‘লোকটা দেখতে কেমন ছিল?’ মুক্তির প্রশ্নটা ধর্ষিত মেয়েকে উকিলের জেরা করার মতো শোনায়। নিজের কানেই তা বেখাপ্পা ঠেকে। তবু সে নিরুপায়। বকুলের মুখে ধর্ষণের বীভৎস বর্ণনা শোনার চেয়ে এ মুহূর্তে প্রশ্ন করাটাই শ্রেয়। মুখ বেঁকিয়ে বকুল বলে, ‘কালো-ছালো, হ্যাংলা!’ আর নিজে সে তখন ছিল হালকা-পাতলা, গায়ের রং শ্যামবর্ণের। ‘এখনো সাজলে তুমি আমারে চিনতে পারবা না।’ বকুল মুক্তিকে গর্ব করে বলে। যা হোক, ১৫ মিনিটে কেয়ামত হয়ে গেল। পাশের ঘরে শাশুড়ি ছোট ছোট দুই নাতনি নিয়ে জায়নামাজে বসা। উঠে আসারও সময় পেলেন না। দরজার সঙ্গিনধারী ঘরে ঢুকে বাক্সের তালা ভেঙে স্বর্ণের মাকড়িজোড়া তুলে নিল। দেয়ালের তাক থেকে সরাল মোরগমার্কা টেবিল ঘড়িটা, যা বড় মেয়ের জন্মের পর ওর নানা নাতনিকে উপহার দিয়েছিল। সেটা পকেটে ঢুকিয়ে পাষণ্ডটা লেদারের সুটকেসটা দু’ভাগ করে রেখে চলে যাওয়ার সময় বকুলের মুখে একদলা থুতু ছিটাল আর কিছু করেনি।
স্বামী বাড়ি ফিরে এটা ভাঙে, ওটা আছাড় মারে। মিলিটারির মতোই তার আচার ব্যবহার। শ্বশুর-শাশুড়ি পুত্রবধূর হাতের রান্না খান না। বকুল পাকের ঘরে বিছানা পেতে চোখের পাতা এক করলে শুধু দেখে, মিলিটারির ভয়ে সে পালাচ্ছে-এই পাড়া থেকে ওই পাড়া, ওই পাড়া থেকে এই পাড়া। কেউ তাকে আশ্রয় দিচ্ছে না। এভাবে কোনোমতে দেশ স্বাধীন হয়। বকুলের দূরসম্পর্কের মামা খবর পেয়ে ছুটে আসেন। দেনদরবার করেও কিছু হয় না। মেয়ে দুটিকে তারা রেখে দেয়। বকুল শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে মাফ চেয়ে জন্মের মতো স্বামীর বাড়ি ছেড়ে চলে আসে ঢাকায়। ধানমন্ডির তিন নম্বর বাড়িতে তার এমআর হয়েছিল ’৭২ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে।
মরিয়ম তখনো পুনর্বাসনকেন্দ্রের হাসপাতালে। ছোটখাটো সমস্যা বাদ দিলে সুস্থই আছে। কিন্তু সেলাই-ফোঁড়াই, টাইপিং বা রান্না শেখায় তার মন নেই। সে মুক্তিকে বলে, ‘এসব কাজে মনের স্থিরতা লাগে, গিন্নিবান্নির মতো ধৈর্যের দরকার হয়,’ যার একটিও তখন তার ছিল না। কারণ অতীতটা বিভীষিকা, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত আর মন্টুর অস্তিত্ব শুধু নিখোঁজ সংবাদের পাতায়, এদিকে পত্র পাঠানো সত্ত্বেও