আবেদের স্ত্রী পাকিস্তানি, পাঞ্জাবি নয় তো, তার বাড়ি কি লাহোরে?
মরিয়ম রিকশার জন্য পলাশীর মোড়ে এসে দাঁড়ায়। তাকে এগিয়ে দিতে এসেছে সুমন। সে এখন বেশ ধাতস্থ আর আন্তরিক। সেখানে প্রথম আর শেষ দিনের সেই মুচিকে তারা দেখতে পেল না। জায়গাটা শূন্য। পাশের বস্তিটিও নেই। ২৫ মার্চ রাতে ঘুমন্ত মানুষদের নিয়ে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। সুমন পোড়া জমিনের দিকে তর্জনী তুলে বলে, ‘মুচির বাসা ছিল ওই বস্তিতে।’
আবেদের বদলে রাস্তায় আজ সুমন। মুচি তার বস্তিসহ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। মরিয়ম যেন পুরাণের সেই ফিনিক্স পাখি, যার ধ্বংস নেই। পোড়া ছাই থেকে নতুন শরীর নিয়ে সে উড়ে এসেছে বিগত জীবনে, আগের ঠিকানায়। এটা যুদ্ধ-পরবর্তী যে কোনো দেশের যে-কোনো সময়ের মানুষের কাহিনি। যার একটাই শিরোনাম, যা লেখাও হয় বারবার, তাতে যুদ্ধ থামেনি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বা সময় কোনোটাই মরিয়মের অনুকূলে নেই যে, নিজের জন্য বা আর কারো জন্য একদণ্ড বসে শোক করবে।
কফিলউদ্দিন আহমেদ এখন বঁটি হাতে যে কালো গেটের আড়ালে মেয়ের জন্য অপেক্ষা করছেন, তাতে নতুন কালিতে নিজের নাম-ঠিকানা লেখা হয়ে গেছে। বাঁশঝাড়টাই শুধু রাতারাতি ফলানো যায়নি। সিজনের প্রথম বর্ষণে থোকা থোকা জংলি ফুল ফুটেছে যে পাতকুয়োটায়, সেটা এখনো বোজা। এ ছাড়া বাদবাকি ঠিকঠাক। এখন মেয়েকে আসতে দেখলে তিনি এক কোপে খতম করে দেবেন। মনোয়ারা বেগমের সতর্কবাণী, ‘নিজে নিজের পথ দেখো। বাঁচলে নিজে বাঁচবা, মরলে নিজে মরবা। আমরা তোমার সাথে-পাছে নাই। মরিয়ম তাই নিজের পথ নিজে দেখছে–একটা ফিনিক্স পাখি। নতুন জীবন পেলেও পুরোনো পথে সে বিচরণ করে, যেখানে আবার আগের মানুষ নেই, যারা আছে তারা আগের জায়গায় নেই। একটা মৃত্যু থেকে আরেকবার জন্মলাভের জন্য তার বয়সটা খুব অল্প–মাত্র ২৩ বছর।
সঙ্গে ঠিকানা থাকা সত্ত্বেও আবেদের অফিস খুঁজে পেতে সেই দুপুর। লাঞ্চ ব্রেক চলছে। মরিয়ম গেটের ধারে অপেক্ষা করে। পাশেই সুসজ্জিত দারোয়ান। তবে পোশাকের নিচে সে অপেশাদার একজন মানুষ। নিজের টুলে মরিয়মকে বসতে দিয়ে জানায়, সে আবেদের দেশের বাড়ি থেকে এসেছে, সম্পর্কে চাচা হয়। পুরোনো অফিসের রেওয়াজমাফিক সাহেবকে এখন তার স্যার বলতে হচ্ছে। আগের দারোয়ান বিহারি ছিল। সে যে কতল হয়েছে, নিজের গলা বরাবর তর্জনী চালিয়ে নতুন দারোয়ান তা দেখায়। তবে নিজের ভাতিজা বলে নয়, স্যার খুব ভালো আর পরোপকারী। বীরাঙ্গনা অফিসের প্যাকেট দিয়ে লাঞ্চ সারে। বলে ‘ঘেন্না করবা না, ওরা তোমাদের মা-বোন, দেশের জন্য ইজ্জত দিছে। নিজের ভাতিজা বলে নয়, ‘স্যারের চেত-ঘিন কিছু নাই, নইলে ওই মাগি গো হাতের খানা খায়-কন?’ এবার আবেদের দূরসম্পর্কের চাচার কিছু গোপন কথা বলার আছে। একবার অফিসের দিকে সে তাকায়, একবার মরিয়মের দিকে ঘোরে, ‘বউ অবাঙ্গাইল্লা বুঝচ্ছেন, যুদ্ধের ফক্করে পড়ে বিয়া করছে, ভাত-মাছ রান্তে জানে না। অফিস থেকে একজনকে বেরিয়ে আসতে দেখে দারোয়ানের খুব গরম লাগে। মাথার ক্যাপ হাতে নিয়ে নাড়তে নাড়তে আপন মনে বলে, ‘নতুন জিনিস তো ওম ছাড়ে নাই।’ তারপর নিজের পোশাকের সে তারিফ করে, ‘ডেরেসটা এক্কেরে ভাতিজা, থুক্কু স্যারের নিজের হাতে কিনা।’
