বীরাঙ্গনা জাতির গর্ব। তাদের নিয়ে আজকাল খুব নাচানাচি হচ্ছে। কেবল দেশের লোকই নাচছে না, বিদেশিরাও নাচছে। মুক্তিযোদ্ধা ভাগনেটা আজ বেঁচে থাকলে গোলাম মোস্তফার এই দুরবস্থা হতো না। স্বাধীনের চার মাস পরও সে যখন ফিরল না, আর কি ফিরবে? গোষ্ঠীতে একজন মুক্তিযোদ্ধা থাকলে আজকাল পুলসেরাতও পার হওয়া যায়। তিন-তিনটা বেজন্মার পিতা হয়েছেন তিনি। একটাও যদি কোনো কাজে লাগে। যুদ্ধের নয়টা মাস, বিছানায় শুয়ে-বসে ছাড়পোকার ডিমে তা দিয়ে বংশ বিস্তার ঘটিয়েছে শুধু। ফাঁকে ফাঁকে তাস নিয়ে বাজি। পাকিস্তান হারবে না ভারত জিতবে। যেন ক্রিকেট ম্যাচ। তাদের একজনও যদি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিত বা যুদ্ধে শহিদ হতো, তাহলে তো তিনি আজ বীর বিক্রম (বিবি) কি বীর প্রতীক। (বিপি) মুক্তিযোদ্ধার ভাগ্যবান পিতা। তার সম্পত্তি দখল নেয়, এমন বুকের পাটা কার। যা হোক বাকি আছে ভাগনিটা, সে একজন বীরাঙ্গনা, জাতির গর্ব। গোলাম মোস্তফা মনে মনে ফন্দি এঁটে কফিলউদ্দিন আহমেদকে লিখেন, ‘দুলাভাই, আপনার নসিবটাই মন্দ। কোন পাপে খোদা নাখোশ হলেন কে জানে। সব তার মর্জি। আমরা তার আজ্ঞাবহ মাত্র। তবে মুশকিল যিনি দেন, আসানও তিনি করেন। বুবুসহ অতিসত্বর ঢাকা চলে আসেন। যত খারাপ অবস্থায়ই থাকি না কেন, আপনার পুত্র কন্যার জন্য এই অধমের দ্বার অবারিত। ইতি আপনার স্নেহের গোলাম মোস্তফা।’
চিঠিটা ভাঁজ করে তোরঙ্গে রেখে কফিলউদ্দিন আহমেদ তৈরি হতে বলেন স্ত্রীকে। কী ব্যাপার কী বৃত্তান্ত, মনোয়ারা বেগম কিছুই জানেন না। শ্যালক-দুলাভাইয়ের চিঠি চালাচালি তার কাছে গোপন রাখা হয়েছিল। তিনি ভাবলেন, মন্টুর কোনো খবর, যা খারাপই। ভালো কিছু হলে ছেলে নিজেই বাড়ি আসত। মন্টু, তার জলজ্যান্ত ছেলেটা, গত এক বছর খালি স্বপ্নে দেখা দিয়েছে। ঘুম ভাঙার পর নাই, কোথাও নাই। তার। চোখের সমুদ্রে দিনমান ডুবে থেকে রাতের অন্ধকারে দূরতম সাগরের মাঝখানে ভেসে ওঠে। হাত-পা ছুঁড়ে সাঁতরায়। তাকে ছোঁয়া যায় না। তার নির্দিষ্ট কোনো আকারও। নেই। একেক দিন একেক রকম। গর্ভে থাকার সময়টার মতন। এভাবে স্বপ্নের মধ্য দিয়ে, বিশ বছর পর, মন্টু যেন মাতৃগর্ভে ফিরে আসে।
মন্টু পেটে আসার পর মনোয়ারা বেগম মনেপ্রাণে চাইতেন, ছেলে হোক। ছেলেই যেন হয় খোদা। দু-দুটো মরা ছেলে জন্ম দেওয়ার পর বিয়ের দশ বছরের মাথায় মেরি হলো। মেয়েটা স্বাস্থ্যবতী, হাস্যোজ্জ্বল। কিন্তু কেউ খুশি হলো না তাতে। এর চেয়ে মৃত পুত্রের জননী হওয়া যেন গর্বের–সকলের এমনই মনোভাব। অনেক তাবিজ-কবচ আর পিরের থানে শিরনি দেওয়ার পর মন্টু এল। বংশের একমাত্র ছেলে। মাটিতে রাখলে পিঁপড়ে খাবে, পানিতে নিলে সাপে কাটবে, এমন তুলুতুলু করে মানুষ। করেছেন। মেরির একগুঁয়েমির পাশে ছেলে হয়েও সে নম্র-শান্ত। খেতে না পেলে যে কাঁদত না, যা করতে বলা হতো তা-ই করত, সেই ছেলের বুকে এত আগুন ছিল? সে যুদ্ধে চলে গেল নিজের মাকে না বলে! ছেলের হারিয়ে যাওয়ার চেয়ে তার বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণাটাই যেন প্রবল। শরীরের একটি অঙ্গ যেন প্রতারণা করল বাকি শরীরটার সঙ্গে। মনোয়ারা বেগম ডুকরে কেঁদে ওঠেন।
