গোলাম মোস্তফা তার জন্য প্রস্তুত হয়েই ছিলেন।
মগবাজারের বাড়িতে যদিও আগের সেই জেল্লা নাই, জানালার পর্দা ঘেঁড়া, টেবিলের কাপড় ও বালিশের ওয়াড়ে ময়লা জমে মাটি মাটি; রসুইঘরের চুলায় রেশনের দুর্গন্ধময় চাল ফুটছে, তবু গোলাম মোস্তফা সদাহাস্যময় চেহারাটা নিয়ে তাদের অভ্যর্থনা জানান। মনোয়ারা বেগম মায়ের পেটের ভাইকে জড়িয়ে কেঁদেকেটে একশেষ। মামার কথায় ছেলেমেয়ে দুটিকে পড়তে পাঠিয়েছিলেন শহরে। কখনো দুর্ভাগ্যের জন্য নিজের কপালের দোষ দিচ্ছেন, পরক্ষণে গোলাম মোস্তফাঁকে দায়ী করছেন। কফিলউদ্দিনের হাবভাব কিন্তু ভিন্ন। তিনি যেন মাতৃজঠরের নিরাপত্তায় প্রবেশ করেছেন। এমন একজন অবিচল মানুষই আজ তার দরকার, যে তার সামনে দাঁড়িয়ে এবং শত অভিযোগ-বিড়ম্বনায়ও যে চুল পরিমাণ টলছে না। তবে লোকটার পূর্বের কর্মোদ্যম আর তৎপরতায় যেন কিঞ্চিৎ ভাটা পড়েছে। বাড়ি থেকে সারা দিনে একবারও তাকে বেরোতে দেখা যায় না। বন্ধুবান্ধব থেকেও নেই। খবরের কাগজের অক্ষরগুলোই এখন তার দিকনির্দেশক। টাল টাল কাগজের তলা থেকে কফিলউদ্দিন আহমেদকে দেখানোর জন্য কয়েকটা পাতা তিনি টেনে বাইরে আনেন। মেরির মতো মেয়েদের চিকিৎসা আর পুনর্বাসনের জন্য বিদেশ থেকে টাকা আর মানুষ আসছে। মেয়েগুলো সুস্থ হওয়ার পর কাজ শিখবে। অর্থের অভাব নেই। তাদের চাকরি দেওয়া হবে। চাইলে কেউ কেউ ব্যবসা ফেঁদেও বসতে পারে। কিন্তু এসব কি জীবনের সব? বিয়ের দিকটা ভাবা দরকার। এ নিয়ে এমনকি সরকারও ভাবছে। বিয়ের বিজ্ঞাপন পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। গোলাম মোস্তফা নিউজপ্রিন্টের পাতাটা ভগ্নীপতির সামনে মেলে ধরে বলেন, ‘দুলাভাই, এই দেখেন।’
কফিলউদ্দিন আহমেদ ভিরমি খেলেন। সরকারের এত প্রশংসা যে, শ্যালক আবার দলবদল করল নাকি? তিনি গোলাম মোস্তফাঁকে দেখবেন, না কাগজের দিকে তাকাবেন। যেহেতু মেয়েটা তার এবং এ নিয়েই কথা হচ্ছে, তিনি কাগজে মনোনিবেশ করেন। কিন্তু গোলাম মোস্তফা মনে করছেন, বীরাঙ্গনাদের যারা বিয়ে করতে আসছে তারা সৎ নয়, এখানে তাদের স্বার্থ আছে। সরকার যতই বাহবা দিক, তাদের দেশপ্রেমিক বলুক, তারা আসলে দেশপ্রেম থেকে আসে না বিয়ে করতে। সবার যেমনই হোক, মেরেকেটে একটা পরিবার আছে, সমাজ আছে। সমাজ চুপ থাকবে না। থাকলেও কত দিন। ওস্তাদের মার শেষ রাতে। যুদ্ধের শোকতাপ ফুরোনোর আগেই সমাজের বাকস্ফুরণ ঘটবে। ‘এ ছাড়া দুলাভাই!’ বড় বোন বা স্ত্রী আশপাশে আছে কি না একবার দেখে নিয়ে গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আপনে পুরুষ, আমিও পুরুষ। আপনে ওদের বিয়ে করবেন, না আমি করব? কফিলউদ্দিন আহমেদকে। অপ্রস্তুত আর দুঃখিত হতে দেখে ঠা-ঠা করে হেসে উঠলেন তিনি। গলা থেকে চি-চি করে একটা চিকন আওয়াজও বেরোল। একা দ্বৈতকণ্ঠে হাসতে হাসতে গোলাম। মোস্তফা বড় বোনের স্বামীকে বললেন, ‘গতকাল দুলাভাই, সাজুকে কাগজটা দেখিয়ে কচ্ছিলাম–কি রে বিয়া করবি? অমনি ছেলের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।’
কফিলউদ্দিন আহমেদের মুখটাও শ্যালকের কথা শুনে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কত আশা করে ঢাকা এসেছেন। মেয়েকে বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য তো আসেননি। বাড়ি নিয়ে কী করবেন? ঘরের খুঁটি দেবেন? ওর একটা সুব্যবস্থার জন্যই স্বামী-স্ত্রীর ঢাকা আসা। বীরাঙ্গনা বিয়ে করতে হাবা সাজুরও যদি অরুচি, অন্যরা কী করবে?
