মন্টুর নিখোঁজ সংবাদ ছাপা হওয়ার মাস খানেক পর মরিয়ম সংস্থার কর্তৃপক্ষকে যেচে তার ঠিকানা দেয়। পিতা কফিলউদ্দিন আহমেদ, সাং ফুলতলি, ডাকঘর সাহারপার। সেই সঙ্গে বলে যে, এটা তার নয়, মন্টুর বাড়ি ফেরার ঠিকানা। যে মন্টু একাত্তরের এপ্রিল মাস থেকে নিখোঁজ, যার জন্য বাড়িতে বাবা-মা-ছোট দুই বোন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
মরিয়মের বিলম্বিত কেসহিস্ট্রি সেদিনই প্রথম লেখা হয়। আর কাজটা করে তার সমবয়সি বেবি নামের একটি মেয়ে, যুদ্ধে যে স্বামী হারিয়েছে। মরিয়মের কথা বেবির মনে আছে এজন্য যে, তার বয়ানটা ছিল অভূতপূর্ব। লিখতে লিখতে কয়েকটা ফর্ম নষ্ট করতে হয়েছিল। অথচ প্রতিদিন কমপক্ষে একশ সোয়া শ ফর্ম কাটাকাটি না-করেই ফিলআপ করেছে বেবি। সেসব মেয়ের নাম-ঠিকানা দূরে থাক, চেহারাও আজ মনে নেই। ‘বড় নিষ্ঠুর এক সময়,’ বেবি কাঁচ-ঢাকা টেবিলের উল্টো দিকের চেয়ার থেকে মুক্তিকে বলে, ‘আয়নায় নিজের মুখ দেখতেও তখন ভয় লাগত।’
এটা তার অফিসকক্ষের নিজস্ব টেবিল। যার কাঁচের ঢাকনায় বেবির পঞ্চাশোর্ধ্ব বলিরেখাময় মুখের প্রতিবিম্ব নড়াচড়া করছে একজন তরুণের পাসপোর্ট সাইজের ফটোর ওপর। ‘ছবিটা কার?’ প্রশ্নটা করেই মুক্তির মনে হয়, সে ভুল করে আগুনে খানিকটা ঘি ঢেলে দিয়েছে। ‘স্মৃতি বড় জ্বালাময়’, বেবি বাংলা গানের কলিটা সুরহীন গাইলেও, তাতে বিষাদের ছোঁয়া থাকে। তার দ্বিতীয় স্বামী কিছুতেই চায় না যে, প্রথমজনের স্মৃতির ছিটেফোঁটা বাড়ির কোথাও থাকুক। তাই প্রাক্তন স্বামী ঠাঁই নিয়েছে। অফিসের কাঁচ-ঢাকা টেবিলে। আমার অনুভূতিগুলি খাঁচাবন্দি পাখি, বেবি পাখির গলায় বলে, ‘তাই এখানে এদের লুকিয়ে রাখতে হয়।’ যতক্ষণ অফিস ততক্ষণ প্রথম স্বামী। ঘরে ঢুকলেই বর্তমান স্বামীর খপ্পরে সে পড়ে যায়। ‘দেশ আর আমার অবস্থা এক। একইভাবে ইতিহাসকে লুকাতে হচ্ছে।’ বলে ছোট্ট করে দম নেয় বেবি। সে পুনর্বাসন সংস্থায় বাহাত্তরে যে চাকরি করতে গিয়েছিল ক্ষতিগ্রস্ত নারী হিসেবে, দেশোদ্ধারের জন্য নয়, কথাটা মুক্তিকে সরাসরি আর অকপটে বয়ান করে। তবে তাকে যখন যা করতে বলা হয়েছে, সে বিনাবাক্যে করেছে। কাজে কখনো গাফিলতি হয়নি।
সে এক এলাহি কাণ্ড। বাচ্চাগুলো বিদেশ চলে যাচ্ছে। আর বিদেশ থেকে আসছে টাকাকড়ি, অদ্ভুত চেহারার মানুষজন আর নানান কিসিমের খাবারদাবার। সেলাই মেশিন, কম্বল, দুধ, পরিজ, কাপড়-চোপড়। স্বামী-পরিত্যক্ত, বাপে-ভাইয়ে খেদানো, ভবিষ্যৎহীন, জরায়ুশূন্য মেয়েগুলো লন্ড্রি, বেকারি চালাবে, কাপড় সেলাই করবে, রুমালে আর বালিশের ওয়াড়ে ফুল তুলবে। এটি গরিব দেশের পুনর্বাসন প্রকল্প। তাই সর্বাগ্রে টাকা রোজগার করে তাদের উদরপূর্তির কথা ভাবা