‘দুঃখী, জনমের দুঃখী এরা। মন্দভাগ্য নিয়া জন্মাইছিল,’ বেবি হাহাকার করে। ‘আমার যত দূর মনে পড়ে, একবার দশ জনকে দশ হাজার টাকা দিয়ে বিয়ে দেয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ওয়াইফ সংসারের যাবতীয় জিনিসপত্র, সেলাই মেশিন-টেশিন দিলেন। যারা টাকা নিয়ে বিয়ে করল, তারা খালি টাকা নিল, বউ নেয়নি। যারা বউ নিল, তারা তাদের পদে পদে অপমান করার জন্য নিল।’
আরেকজন সমাজকর্মী, যার নেশা এবং পেশা মেয়েদের স্বাবলম্বী করা, তিনি বললেন, একটা মেয়ের নাম ফুলের নাম দিয়ে, তারে আমরা বিয়ে দিছিলাম। বিয়ের পর সে সুখে আছে। বাহাত্তর থেকে ছিয়াত্তর পর্যন্ত মেয়েদের বিয়ে দেওয়া, চাকরি দেওয়া দুটি কাজই সমান দক্ষতায় তিনি করেছেন। মেয়েরা সমস্যায় পড়লে এখনো ছুটে আসে তার কাছে, খালাম্মা, আপনি আমার বয়স কী দিছিলেন চাকরির সময়? এখনই আমার রিটায়ারের সময় হয়ে গেছে! তখন কী দিয়েছিলেন তাড়াহুড়োয় নিজেরও তার মনে নেই। আসলে দুশ্চিন্তায় দুশ্চিন্তায় মেয়েগুলোকে তখন বয়স্ক দেখাত। ষোলো বছরের মেয়েকে মনে হতো ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের। তিনি স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে বেরিয়েছিলেন, মেয়েরা কে কেমন আছে খোঁজখবর নিতে। একজন বাড়ির গেট থেকেই জানিয়ে দেয়, আপনি এখানে আর আসবেন না। আপনারে দেখলে আমার অনেক কথা মনে পড়ে। আমার কষ্ট আরো বাড়ে। তবে দুটি বাচ্চা নিয়ে সে ভালোই আছে। সেদিন আরেকটা বাড়ি গিয়ে শোনেন, মেয়েটি দশ বছর আগে আত্মহত্যা করেছে। স্বামী দেরিতে জানতে পারে, যুদ্ধের সময় বউ শত্রুর ছাউনিতে ছিল।
‘এমন ঘটনা তো আমারও ঘটতে পারত,’ বেবি মুক্তিকে বলে। আমার বোনের ঘটতে পারত। আমার মায়ের ঘটতে পারত। আমরা বিরাট বাঁচা বাঁইচা গেছি।’ তবে চোখের সামনে যেসব মেয়ের সীমাহীন বিড়ম্বনা দেখতে দেখতে বেবি নিজের অকালবৈধব্যের যন্ত্রণা ভুলেছিল, তাদের প্রতি বরাবরই তার টান। তাদের আড়াল করার ব্যাপারে এখনো সে সচেষ্ট। বেবিরা তখন কেসহিস্ট্রি লিখে ঠিকানার অংশটা কেটে ছিঁড়ে ফেলত, যাতে মেয়েরা নির্বিঘ্নে ঘর-সংসার করতে পারে, ভবিষ্যতে কেউ তাদের নিয়ে টানা-হেঁচড়া করার সুযোগ না-পায়।
এ হলো পঁচাত্তর সাল পর্যন্ত পুনর্বাসনকারীদের চিন্তা ও কাজ। পরে যারা ক্ষমতায় আসে, তারা বান্ডিল বান্ডিল কেসহিস্ট্রি পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেয়। কিন্তু এরকম দামি রেকর্ড, ইতিহাসের উপকরণ আপনাদের কিংবা তাদের এভাবে নষ্ট করা কি ঠিক হয়েছে? এ ব্যাপারে বেবির মতামত, পেট্রোল দিয়ে পোড়ানো উচিত হয়নি, তবে এখন যে ইতিহাসের দোহাই দিয়ে মেয়েদের গরুখোঁজা হচ্ছে, তা-ও ঠিক নয়। ‘তোমরা কী করবে-না-করবে তার জন্য তারা কিন্তু বসে নেই,’ বেবি বলে। কারণ। ‘ওরা নিজেদের ভাগ্য নিজেরা মেনে নিয়েছে, কাজেই সেই জায়গায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার অবকাশ আর থাকছে না।’