গোলাম মোস্তফা এরকমই চাইছিলেন আর এভাবে। কফিলউদ্দিন আহমেদকে অকূল দরিয়ায় ঠেলে দিয়ে, মেরির সঙ্গে সাজুর বিয়ের টোপ বঁড়শিতে গেঁথে তিনি পানিতে ফেললেন। দুলাভাইয়ের এখন টোপ না-গিলে তীরে ওঠার জো নেই। বীরাঙ্গনা যে বিয়ে করে, রাষ্ট্রীয়ভাবে সে যদি দেশপ্রেমিক হয়, তার বাপ কি রাজাকার? সে-ও দেশপ্রেমিকই। তবে মুখে বললেন, এ বিয়েতে গোলাম মোস্তফার কোনো খাই নেই, কোনো ডিমান্ড নেই। সরকার ঘোষিত সেলাই মেশিন, সংসারের হাঁড়িপাতিল, বাসনকোশন কিছুই তার চাই না। বর্তমানে বেহাল অবস্থায় পড়েছেন তো কী, এখনো মেরিকে দশটা সেলাই মেশিন কিনে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। রহমানের রাহিমের অশেষ কৃপা যে, সাজু ছোটবেলা থেকে মেরিকে ভালোবাসে। হোক না বোকা-হাবা, ভালোবাসার খামতি নেই। বিয়েতে তার আপত্তি থাকবে না।
কফিলউদ্দিন আহমেদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে–একটা লালা-ঝরা মুখ, বেকুব চেহারা, ঘিলুহীন মাথা। তার বিএ পাস মেয়েটার বিয়ে এই অমানুষটার সঙ্গে! অন্য সময় হলে এক থাপ্পড়ে শালার বড় মুখ ভোঁতা করে দিতেন। খোদা তাকে মেরে রেখেছে। ছেলেটা বেঁচে থাকলে দু’দিন আগে হোক পরে হোক এর শোধ তিনি তুলতেনই। কিন্তু আজ ভবিষ্যৎ বলেও তার কিছু নেই। মেয়েটাও কপালপোড়া। তাকে নিয়ে তিনি কী করবেন? ফুলতলি গায়ে ফিরবেন কোন মুখে? ভয়টা তার ওখানেই। শ্যালকের পীড়াপীড়িতে একসময় শ্রান্ত হয়ে বললেন, ‘তোমার বুবুর সঙ্গে কথা কয়ে দেখি। মেয়েটা তো তারও–নাকি?’
বাহ্ বাহ্, ভূতের মুখে রাম নাম। কস্মিনকালে কফিলউদ্দিন আহমেদ স্ত্রীর মত নিয়েছেন কি না সন্দেহ। কখন আবার বলে বসেন, মায়ের সঙ্গে মেয়েরও মত লাগবে। দেশ স্বাধীন হয়েছে বলে জেনানারাও স্বাধীন, কোন কিতাবে লেখা আছে। রোজ তিন চারটা পত্রিকা তো গোলাম মোস্তফা একাই নাড়াচাড়া করেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন। এই যে দফায় দফায় মিলিটারির জারজ বাচ্চা পাঠানো হচ্ছে বিদেশে, তা কি মায়েদের মত নিয়ে? হোক না বীরাঙ্গনা, মা তো। কোন মা বুক খালি করে চিরতরে দুধের সন্তান বিদেশ পাঠায়! আসলে স্ত্রীর মত নেওয়ার মতো কাঁচা লোক কফিলউদ্দিন নন। পাত্র হিসেবে সাজুর নাম গালে উঠছে না, তাই ছুতো খুঁজছেন। সময় নিচ্ছেন। যদি দৈবক্রমে বড় ঘরের পাত্র জুটে যায়! বাইরে সহজ-সরল, ভেতরে জিলিপির প্যাঁচ, নিজের এই ভগ্নীপতিকে তিনি ভালোমতোই চেনেন। তবে কথা হলো, শুভ কাজে বিলম্ব করতে নেই। তাই গোলাম মোস্তফা বললেন, ‘বুবুরে রাজি করানোর ভার আমার। ভাইপোটা তো তারও নাকি?’