আবেদের দূর সম্পর্কের চাচার সঙ্গে রমিজ শেখের কোথায় যেন মিল আছে। মরিয়ম ভাবে, সে বেঁচে থাকলে কি এ অফিসের দারোয়ান হতো আর মরিয়ম হতো সাহেবের ব্যক্তিগত সেক্রেটারি কাম টেলিফোন অপারেটর? একটা যুদ্ধ অনেক অসম্ভবও সম্ভব করে তোলে। মরিয়মের ডাক এসেছে স্যারের রুম থেকে। দারোয়ান মাথায় ক্যাপ চাপিয়ে আনাড়িভাবে সালাম ঠুকে বলে, ‘আইয়্যেন গো বড়মানুষের মাইয়্যা মাঝেসাঝে, কথা কওনের মানুষ পাই না আমি।’ রমিজ শেখ একই কথা বারবার বলত। কারণ তার তিরিশ বছরের জীবনের দশটা বছর কেটেছে জেলখানায়।
মরিয়ম জানে, সে কোথায় আর কার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। আবেদের বোধ হয় দর্শনার্থী কে, জানা ছিল না। যত তাড়াতাড়ি পেছনে চেয়ার ঠেলে সে উঠে দাঁড়ায়, তার চেয়ে ক্ষিপ্রগতিতে বসে পড়ে। নিজেকে সামলাতে সামলাতে মিনিটের ভগ্নাংশ মনে হয় ঘণ্টা, দিন–আস্ত একটা বছর, আরো দুটি বাড়তি মাস। পলাশীর মোড় থেকে ২৫ মার্চ, ভারতের ট্রেনিং ক্যাম্প, যুদ্ধ, রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ, রাজত্বের সঙ্গে রাজকন্যা, এসব কিছুর ওপর দিয়ে তাকে তখন প্রাণপণে দৌড়াতে হয়। তারপর থামে যখন, তখনো মরিয়ম দাঁড়িয়ে, তাকে বসতে বলা হয়নি। বসার পর বিকট শব্দে একটা বোমা ফাটে। শব্দের পরিবর্তে তা বারুদভর্তি হলে সুসজ্জিত অফিসটাই উড়ে যেত। কিন্তু মরিয়ম অটল। ঝানু, ক্ষমতাবান, সশস্ত্র পুরুষদের যে দিনের পর দিন দেখেছে। উলঙ্গ হতে, খুন করতে, ভোগ করতে, ঘৃণা করতে, ভালোবাসতে-পূৰ্বপ্রেম তার মনে ছায়া ফেলে না। প্রাক্তন প্রেমিককে মনে হয় অর্বাচীন বালক। তার ভালোবাসা-প্রতারণা চৈত্রের কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি যেন, যা বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের পর বর্ষার প্রবল বর্ষণে হারিয়ে গেছে। তাকে ক্ষমা করা-না-করা সমান। মরিয়মের এখন একটা চাকরি দরকার, আবেদ ছাড়া এত বড় শহরে চাকরিদাতা কাউকে চেনে না সে। এখন আবেদ যদি বলে ক্ষমা করার বিনিময়ে মরিয়মকে একটা চাকরি দেবে, তাহলে খুশি মনেই সে তাকে ক্ষমা করবে। তাই নিজের বীরাঙ্গনা পরিচয় দিয়ে সে একটা চাকরি চাইছে আবেদের কাছে। চাকরিটা যে তার খুব দরকার, তা বোঝাতে কফিলউদ্দিন আহমেদের বঁটি হাতে গেটের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আর মনোয়ারা বেগমের নিজের পথ নিজে দেখো’ উক্তিটিরও স উল্লেখ করে। তারপর বলে যে, দারোয়ান পদে আরো একজনের চাকরির জন্য সে এখানে আবেদন করত। তার আর দরকার নেই। কারণ লোকটা যুদ্ধে মারা গেছে। আর পদটাও দেখা যাচ্ছে খালি নেই। এ ছাড়া মন্টুর খবর আবেদও জিগ্যেস করে না, মরিয়মও তাকে বলে না। একজন শহিদ মুক্তিযোদ্ধার বোন হিসাবে কেন, তার বীরাঙ্গনা পরিচয়ই তো যথেষ্ট একটা চাকরি পাবার জন্য। আবেদ নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধা। তদুপরি আরোহণ করেছে সেই চেয়ারে, যেখানে একদিন মোটা মাথার অবাঙালিদের বসে থাকাটা তাকে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। যুদ্ধে তার পক্ষ জিতেছে। নিজগুণে চেয়ারটাও সে বাগিয়েছে। মরিয়ম এখন চাকরি না-পেলে আবেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে?