হয়েছিল। নিরুপায় মেয়েরা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখে। তাদের তৈরি কাগজের ফুলে অতিরিক্ত জৌলুস থাকত। বাচ্চাদের জামাগুলো হতো প্রমাণ সাইজের-রোগা-মোটা সব্বার জন্য মানানসই। তারা সুলভ আর স্বল্পমূল্যের কাঁচামাল, যেমন–বাঁশ আর পাট দিয়ে এমন সব নিত্যব্যবহার্য জিনিস বানাত, যা ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির সহায়ক। তারা সূচিকর্ম ও সূক্ষ্ম কারুকাজের মাধ্যমে গর্বিত বাঙালি জাতিকে অলংকৃত করতে সচেষ্ট ছিল। প্রথম বিজয় দিবসের প্রদর্শনীতে এসব সামগ্রীর পাশে রাখা ছিল একটি কাঁচের ঢেকি–তাদের কারো কারো হারিয়ে যাওয়া জীবনের একমাত্র স্মারক। তাতে মেয়েরা ধান কুটছে। অদূরে ধানের আঁটি মাথায় কয়েকজন পুরুষ। এ ছাড়া তাদের রান্না করা সুস্বাদু খাবার ঢাকার বিপণিকেন্দ্রের পসার বাড়িয়েছিল। আজকের দিনে শহর এলাকার কনফেকশনারিগুলোতে যে হোমমেড আচার, জেলি, জ্যাম, কেক, বিস্কুট, নকশি-পিঠা, গুঁড়ো মশলাসহ নানান নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সুলভে পাওয়া যায়, এর পেছনে আছে বীরাঙ্গনা ও বীরাঙ্গনাদের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা মেশানো শ্রম। ‘নিজেদের উজাড় করে দেশকে তারা অনেক দিয়েছে,’ বেবি মুক্তিকে বলে। ‘কিন্তু মানুষ তা মনে রাখে নাই।’
একজন বেতনভুক সমাজসেবীর মুখে এসব কথা শুনে মুক্তি অবাক হয়। মুক্তিযুদ্ধে বীরাঙ্গনাদের যে আত্মত্যাগ আর বিড়ম্বনা লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গেছে, কী নিষ্ঠুর পরিহাস, তা প্রস্ফুটিত হয়েছিল সামান্য ক’টা কাঁচের বয়ামে, প্লাস্টিকের ঠোঙায় আর রঙিন কাগজের ফুলে। শহরের গুণী মহিলারা যে যে-খাবারটা রাঁধতে জানতেন, গাড়ি করে এসে ঝটপট তাদের শিখিয়ে দিয়ে সেই গাড়িতেই বাড়ি ফিরে যেতেন। এভাবে মেয়েরা একেকজন বিনা খরচে ডাকসাইটে রাঁধুনি হয়ে উঠেছিল। তাদের তৈরি খাবার রোজ প্যাকেটে করে এমনকি সচিবালয়েও গেছে আমলাদের লাঞ্চ হিসেবে। বেবির আফসোস, ‘অতি বড় ঘরনি না পায় ঘর, অতি বড় রাঁধুনি না পায় বর।’ তা না হলে, সরকারি-বেসরকারি সব রকম উদ্যোগ-আয়োজন সত্ত্বেও ওদের ভালো ঘরে বিয়ে হলো না কেন?
শুরুতে পত্রিকায় বিয়ের বিজ্ঞাপন দেখে পুরুষের দল চিল-শকুনের মতো হামলে পড়ে। অনেক আবেদনপত্রের ইনভেলপ বেবি নিজের হাতে খুলেছে। সময়টা ’৭২ সালের এপ্রিল মাস। তখনো মেয়েগুলোর পুরুষভীতি প্রবল। বিয়ে তো বিয়ে, কথা বলায়ও চরম অনীহা। তারা আবেগশূন্য আর পাথর হয়ে গিয়েছিল। মেয়েরা নির্বাক, বেবিরাও নির্বাক। সবচেয়ে বড় কথা, তখন কারো মুখে কোনো কথা ছিল না। অগত্যা পাল্টা প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিয়ের আবেদনকারীদের বিরত রাখা হয়।