তার পরও মুক্তি বেবির কাছে মরিয়মের ঠিকানা চায়! যে ঠিকানা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, বেবি নিজেই অবাক–কেমন করে তা এত বছর পরও মনে রইল! সে মুক্তিকে কড়াল করায়, কঠিন কঠিন শর্ত দেয়। তারপর দুজনে আবদ্ধ হয় এক অলিখিত চুক্তিনামায়।
বে : ঠিকানা গোপন রাখতে হবে।
মু : হ্যাঁ, নামটাও গোপন থাকবে।
বে : ওকে নিয়ে পরিহাস করা চলবে না।
মু : না! কোনো তথ্যবিকৃতিও ঘটবে না।
বে : পত্রিকায় এ নিয়ে চমকপ্রদ ফিচার লেখা চলবে না।
মু : রিপোর্ট বা পত্রিকায় কলাম লেখাও হবে না।
বে : টিভিতে প্যাকেজ নাটক করা যাবে না।
মু : স্বল্প বা পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রও নয়।
বে : ছবি ছাপানো যাবে না।
মু : সাদা-কালো বা রঙিন কোনোটাই নয়।
বে : কাজটা কঠিন কিন্তু।
মু : হ্যাঁ, খুবই কঠিন।
শর্তগুলো ছিল মৌখিক। তাই মরিয়মকে মুখে মুখেই জানাতে হচ্ছিল মুক্তির। সে শোনামাত্র এক ফুঙ্কারে উড়িয়ে দেয়। বলে, তার পক্ষে এমন কেউ শর্তারোপ করতে পারে না, যার সঙ্গে দীর্ঘ আটাশ বছর একবারও দেখা হয়নি, এমনকি যার চেহারাও তার মনে নেই। তবে মরিয়ম বেবির মতোই বলে, ‘তখন এমন এক সময় গেছে, যখন আয়নায় নিজের চেহারা দেখতেও ভয় লাগত।’ এ ছাড়া এই মুখ, এই শরীর আর কারো সঙ্গে বদলে ফেলার তীব্র ইচ্ছা হতো মরিয়মের। কিন্তু কে তাতে রাজি হবে? এমন যে দুস্থ নারী বেবিরা, যুদ্ধে স্বামী হারিয়েছে, তারাও তাতে রাজি হতো না। বিধবার বসন শুধু শুভ্র নয়, দেহটাও নিষ্কলঙ্ক, যা মরিয়মদের নেই। একদিন এক রিকশাঅলা ধানমন্ডির বাড়িটাকে বীরাঙ্গনা অফিস বলাতে সমাজকর্মীদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। কে কোনদিকে পালাবে তার ঠিক নেই। তারপর তারা নিজেরা যে বীরাঙ্গনা নয়, তা প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগে যায়। কিন্তু তা প্রমাণ করবে কীভাবে? বীরাঙ্গনাদের তো মেডেল দেওয়া হয়নি যে, অবীরাঙ্গনারা গলার কাপড় সরিয়ে বলবে, এই দেখেন ভাই, আমার গলায় মেডেল নাই, আমি বীরাঙ্গনা না। এদিকে চাকরি বা বিশেষ পদটা ঠিক রাখার জন্য এখানে রোজই তাদের আসতে হচ্ছে। গাড়ি না থাকলে রিকশাই একমাত্র বাহন। বীরাঙ্গনা উপাধিটা যেন বিষাক্ত পোকা কিংবা ছোঁয়াচে রোগ, মরিয়ম ভয়ানক তিক্ততা নিয়ে মুক্তিকে বলে, ‘এর ছোঁয়া লাগলে শরীরে ঘা হবে, হাত-পা পচেগলে খসে পড়বে।’ অথচ তারাই শতমুখে বলত, ‘তোমরা বীরাঙ্গনা, তোমরা জাতির গর্ব, তোমরা মহীয়সী নারী!’ বেবিরা মহীয়সী নারী হতে চাইত, জাতির গর্ব তাদের কেউ কেউ তো হয়েইছিল, কিন্তু কোনোভাবে বীরাঙ্গনা নয়। মরিয়মের ঘেন্না ধরে গিয়েছিল।
