পড়শি ক্লান্ত হয়ে থামে। আর কফিলউদ্দিন আহমেদ হতবুদ্ধি হয়ে। ভাবেন–বাড়িটার কে কখন কী ক্ষতি করেছে, এভাবে দশবার বললেও তার মাথায় ঢুকবে না। তার সামনে দণ্ডায়মান কঙ্কাল-একটা বাড়ির, একটা দেশের । একাত্তরের ধ্বংসযজ্ঞ ও ক্ষমতার পালাবদলের যা জবরদস্ত সাক্ষী হতে পারে। এমনকি হতে পারে একটি আদর্শ জাদুঘর। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিদেশি পর্যটক, মফস্বলের কৌতূহলী মানুষ আর প্রেমিক-প্রেমিকার দর্শনীয় স্থান। স্বল্পমূল্যের টিকিটের বিনিময়ে তারা যে ফটক পেরিয়ে জাদুঘরে প্রবেশ করবে, এর গায়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাইনবোর্ড লটকানো থাকবে। তাতে লেখা–এই বাড়ির মালিক কফিলউদ্দিন আহমেদ, সাং ফুলতলি, ডাকঘর সাহারপাড়। তিনি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের বছর জনৈক হিন্দু ধর্মাবলম্বী নিখিল চন্দ্র সাহার পাঁচ কাঠা জমি জলের দরে খরিদ করেন, গায়ের অনুরূপ একটি বাটি এখানে নির্মাণ করেন। তাতে মন্টু নামদার পুত্র এবং মেরি নাম্নী এক কন্যা বসবাস করত। তারা উভয়েই ছিল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে মন্টু শহিদ হয় আর মেরি প্রকারান্তরে মরিয়ম হয় বীরাঙ্গনা। বাড়িটা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর হাতবদল হয়ে ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে গৃহকর্তা কফিলউদ্দিন আহমেদের হস্তগত হয়। তারপর যে অবস্থায় বাড়িটা তিনি হস্তান্তর করেছেন, কোনোরূপ পরিবর্তন বা বিকৃতি ব্যতিরেকে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ তদাবস্থায় তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিয়েছে।
মরিয়মই প্রথম দর্শক, যে বাড়িটিতে প্রবেশ করে, তবে ঘোরের মধ্যে। সে কালো গেট দিয়ে ঢুকে এলোমেলো ইটের ওপর পা ফেলে কর্দমাক্ত জায়গাটা পেরিয়ে যায়। কল চেপে পেট পুরে পানি খায়। খানিকটা বাঁশঝাড়ের ছায়ায় জিরিয়ে, মন্টুর রুমের সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যায় নিজের ঘরে। তারপর শুয়ে পড়ে সেই বিছানায়, যেখান থেকে ২৭ মার্চ সকালে কারফিউ ভাঙার পর মহল্লার লোকজনের সঙ্গে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল। বহুদিন পর আজ নিজের ঘরে, নিজের শয্যায়। বালিশে মাথা রাখতেই এক রাজ্যের ঘুম তাকে গ্রাস করে।
গত দুদিন মগবাজারের বাসায় এমন হয়েছে যে, মরিয়ম ঘুমের ওষুধ খেয়েও ঘুমাতে পারেনি। পাশের ঘরে দফায় দফায় গোলাম মোস্তফার সঙ্গে কফিলউদ্দিন আহমেদের বৈঠক বসছে আর রাগারাগি, চিল্লাচিল্লির মধ্য দিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। বিষয়টা কী-মরিয়ম জানে না। তাকে জানানোও হয়নি। তবে ঘুমের ঘোরে সে বুঝে যে, একটা ষড়যন্ত্র চলছে, যা পুরোনো। তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হবে। নওশা সেজে যে আসে, সে আর কেউ নয়–সাজু। সে ধড়ফড়িয়ে বিছানায় উঠে বসলে মনোয়ারা বেগম তাকে আবার শুইয়ে দেন বিছানায়। পানির গ্লাস হাতে ছুটে আসেন গোলাম মোস্তফার স্বল্পবাক স্ত্রী জ্বলেখা বিবি। শেষবার মরিয়মের শরীরে অসুর ভর করে। সে বিছানা থেকে উঠেই মনোয়ারা বেগমকে ধাক্কা মেরে, জ্বলেখা বিবির হাতের গ্লাস উল্টে দিয়ে, দুয়ার খুলে বেরিয়ে যায়। কফিলউদ্দিন আহমেদ চিৎকার করে, রায়েরবাজারের বাসায় যে মাইন পোঁতা আছে, সেই ভয় দেখান মেয়েকে। তাতে কাজ হয় না। অগত্যা আরেকটা রিকশায় লাফিয়ে উঠে মেয়ের পেছন পেছন তিনি ছোটেন।
