সাইড একট্রেস বকুলের কিন্তু মরিয়মের মতো অভিযোগ নেই। বরং তার বিরুদ্ধে মুক্তির কাছে নালিশ জানালেন তখনকার একজন সমাজকর্মী। বর্তমানে তিনি অবসরপ্রাপ্ত। বকুলের ঘটনার পর কান ধরে কসম খেয়েছেন, খোদা যেন ইহজনমে তার হাত দিয়ে অন্যের উপকার না-করায়। কারণ ভদ্রমহিলাকে সে প্রায় পথে বসাচ্ছিল। সংসারটা হয়তো ভেঙেই যেত, যদি তার সহকর্মীরা সময়মতো এগিয়ে না আসতেন। ‘মানুষের উপকার করতে নেই। বিপদ কেটে গেলে উল্টা ছোবল মারে।’ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বৃদ্ধা কথাটা বললেন মুক্তিকে।
কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না বকুলের। পুনর্বাসনকেন্দ্রের সেলাই-ফোঁড়াই- এমব্রয়ডারিতেও মন নেই। একবার ছোট ছেলের জন্মদিনে হাতে হাতে খানিকটা সাহায্য করার জন্য সমাজকর্মী তাকে বাসায় দাওয়াত করে এনেছিলেন। জন্মদিনটা যেন এ বাড়ির ছেলের নয়–ওর। বকুল সেদিন অনেক ফুর্তি আর মজা করল। ‘খালাম্মা এত সোন্দর বাসা আপনের, এইহানে থাকতে মন চায়।’ গৃহকত্রী নিজগৃহের প্রশংসা শুনে হাসলেন, ‘ধুর পাগলি, মন চাইলেই কি সব সম্ভব!’ কিন্তু মনে মনে ভাবলেন অন্য কথা। পুরোনো বাবুর্চির বয়স হয়েছে। চোখে দেখে না। দারচিনি ভেবে মরা আরশোলা তরকারিতে ছেড়ে দেয়। মেয়েটা থেকে গেলে মন্দ হয় না। বকুল থেকে গেল। রান্নাটা সে ভালোই করত। কর্তা তো তেলে-ঝোলে খেয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অফিস ছুটির পর রোজ সাবান, স্নো, পারফিউম এটা-সেটা ব্যাগে নিয়ে ফেরেন। স্ত্রীর রাগী মুখ দেখলে বলেন, ‘আমাদের মেয়ে থাকলে দিতে না এসব? ধরো ও আমাদের মেয়ে।’ তারপর আর কথা থাকে!
বকুল আসলে তাদের মেয়ের মতোই ছিল। বাসায় মেহমান এলে স্বামী-স্ত্রী তাকে নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দিতেন। মেয়েটাও তাদের আব্বা-আম্মা বলে পাখির মতো কলকলিয়ে ডাকত। কিন্তু এভাবে এক বছরও ঘুরল না। বকুলের পেটে বাচ্চা চলে এল। ‘তুই আমায় বল, কে তোর এত বড় সর্বনাশ করল। ওর সঙ্গে এখনই আমি তোর বিয়ে দেই।’ তিনি ভেবেছিলেন, বাড়ির ড্রাইভার মতিন না হয় সাদেক। জোরাজুরি করতে বকুল বলে, ‘আব্বা।’ তবু ভালো, পুনর্বাসনকেন্দ্রে ভদ্রমহিলার সহকর্মীদের জেরার মুখে সে সাদেক ড্রাইভারের নাম বলেছিল। পুরোনো ড্রাইভার ছাড়িয়ে নতুন ড্রাইভার পাওয়া গেছে। কিন্তু স্বামীর নামে কলঙ্ক রটে গেলে তিনি কী করতেন? এটা যুদ্ধের চার বছর পরের ঘটনা। বিদেশি ডাক্তাররা অনেক আগে চলে গেছে। বিশেষ অর্ডিন্যান্সের মেয়াদও শেষ। তাই বকুলের গর্ভপাত করাতে তাদের অশেষ বেগ পেতে হয়।
