এ শুধু কথার মারপ্যাঁচ নয়। বাস্তবটা অত্যন্ত কঠিন। বিশেষত সেই বাবা-মার জন্য, যাদের একমাত্র ছেলে নিখোঁজ আর মেয়ে বীরাঙ্গনা। এ সমস্ত কথা, একটা ময়লা বালিশ আর চোখের জল মনোয়ারা বেগম রাত জেগে স্বামীর সঙ্গে ভাগাভাগি করেন। বহুদিন পর মানুষটা আজ তার শোকের প্রকাশ্য অংশীদার। একসঙ্গে কাঁদছেন, দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন, কথা বলছেন। এ ছাড়া পাশের ঘরে মায়ের পেটের ভাই ঘুমাচ্ছে। তার নাক ডাকার আওয়াজটাও কেমন স্বস্তিদায়ক। মনোয়ারা বেগম ভাবছিলেন, জীবন অসহ্য কষ্টের হলেও দুনিয়ায় তিনি একা দুঃখী নন। একই ছাদের নিচে আজ রাতে তার স্বামী আছেন, ভাই আছে। পরদিন হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে দেখতে পাবেন। শোক-তাপের মধ্যেও হাতে কিছু-না-কিছু থাকেই মানুষের-একটি ক্রন্দনের রাত, বালিশ আর বেদনা ভাগাভাগির রাত, প্রতীক্ষার রাত, নিঘুম রাত। এর মাত্র মাস তিনেক পর মনোয়ারা বেগমের মনে হবে, এই রাতটা তার জীবনে কোনোদিন আসেনি। এসে থাকলেও, এ ছিল স্বপ্ন। স্বামী, ভাই, নিজের বলে কেউ কোনোদিন তার ছিল না। একমাত্র সত্য যা, তিনি পুত্রহীন। আরেকটা ছেলের জন্ম দেওয়ার তার ক্ষমতা নেই।
পরদিন সকাল থেকে অঘটনগুলো ঘটতে শুরু করে। বোনের বীরাঙ্গনা অফিসে মেয়েমানুষ দেখলেই লোকজন সন্দেহ করে। সে যে-কোনো বয়সের হোক না-কেন, ভাবে বীরাঙ্গনা। অগত্যা কফিলউদ্দিন আহমেদ একাই গেলেন। গোলাম মোস্তফা থাকলেন আড়ালে, সায়েন্স ল্যাবরেটরির কাছে এক পান দোকানদারের টঙের পেছনে। তবে ঘুড়ির লাটাই তার হাতে। সেখান থেকেই তিনি সুতো টানছিলেন আর ছাড়ছিলেন। প্রথমবার তিন নম্বর রোডের মাথায় কফিলউদ্দিন আহমেদকে একা ফিরতে দেখে তার মাথায় আগুন ধরে যায়। বাবা মেয়ে আনতে গেছে, শ্বশুরবাড়ি নাকি। যে তারা মেয়ে দেবে না, আটকে রাখবে? তারপর মেরির মাথা বিগড়ে যাওয়ার খবরটাও তাকে টলাতে পারে না। ভগ্নীপতিকে বললেন, বংশে পাগল থাকলে যুদ্ধের কী দোষ। এই অবস্থায় ডাক্তাররাই-বা কী করবে। যা করার মেয়ের বাপ-মা করবে। কফিলউদ্দিন আহমেদ দ্বিতীয়বার ফিরে এসে যখন জানালেন, মেরিকে সপ্তাহ খানেক পর রিলিজ দেওয়া হবে, তখন গোলাম মোস্তফার বুদ্ধির থলে শূন্য হয়ে গেল। এখন। খানিকটা সময় নিরিবিলি চিন্তা করা দরকার। রাস্তাঘাটে দাঁড়িয়ে তা সম্ভব নয়। কখন কে দেখে ফেলে। হিন্দুরা দলে দলে ভারত থেকে ফিরে আসছে। যুদ্ধের সময় ঢাকায় গোলাম মোস্তফার কর্মকাণ্ড শূন্য। যা করেছেন গাঁয়ে। এই যেমন ঘরবাড়ি লুটপাট করে, ভয় দেখিয়ে পাকিস্তান থেকে হিন্দুদের ছাঁ-পোনাসহ হিন্দুস্থানে চলে যেতে বাধ্য করা। কারণ ভয়টা তার হিন্দুদের চেয়ে তাদের জমিজমা নিয়েই বেশি। ঝাড়ে-বংশে মালাওন খেদাতে না-পারলে নিজে তিনি বিপদমুক্ত হচ্ছিলেন না। অন্যদিকে নয় মাস মুসলমানদের কাঠি দিয়েও ছুঁয়ে দেখেননি তিনি। দু-চারজনকে বরং কৌশলে গুলির মুখ থেকে বাঁচিয়েছেন। সেই সুবাদে একদল মুক্তিযোদ্ধা তাকে বন্দি করলে আরেক দল এসে ছেড়ে দেয়। এই খেলাই গত চার মাস ধরে চলছে। তার পরও বিপদ কখনো বলে-কয়ে আসে না। তাই কফিলউদ্দিন আহমেদ রায়েরবাজারের বাসা থেকে এক পাক ঘুরে আসতে চাইলে, তিনি তাকে একা রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যান।