কফিলউদ্দিন আহমেদের দেখা নেই। এ কষ্টের ভেতর পূর্বপরিচিত বলতে মিলিটারি ক্যাম্পের সঙ্গী শোভা রানী। সে হানাদার বাহিনীর ছেলের মা হবে। ডেলিভারির আগের রাতে মরিয়ম তার মাথার চুল দু’ভাগ করে দুটি বেণি করে দেয়। বিধবার প্রথম সন্তান। এটা শেষ চান্সও বটে। মরিয়মের বয়স মাত্র বাইশ। যখন তার বিয়ে হবে, বাচ্চা বিয়োনোর সময় আসবে, তখন শোভা রানী পাশে না থাকুক, অন্য কেউ নিশ্চয় চুল আচড়ে বেণি করে দেবে। শোভা রানী উত্তেজিত। বলে, ‘ইশ্ মেরিদি, কী গরম!’ তার গলায় আর মুখে মরিয়ম আদর করে পাউডার পাফ বুলিয়ে দেয়। লেবার রুমে ডাক্তারের নির্দেশমতো ঘন ঘন চাপ প্রয়োগ আর কাতরানোর সময় তার ঘাম ও চোখের জলে পাউডার ভিজে কাদা হয়ে গিয়েছিল। প্রসূতি একবার কাঁদে, একবার হাসে। সে একটা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সারা রাত যুদ্ধ করে। ভোররাতে উঁচু পেটটা ধীরে ধীরে নেমে গিয়ে শোভা রানীর দু’পায়ের ফাঁকে বিমল দাসের বংশের প্রদীপ জ্বলে ওঠে।
কফিলউদ্দিন আহমেদ সপরিবারে ঢাকা আসার চার দিন আগে শোভা রানীর শাশুড়ি সুরবালা লোকজনকে জিগ্যেস করে করে বীরাঙ্গনা অফিসে পৌঁছে যান। পুনর্বাসনকেন্দ্রের পত্র পেয়ে নবজাতকের ঠাকুমার আর তর সইছিল না। কাপড়ে চিড়ে-গুড় বেঁধে চলে এসেছিলেন ঢাকায়। শোভা রানী যা ভেবেছে, তা সত্য হয়েছে। কিন্তু অনুরাধা কই? দরজায় গ্রেনেড ফাটার পর থেকেই সে উধাও। হানাদাররা হলরুমে তাকে ফেরত পাঠায়নি। শোভা রানী স্বাধীনতার দিন পর্যন্ত ওখানেই ছিল। কী হলো অনুরাধার? মরিয়মের মতো ক্যান্টনমেন্টের কোনো একটি ঘরে হয়তো আরেকজন আর্মি অফিসার রিপোর্টে ‘বিপজ্জনক’ লিখে তাকে আটকে রেখেছিল। অনুরাধা কি শেষমেশ পাকিস্তান যেতে পেরেছে? মরিয়মের হঠাৎ মেজর ইশতিয়াকের কথা মনে পড়ে। নিজের ওপর তার আস্থার অভাব। পেটে বাচ্চা নিয়ে লাহোরের গুলবাগিচায় যাওয়াটা তাই বেমানান মনে হয়েছিল। পাঞ্জাবি মহিলার গোলাপি লিপস্টিক রঞ্জিত ঠোঁট আর আঁকা ড্রর কাছে সে নির্ঘাত হেরে যেত। সম্মোহনী চোখ, মোহিনী রূপ বাংলামুলুকের নিজস্ব সম্পদ। এখানেই বিকাশ, এখানেই লয়। বাইরে হয়তো তা লক্ষ্যভেদী হয় না। অনুরাধা মাইনাস ফাইভ পরকলায় ঢাকা ঘোলা চোখ নিয়ে ওখানে গিয়ে থাকলে, এখন কী করছে?