মুক্তি তো অবাক, এত বড় ঘটনা, অথচ বকুল বেগমের তা মনে নেই। সে বলে, ‘পিতা-পুত্রী ছায়াছবির কথা কচ্ছো নাকি তুমি?’ কারণ সেই ছবিতেও তার এরকম একটা পার্ট ছিল। সেখানে গর্ভপাত করানোর পর বিবি সাহেবের বাসা থেকে তাকে তাড়ানোর মধ্য দিয়ে কাহিনি শেষ হয়। বয়সকালে বকুল এই কিসিমের বহু সাইড পার্ট করেছে। আজকাল এসব তার মনেও থাকে না। একটার কথা ভাবলে আরেকটার কাহিনি চলে আসে। তবে সময়টা খুব ভালো যাচ্ছিল তখন। চেহারা ভালো, স্লিম। ফিগার। একবার চিত্রতারকা শাবানার প্রধান সখির পার্ট করার সময় নাচ আর ছোটাছুটির অংশটা একা তার ভাগে পড়েছিল। এমনকি পুরুষের সঙ্গে টেক্কা দিতে ছবিতে সে হিরোইনকে সিগারেট খাওয়া ধরায়, জুডো-কারাতে শেখায়। ছবির শ্রেষ্ঠাংশে বড়মানুষের ছেলের সঙ্গে বিয়ে হলো কার? কার আবার সিগারেটখোর শাবানার, জনমদুখিনি বকুলের নয়। এ নিয়ে তখন তার খুব মনঃকষ্ট গেছে। অভিনয় শেষে রাতে ভালো ঘুম হতো না। কান্নাকাটি করে বালিশ ভিজিয়ে ফেলত। মনে হতো, পৃথিবীর সবচেয়ে অন্যায়ের জায়গা সিনেমা। তবে পেটে দানাপানি থাকলে মানুষ নানান কিছু নিয়ে ভাবে, অযথা দুঃখ করে। তখন বয়স কম ছিল, টাকাও ছিল। এখন কালেভদ্রে ডাক পড়ে। নানি-দাদির পার্ট। সারা দিন স্টুডিওতে বসে বসে পিঠব্যথা, মাজার হাড় কনকন করে। দিন শেষে ম্যানেজার ছোকরা এসে বলে, ‘বকুলি, আজ হলো না রে, কাল আবার আসিস।’ এখন তো রোজ হিসেবে পেমেন্ট। তো খালি হাতে বাড়ি ফেরা। হাত খালি তো পেট খালি।
‘অন্য কাজ খুঁজে নেন না ক্যান?’ মুক্তির কথা শুনে বিরক্ত হয় বকুল। ‘সবাই বলে কাজ খোঁজো, কাজ করো,’ সে মুখ ঝামটা দেয়। ‘করলে কি কাজের অভাব? আমি তো ছিড়া ব্লাউজ-পেটিকোট পইরা রাস্তায় পয়সা তুলতে পারি। আমার অসুবিধা নাই কোনো। কিন্তু ভয়টা ইজ্জতের। বীরাঙ্গনার ইজ্জত না বাঁচলে, দেশের ইজ্জত বাঁচবো?’
‘অহ্, আপনে যে বীরাঙ্গনা, হেইডা কোন ছায়াছবির পার্ট?’
‘জীবন নামের ছায়াছবির,’ হাসিমুখে বকুলের ঝটপট জবাব।
‘এইটা ভোলেন নাই যে বড়?’
‘ভুলতে চাইলে কি ভোলো যায় রে পাগলি? কিছু কিছু জিনিস মনে থেকেই যায়।’
যে দৃশ্যটা কোনো ছায়াছবির নয়, অথচ বকুল বেগম গত উনত্রিশ বছরে এক দিনের জন্যও ভুলতে পারেনি, তা মাত্র ১৫ মিনিটের। তারিখটা আজ মনে নেই। সেদিন ছিল সোমবার। বেলা দশটার দিকে বাড়িতে মিলিটারি আসে। উঠোনে তাদের দেখামাত্র বকুল লম্বা ঘোমটা টেনে দেয়। তারা উর্দুতে ‘কুছ নেহি, ডর নেহি’ বলতে বলতে ঘরের দাওয়ায় উঠে আসে। সঙ্গিন উঁচিয়ে একজন দাঁড়ায় দরজায়। আরেকজন বকুলকে জাপটে ধরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে কাঠের তক্তপোশের ওপর।