বাড়িটা দেখলেই কফিলউদ্দিন আহমেদের মনে আধ্যাত্মিক ভাব জেগে ওঠে। এ তো শূন্যের মধ্যে বসতবাড়ি। তার জীবনের অনুরূপ। কপাটবিহীন দরজা-জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যায়, বাতাস নির্বিঘ্নে চলাচল করে। পাখিরা উড়ে বেড়ায়। মাথার ওপর রোদ-বৃষ্টি সরাসরি কিরণ ও পানি দেয়। মগবাজার থেকে রায়েরবাজার রিকশায় এটুকু পথ আসতেই মরিয়মের শক্তি বা তেজ নিঃশেষ হয়ে গেছে। কফিলউদ্দিন আহমেদ পৌঁছে দেখেন, খোলা ছাদের নিচে, খালি মেঝেতে কুঁকড়ে-মুকড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে সে। মেয়েটা কি তার শেষমেশ পাগল হয়ে গেল? যে বাড়ির ছাদ নেই, দুয়ার নেই, ফটক নেই, বাউন্ডারি ওয়াল নেই, সেখানে পাগল ছাড়া কেউ এমন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে?
একদিকে মেয়ে, আরেক দিকে শ্যালক-দুজনেই স্বজন, দুজনেই তার শত্রু। মাঝখানে পড়ে গলায় দড়ি দেওয়ার উপক্রম হয়েছে তার। মেয়েটার চোখের দিকে আজকাল আর তাকানো যায় না। যতক্ষণ চেতন থাকে, লাটিমের মতো চোখের তারা দুটি ঘোরে, না-হয় জ্বলতে থাকে ধকধক করে। যেন একখণ্ড কাঠ কি কাগজের টুকরা কাছে ধরলেই দপ করে আগুন জ্বলে উঠবে। অবিকল কফিলউদ্দিন আহমেদের আম্মাজানের চোখ। বছরের দু-তিনটা মাস ছাড়া বাকি সময় তিনি পাগল থাকতেন। তখন দুনিয়াদারির বিরুদ্ধে তার অজস্র অভিযোগ। কফিলউদ্দিন আহমেদের নানাজান সেই কোন কালে মেয়েকে যে গাজির গীত শুনতে যেতে দেননি, তা নিয়ে তিনি আস্ত এক দুপুর নিজের বাপকে গালমন্দ করতেন। বাকি দিনটা কাটত মৃত শাশুড়ির পিণ্ডি চটকাতে চটকাতে। কারণ গাঁয়ে যেইবার খুনের আসামি ধরতে গুর্খা সৈন্য আসে, সেইবার জ্যৈষ্ঠ মাসে তাকে বাপেরবাড়ি যেতে দেওয়া হয়নি। তবে উচিত শাস্তি হয়েছে। যে, গুর্খারা আসামি না-পেয়ে গাঁয়ের বাড়ি বাড়ি ঢুকে চাল-ডাল সব এক করে রেখে গেলে এর পরের ছয় মাস গোটা গ্রাম শুধু খিচুড়ি খেয়ে কাটায়। পঞ্চাশ সনের দুর্ভিক্ষের বছর একদিন বাড়ির সবাই ভাত খেয়ে তার জন্য যে ফ্যান রেখে দিয়েছিল, সেই দুঃখ কফিলউদ্দিন আহমেদের আম্মাজানের বছরের নয় মাসের কোনো একদিন ঠিক মনে পড়ে যেত। সেদিন তিনি উপোস থাকতেন। ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিরা হাতে-পায়ে ধরেও তাকে ভাত খাওয়াতে পারত না। স্বামী এক চোখ কানা, নিরীহ মানুষ। কলাপাতার শয্যায় গুটিবসন্ত তাকে ফেলে গেলেও একটা চোখ নিয়ে নেয়। অন্য চোখের দৃষ্টিশক্তি ক্রমশ কমে যাচ্ছিল। এ অবস্থায় স্ত্রীর পাগলামি সহ্য করা ছাড়া কফিলউদ্দিন আহমেদের আব্বাজান সলিমুদ্দিনের আর কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু মেরিকে সহ্য করবে কে, এক সাজু ছাড়া?
