কফিলউদ্দিন আহমেদের এই বিয়েতে যে অমত নেই, তা যেন গোলাম মোস্তফার বিশ্বাস হতে চায় না। মেয়েটা ওষুধের ঘোরে থাকতে থাকতে মৌলবি ডেকে বিয়েটা তিনি পড়িয়ে ফেলতে চান। তারপর শামিয়ানা টাঙিয়ে মাইক বাজিয়ে উৎসব হবে। প্রধান অতিথি সস্ত্রীক বঙ্গবন্ধু। তিনি ব্যস্ততার কারণে আসতে না পারলে, বেগম মুজিব ঠিকই আসবেন। বীরাঙ্গনা-বিবাহের তিনি সবচেয়ে বড় উদ্যোক্তা। এভাবে মরা হাতিও। যে লাখ টাকা, গোলাম মোস্তফা দেশবাসীকে তা জানিয়ে ছাড়বেন। কাগজে ছবি ছাপা হবে–আরেকটি বীরাঙ্গনা-বিবাহ। কন্যা সম্প্রদান করছেন স্বয়ং বেগম মুজিব। পাত্র সাজেদ মোস্তফা ওরফে সাজু, পিতা গোলাম মোস্তফা আর পাত্রী হচ্ছেন বীরাঙ্গনা মোসাম্মৎ মরিয়ম বেগম, পিতা কফিলউদ্দিন আহমেদ। এই শেষের বাক্যটায়
কফিলউদ্দিন আহমেদের অসুবিধা আছে। কাগজে ছবি ছাপিয়ে ঢাকঢোল পিটানোতেও তার ঘোর আপত্তি। এখনো যেসব লোক মরিয়মের ঘটনা জানে না, গোলাম মোস্তফা এসব করে তাদের জানিয়ে ছাড়বে। তিনি তাতে রাজি নন। শ্যালকও নিজের কথা থেকে এক চুল নড়বে না। পাশের ঘরে মেয়েটা ঘুমাবে কী, এ নিয়ে তো বাড়িতে মহা শোরগোল।
পরিস্থিতি এমন যে কারো সঙ্গে কারো মতের মিল হচ্ছে না, কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। তবে বাইরে বাইরে সবাই একটা আপোসের ভাব বজায় রেখে চলে। কারণ গোলাম মোস্তফার পাকিস্তানের দালাল থেকে রাতারাতি দেশপ্রেমিক হওয়া দরকার। এতে করে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া বাড়ি দুটির পুনর্দখলও সম্ভব। আর কফিলউদ্দিন আহমেদ কন্যাদায়গ্রস্ত অবস্থা থেকে আশু মুক্তি চান। সেই মতো ঠিক হয়, মেরির ওষুধের ঘোর কাটার পর বিয়ের আয়োজন করা হবে। পত্রিকায় বিয়ের খবর যাবে, তবে ছবি ছাপা হবে না। এ নিয়ে মগবাজারের বাড়িতে সভা-সমিতি বন্ধ থাকবে। হইহট্টগোল করা থেকে উভয় পক্ষ কিছুদিন অন্তত বিরত থাকবেন।
আপাতশান্তিপূর্ণ এমন এক পরিবেশে রায়েরবাজার থেকে মগবাজারের বাসায় এনে দরজায় শিকল দিয়ে মেরিকে কয়েক দিন রাখা হয়। কিন্তু গোলাম মোস্তফাঁকে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না, বিশেষত ছবি ছাপানোর ব্যাপারে। এ ছাড়া কাগজে বিয়ের খবর প্রকাশ হওয়াই তো যথেষ্ট। মানুষ নাম-ঠিকানা জেনে ঠিকই চেহারা বের করে ফেলবে। কফিলউদ্দিন আহমেদ তাতে গররাজি। কিন্তু তা প্রকাশ করতে পারছেন না। বিয়েশাদি দর-কষাকষির ব্যাপার। এ ক্ষেত্রে লুকোছাপার দরকার পড়েই, যা গোলাম মোস্তফার আশ্রয়ে থেকে সম্ভব নয়। তাই তিনি নিজের দিকটা শক্ত রাখার জন্য রায়েরবাজারের ভাঙা বাড়ি মেরামতে তড়িঘড়ি হাত দেন।
মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। এদিক দিয়ে গোলাম মোস্তফা কফিলউদ্দিন আহমেদের চেয়ে সঠিক ছিলেন। মরিয়মের ওষুধের ঘোর কাটার সঙ্গে সঙ্গে বিয়ের যাবতীয় পরিকল্পনা-প্রস্তুতি মাঠে মারা যায়। অন্ধ পিতা যে কারণে স্ত্রীকে পোষ মানাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, চোখ থাকা সত্ত্বেও সেই একই কারণে পুত্র তার কন্যাকে বাগে আনতে পারেননি। কারণ নারী দুটি ছিল সত্যিকারের পাগল।
১৯. পেটকাটা মানুষ ও জাগ্রত যুবসমাজ
মরিয়ম বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা এসএম হলে হাজির হয়। সবকিছু আগের মতোই আছে, দেয়ালে বুলেটের গর্তগুলি খালি নতুন। আর আবেদ কোথাও নেই। সুমন দাঁত মাজছিল। মরিয়মকে দেখে মুখভর্তি টুথপেস্ট গিলে ফেলে। পাশের রুম থেকে সিটি বাজায় একজন। মরিয়ম অনেকদিন পর প্রাণ খুলে হাসল। সুমন তাতে আরো অবাক হয়। নোংরা তোয়ালে মুখ মুছে, শার্ট গায় দিতে দিতে ভাবে, আবেদ ভাই এত বদলে গেলেন-রাত যেন দিন, দিন যেন রাত। এখন মেয়েটিকে সে কী বলবে–সত্য না মিথ্যা? দিনটা মিথ্যা দিয়ে শুরু করে তার লাভ? আবেদ ভাই তো রুমমেট সুমনকেও আজকাল চিনেন না। অথচ ২৫ মার্চ রাতে তার ভারী শরীরটা এপাশ থেকে সে ধাক্কা দিয়ে তুলে না-দিলে তিনি দেয়াল টপকাতেই পারতেন না। ততক্ষণে হলের ভেতর মিলিটারি ঢুকে পড়েছে। জাস্ট এক বছর দুই মাস। কত তাড়াতাড়ি মানুষ সবকিছু ভুলে যায়, বিশেষত নেতারা। সে একজন সাধারণ কর্মী। এ অবস্থায় বিদ্রোহ করার অধিকার তার আছেই।
এক অবাঙালির সওদাগরি অফিসের মালিক এখন আবেদ। প্রাক্তন মালিককে ভারত হয়ে পাকিস্তান পালিয়ে যেতে সাহায্য করার বিনিময়ে তার পরমাসুন্দরী মেয়েকে সে বিয়ে করেছে। অর্থাৎ যুদ্ধজয়ের পর পুরো রাজত্বসহ রাজকন্যা তার ভাগে। হাতে হাতে স্বাধীনতার ফল। অথচ যুদ্ধে সুমন আর মন্টুও গিয়েছিল। একজন নোংরা তোয়ালেতে এখন মুখ মুছছে, আরেকজন ফিরে আসেনি। দুজনই আবেদের অনুজ, পরম শিষ্যের মতো ছিল। সুমনকে আরো অবাক করে দিয়ে মরিয়ম বলে যে, যুদ্ধের আগে তাদের সম্পর্ক চুকেবুকে গেছে। আবেদের ব্যক্তিগত জীবন জানার তার দরকার নেই। মরিয়ম শুধু তার ঠিকানাটা চায়। সে নিজে একজন বীরাঙ্গনা। ‘বীরাঙ্গনা মানে জানো তো,’ সুমনের হাঁ-করা মুখের সামনে পাঁচ আঙুল ঘুরিয়ে বলে, ‘যে জাতির গর্ব, স্বাধীন বাংলাদেশের পবিত্র নারী!’
শিরীষ অরণ্যের কারুকাজময় ছায়ায় প্রবেশ করে মরিয়মের বিস্মৃতকালের এক গল্প মনে পড়ে। ফুলবাগিচা আর সুরম্য প্রাসাদের এক আশ্চর্য নগরীর গল্প। সেখানে বাস করত এক রাজকুমার। তার স্ত্রী ছিল, পুত্র ছিল। সংসার সুখের ছিল কি না, জানে না। তাকে যুদ্ধে যেতে হলো এমন এক দেশে, যেখানে কালো চুলের, সম্মোহনী। চোখের নারীদের বাস। সে তাদের একজনকে ভালোবাসল, কিন্তু বন্দি করে রাখল। সে তাকে প্রাণের কথা খুলে বলল কিন্তু যুদ্ধ শেষে নিজের দেশে চলে গেল। গল্পটা শেষ হয় এখানে। তবে কিছু কিছু গল্প থাকে, যা কখনো শেষ হয় না।