বাসার সামনের রাস্তা ধরে কফিলউদ্দিন আহমেদ বারবার টহল দিচ্ছেন, অথচ নিজের বাড়ি চিনতে পারছেন না। যে বাঁশঝাড়টা নিশানা হতে পারত, তা উধাও। কালো গেটের গায়ে সাদা রঙে লেখা ঠিকানাটা নেই। উঠোনের টিউবওয়েলের মাথা ভাঙা। চারপাশের মুলিবাঁশের বেড়া মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। সন্তান আর জমি–এই যার সারা জীবনের অর্জন, এসব চলে গেলে আর কী থাকে মানুষের! গাঁয়ে বসেই শহরের বাসার হালহকিকত লোকমুখে তিনি শুনেছিলেন। তবে এসে যে বাড়িটা খুঁজে পাবেন না, তা গায়েব হয়ে যাবে-ভাবতে পারেননি। নিজের কপালের গাল-মন্দ করতে করতে যখন ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন, তখন পাশের বাড়ি থেকে একজন রাস্তায় নেমে আসে। লোকটা সুহৃদ। কফিলউদ্দিন আহমেদকে চেনে বাড়ি করার সময় থেকে। তারপর বহুদিন দেখা হয়নি। তবে যুদ্ধ মানুষের চেহারা-ছবি এমন বদলে দিয়েছে যে, আপনজনকেও আজকাল অচেনা লাগে। ঘরদোরের কথা না-হয় বাদই দেওয়া গেল। কফিলউদ্দিন আহমেদকে লোকটা বাড়ির দোর পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। মাইনের ভয়ে নিজে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। স্বয়ং বাড়ির মালিকেরও তখন আর সাহস হয় না ভেতরে ঢোকার। তিনিও পড়শির পাশে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইলেন।
বাড়িটা বলতে গেলে যুদ্ধের পুরো সময় আর্মির প্রমোদখানা ছিল। তখনই মুক্তিফৌজের ভয়ে বাঁশঝাড় নির্মূল করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে বাংলায় লেখা ঠিকানাটা মুছে এর জায়গায় টাঙানো হয় নতুন সাইনবোর্ড, তাতে উর্দুতে লেখা–হারেম। এসব হাজি সাহেবের অসামান্য কীর্তি। তবে পড়শি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ যে, আশপাশের লোকজনের জানমাল তিনি রক্ষা করেছেন। কিন্তু আমার জানমালের যে ক্ষতি করল-কফিলউদ্দিন আহমেদ চটে গেলেন। সবাই যদি এভাবে রাজাকারদের সাফাই গায়, সরকার যতই দালাল-রাজাকার পাকড়াও করুক, বিচারটা হবে কীভাবে। অপরাধ প্রমাণ করতে সাক্ষী তো লাগে, নাকি? পড়শি কফিলউদ্দিন আহমেদের প্রতি সহানুভূতিশীল, তবে তার ক্ষতির ব্যাপারে একমত নয়। কারণ হাজি সাহেব বাঁশঝাড় কেটে সাফ করে অন্যায় কিছু করেননি। শহরে ঝোঁপজঙ্গল থাকাটাই বেমানান। কফিলউদ্দিন আহমেদ এবার লজ্জায় অপোবদন, অজায়গায় একটা বাঁশঝাড় জন্ম দিয়ে তিনি যেন রাজাকারির চেয়েও বড় অপরাধ করে ফেলেছেন। পড়শির আগ্রহ তাতে বেড়ে যায়। সে বলে, সেই সঙ্গে হাজির খরচায় তার খাট্টা পায়খানাটা যে তখন পাকা হয়ে গেল, এই হিসাবটাও ধরা দরকার। চলে যাওয়ার আগে বাড়ির ভিটায় মাইন পুঁতে গেছে মিলিটারি। আর টিউবওয়েলের মাথা গায়েব হয়েছে স্বাধীনতার সময়। এরপর এখানে তৈরি হয় মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প। তারা উর্দুতে লেখা সাইনবোর্ড টেনে নামিয়ে পুড়িয়ে ফেলে। মিলিটারিরা দরজা-জানালার পাল্লা ভেঙে বিরানি পাকিয়েছিল। কাঠের চেয়ার টেবিল আলনা খাট আর টিনের চাল খুলে দিনদুপুরে লোক লাগিয়ে নিয়ে গেছে। হাজির এক সাগরেদ। আর রাতের বেলা বই-খাতা, হাঁড়িপাতিল সের দরে বিক্রির জন্য তুলে নেয় এক ছিঁচকে চোর। মাইন ফেটে একজন মুক্তিযোদ্ধার পা উড়ে গেল। সেই পা হাসপাতালে যাওয়ার পর কেটে বাদ দিয়েছিল এক বিদেশি ডাক্তার। পাতকুয়োটা বুজিয়ে ফেলা হয়েছে যুদ্ধের পর, কারণ মেয়েদের মাথার চুল আর হাড়গোড়ে তা ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। ভারতীয় সৈন্যরা মাইন উদ্ধার করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।
