত যুবসমাজ মনে করে, পেটকাটা ও হাতকাটা ব্লাউজ আর নাভির নিচে শাড়ি পরা অশালীন। এ ধরনের পোশাক স্বাধীন দেশে চলতে দেওয়া হবে না। মরিয়মের পরনে মিলের লাল পেড়ে কোড়া শাড়ি আর লম্বা হাতার ব্লাউজ বীরাঙ্গনাসুলভ পোশাক-আশাক। তবে পুনর্বাসনকেন্দ্রে এমন সাজসজ্জার দু-চারজনকে সে দেখেছে। তারা ভারতফেরত। ফ্যাশনটা বোধ হয় ওখানকারই, যা স্বাধীনতার পাঁচ মাসের মাথায় বাংলাদেশের জাগ্রত যুবসমাজ বরদাস্ত করতে পারছে না। এই জাগ্রতরা আসলে কারা?
‘কারা আবার, বদমাশ লোকেরা। যারা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়।’ মরিয়মের কলেজ-লাইফের বান্ধবী রিনা লিফলেটটা দেখে চটে যায়। কারণ দর্জি দিয়ে এরকম আধ ডজন ব্লাউজ সে গত মাসেই বানিয়েছে। এখনো সব কটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পরা হয়ে ওঠেনি। পরে যাবেই-বা কোথায়। কলেজের মেয়াদ শেষ। বাসা থেকে পরিষ্কার বলে দিয়েছে, ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করানো হবে না, যদি পড়তে চায় বিয়ের পর পড়বে। বদমাশ ছেলেদের লিফলেটটা দলা পাকাতে পাকাতে মরিয়মের হাতের ব্যাগের দিকে তার চোখ যায়। ব্যাপারটা নতুন নয়। এ বাসার দ্বার রিনার বান্ধবীদের জন্য অবারিত। মরিয়ম সেই ভরসাতেই এসেছে। দু-চারটা রাতের মামলা। চাকরি পেলে সে চলে যাবে। তবে কতগুলো কথা তাকে জনে জনে বানিয়ে বলতে হয়। প্রথম বাসায় ঢুকে যেমন রিনাকে বলল একবার। সেই একই কথা বলল, যখন রান্নাঘর থেকে রিনার মা খালাম্মা বেরিয়ে এলেন। তৃতীয়বার বলতে হলো, খালুজান অফিস থেকে বাসায় ফেরার পর। রিনাদের একদম বাসার পাশেই বক্তৃতার মাঠ। সেখানে বিকাল থেকে একটা বামপন্থি দলের জনসভা চলছে। মরিয়মের মিথ্যা কথাগুলোর মাঝখানে প্রত্যেকবার তাই বক্তৃতার ভগ্নাংশ ঢুকে পড়ছিল : কমরেড লেনিন। বাবা-মা মেরিকে নিয়ে নয় মাস খুব উৎকণ্ঠায় ছিলেন। বাড়ির কাছে মিলিটারি ক্যাম্প। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এখনই সুবর্ণ সুযোগ। তারা মন্টুকে নিয়ে ভাবেননি। দেশে থাকলে মিলিটারি মারত, তবু ভালো যে, সে যুদ্ধ করছে। স্বাধীনতার ধাত্রী যদি হয় ভারত, তবে পিতা হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। নতুন দেশের পরিচয় তার পিতার নামেই হবে, হওয়া উচিত। সেই মন্টুই আর ফিরল না। চাকরি খোঁজা ছাড়া এখন উপায় কী মরিয়মের। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাবা-মা খুব ভেঙে পড়েছেন। ঢাকায় আসতে দিতে চান নাই। একপ্রকার জোর করেই ফুলতলি থেকে তাকে চলে আসতে হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে আমরা মুজিব সরকারকে সর্বান্তকরণে সাহায্য করব। (সর্বহারা জনতার করতালিসহ স্লোগান) ইনকিলাব জিন্দাবাদ। তোমার নেতা আমার নেতা। মুজিব-ইন্দিরা-কোসেগিন। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।