এ দৃশ্য কফিলউদ্দিন আহমেদের আর সহ্য হয় না। যুদ্ধের পুরো সময়টায় পাকসেনার ভয়ে পুত্রকে আর সমাজের ভয়ে মেয়েকে আড়াল করতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মাঝখানে দেয়াল উঠে গেছে। এর পলেস্তারা এখন খসে পড়ছে। মুখব্যাদান করছে। কুৎসিত ইটের গাঁথুনি। কী হবে তাদের? বাকি জীবন কাটাবেন কী করে? খোদার হাতে এমন কিছু কী দেওয়ার আছে, যা থেকে তারা এর পরও বাঁচার খোরাক পাবেন? একমাত্র ছেলেটা নেই। মেয়ের এভাবে থাকার চেয়ে না-থাকাটাই ভালো ছিল। কিন্তু তাকে ফেলতেও তো পারছেন না। কফিলউদ্দিন আহমেদ বাবা। তিনি আর সব। বাবাদের মতো বিশ্বাস করেন, সন্তানদের দুনিয়ার মুখ দেখিয়েছেন এই অঙ্গীকারে যে, সর্বশক্তি দিয়ে, শেষ সামর্থ খরচ করে তিনি তাদের রক্ষা করবেন। এত বড় যুদ্ধ। কত অসহায় তিনি। পারলেন না ছেলেমেয়েকে বাঁচাতে।
যে মানুষকে কোনো দিন কাঁদতে দেখা যায় না, সে যে কাঁদতে জানে, মানুষ তা ভুলে যায়। তার হো-হো শব্দে বুকফাটা চিৎকারটা তাই ঠাট্টার মতো শোনায়। মনোয়ারা বেগম প্রথম বুঝতে না-পেরে চমকে ওঠেন। দুজনের মাঝখানের দেয়ালটা যেন ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে। পাথরসদৃশ একজন মানুষ, স্ত্রীর লুকিয়ে কান্নাও গত এক বছর যার অনুমোদন পায়নি, চোখের সামনে তাকে ভেঙেচুরে মাটি-কাদায় মিশে যেতে দেখছেন মনোয়ারা বেগম। হায় বাপ! এমন নিষ্ঠুর কেউ কি দুনিয়ায় আছে, যে সন্তানের মরা মুখ দেখার আগে নিজের মরণ চায় না? তার স্বামী আসলে তো একটা জিন্দা লাশ। মিলিটারির ভয়ে এতদিন বাঁচার ভান করে ছিলেন। মনোয়ারা বেগমের একার গোপন কান্না আর গোপন থাকে না, দুজনের কণ্ঠ চিরে তা জনসমক্ষে বেরিয়ে আসে।
দরজার পাল্লা ধরে হিক্কা তুলে কাঁদছে ছোট দুটি যমজ মেয়ে রত্না আর ছন্দা। চোখের জল আর হাতের কাদায় তাদের কচি গাল দুটি মাখামাখি। ফুলতলি গ্রাম ভেঙে পড়েছে বাড়ির উঠোনে। এক ঝাক কাক কা কা করে উড়ে আসে সুন্দরীর জলার ওপর দিয়ে। দেশ স্বাধীন হয়েছে, দেখতে দেখতে আজ চার মাস হয়ে গেল। এলাকার কে বাঁচল, কে মারা গেল–এর হিসাব-নিকাশ শেষ। যুদ্ধের নয় মাস মিলিটারির ভয়ে গোপন রাখা হলেও মন্টুর ঘটনাটা এখন প্রকাশ্য। খবরের কাগজে নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি ছাপিয়ে তা জানান দেওয়া হয়ে গেছে। মেরি একা রহস্যময় পর্দার আড়ালে। তা বলে গাঁয়ের লোকের অজানা কিছু নেই। তারা শুধু এত দিনের গুজবটার সত্যতা যাচাই করতে উঠানে জড়ো হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর যৌথ শোকপ্রকাশের মধ্য দিয়ে তারা তা জেনেও গেছে। কফিলউদ্দিন আহমেদ যখন সস্ত্রীক ঢাকা রওনা করেন, গোপনীয়তার আব্রু হারিয়ে তখন পথের ভিখিরির অবস্থা তার। নিঃস্ব, সম্মানহীন। এই অবস্থায় তিনি সুন্দরীর জলা অতিক্রম করেন, ভিড় ঠেলে বাসে চড়েন, ভাঙা ব্রিজের নিচ দিয়ে খেয়া পার হন, তারপর খানিকটা রিকশা, ফেরি পারাপার, আবারও বাস, অবশেষে ঢাকা। সেখানে আছে গোলাম মোস্তফা, তার নিদানকালের বন্ধু, যে তাকে খোয়ানো সম্মান ফিরিয়ে দিতে পারে।