পুত্র কোলে শাশুড়ি সুরবালার সঙ্গে শোভা রানীর চলে যাওয়ার পর মরিয়মের নিজেকে নিঃস্ব মনে হয়। জরায়ুর শূন্যতা হঠাৎ তাকে গ্রাস করে। একই দিনে ডাকে ফেলা চিঠির সাড়া দিয়ে সুরবালা এসে নাতি-পুত্রবধূ নিয়ে চলে গেলেন, কফিলউদ্দিন আহমেদের এখনো দেখা নেই। বংশের বাতিই সব, জীবিত মেয়ের কোনো দাম নেই, এত বড় একটা যুদ্ধের পরও? লাখ লাখ মানুষ মারা গেল, সেবাসদন আর অন্যসব জায়গায় বীরাঙ্গনাদের বাচ্চা হয়েছিল কয়টা। তাদের বিদেশ না পাঠালে স্বাধীন দেশটার কী ক্ষতি হতো? তারা পাকিস্তানি জালিমের বাচ্চা শুধু, বাঙালি মেয়ের নয়? খোঁচাখুঁচি করার ফলে জরায়ু আহত হয়েছে তো মরিয়মের একার, মেজর ইশতিয়াক যে শরীর নিয়ে এসেছিল সেই শরীরেই ফিরে গেছে। তার আসা-যাওয়ার পথটাই শুধু বদলে গিয়েছিল। আগমন : পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ। নির্গমন : বাংলাদেশ ভারত-পাকিস্তান। ব্যস, এইটুকুই। মাঝখানে কতশত মানুষ মারা গেল, কতশত মেয়ে নির্যাতিত হলো, কতশত ঘর পুড়ল, কয়েক শ ব্রিজ আর কালভার্ট উড়ে গেল-মরিয়ম বীরাঙ্গনা অফিসে জনে জনে জিগ্যেস করে আর আঙুল গুনে হিসাব করে। সকালের দিকে সংখ্যাটা গণনাযোগ্য মনে হলেও দুপুর নাগাদ সে খেই হারায়। রাতটা পার হয় মরফিনের ঘোরে। পরদিন সংখ্যাগুলো ছোট ছোট সাপের আকৃতি নেয়। তৃতীয় দিনে ডাক্তার রোগ নির্ণয় করলেন–ইপিলেপসি সাইকোসিস। এর উপসর্গ হচ্ছে ঘুম না হওয়া, খেতে না পারা, মূৰ্ছা যাওয়া, ছোটাছুটি করা, অস্থির হয়ে পড়া। চতুর্থ দিনে কফিলউদ্দিন আহমেদ মেয়েকে শনাক্ত করলেন। কর্তৃপক্ষকে বললেন যে, পাগলামিটা তাদের পারিবারিক অসুখ। যুদ্ধের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। মেরির দাদিরও মাথা গরম ছিল। তার এই নাতনি কোনো কারণ ছাড়াই একবার সিনেমা দেখার নাম। করে বাড়ি থেকে চলে যায়। ২৫ মার্চের আগে শহরের লোকজন যখন যার যার গ্রামের বাড়িতে চলে যাচ্ছিল, সে তখন ছোট ভাইকে ফুলতলি পাঠিয়ে রায়েরবাজারের বাসায় একা পড়ে থাকে। এসব কি পাগলামির লক্ষণ নয়? কফিলউদ্দিন আহমেদের হাটে হাঁড়ি ভাঙার কারণ আর কিছু নয়, তিনি শুধু মেয়েকে এই কলঙ্কের জায়গা থেকে গোলাম মোস্তফার কথামতো তড়িঘড়ি সরিয়ে নিতে চাচ্ছিলেন। তার পরও ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে আরো এক সপ্তাহ বীরাঙ্গনা অফিসে থাকতে হয় মরিয়মকে।
১৮. একটি আদর্শ জাদুঘর
কফিলউদ্দিন আহমেদের ঢাকা আসার বিলম্বের কারণ সাত-পাঁচ ভাবনা। মেয়েকে গাঁয়ে আনা ঠিক হবে না, বীরাঙ্গনা অফিসে রাখাও সমীচীন নয়, রায়েরবাজারের বাড়িটা শুনেছেন বাসযোগ্য নেই, তাহলে কোথায়? তিনি তার চিরকালের উপদেষ্টা গোলাম মোস্তফার শরণাপন্ন হন। যদিও চতুর শ্যালকের অবস্থা আর আগের মতো নেই। বিজয়ের আট সপ্তাহের মাথায় পত্রিকার হিসাবমতে চার হাজার দালাল গ্রেফতার হয়েছে। এদিকে গোলাম মোস্তফাঁকে মুক্তিযোদ্ধারা একবার ধরে, একবার ছাড়ে। সহায়-সম্পদ বেহাত হওয়ার জোগাড়। ঢাকার তিনটা বাড়ির দুটোই এখন মুক্তিযোদ্ধা নামদারদের দখলে। পুত্র-কন্যা এদিক-ওদিক পাঠিয়ে দিয়ে, মগবাজারের তিন কামরার বাসায় তিনি ঘাপটি মেরে আছেন। এই অবস্থায় কফিলউদ্দিন আহমেদের চিঠি হাতে আসে, ‘ভাই মোস্তফা, আমার নিদানকালের বন্ধু। তুমি জানো হয়তো, আমার বেয়াড়া মেয়েটা এখন পুনর্বাসনকেন্দ্রে। এরে নিয়া কী করি, কই যাই?’
