ঘোমটার আড়ালে মুখ লুকোনো সম্ভব হলেও, পেটে তখন টাইমবোমা, বাচ্চারা টিকটিক করে বাড়ছে। যে-কোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নতুন দেশের ভবিষ্যৎ ধ্বংস। করে দিতে পারে। ‘অথচ’ সমাজকর্মী বলেন, ‘দেশ সবে স্বাধীন হয়েছে। চারদিকে ধ্বংস আর ক্ষয়ক্ষতি। কাজ করার লোক কম। প্রশিক্ষণের অভাব। কারো মাথা ঠিক ছিল না। কোনটা ছেড়ে কোনটা করব। সবই করা দরকার এবং তাড়াতাড়ি।’
’৭২ সালে বিশেষ অর্ডিন্যান্স জারি করে মেয়েদের গর্ভপাত করানোর ব্যবস্থা হয়। বিদেশ থেকে অভিজ্ঞ ডাক্তাররা আসেন। যাদের গর্ভধারণের মেয়াদ চার মাস পেরিয়ে গেছে, তাদের সন্তান জন্মাতে দেওয়া হলো। মাদার তেরেসা খুশি হলেন। একটা স্বাধীন জাতি জ্বণহত্যার পাপ থেকে আধাআধি উদ্ধার পেল। তার চ্যারিটি হোমের ছয়জন নার্স ইনকিউবেটর হাতে কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে নেমে ঘোষণা দেন, ‘আমরা যুদ্ধশিশুদের বাঁচাতে এসেছি।’ মায়েরা পুনর্বাসনকেন্দ্রের নার্সদের নির্দেশ বা সহযোগিতায় ডেলিভারির আগের রাতে চুল আঁচড়ে টাইট করে বেণি বাঁধে, নিজেরা পরিচ্ছন্ন হয় আর পরিষ্কার জামাকাপড় পরে। তারা একটি নিঘুম রাত কাটায়, যা যুদ্ধের রাতগুলোর চেয়ে আলাদা ও ব্যঞ্জনাময়। পরদিন শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি, ভয় আর ভবিষ্যৎ উৎকণ্ঠায় তাদের প্রসবকাল দীর্ঘ আর জটিল হওয়া বিচিত্র নয়। অথচ প্রসবের পর মাথার বিনুনি ঢিলা হওয়ার আগেই তাদের বাচ্চারা দত্তক হিসেবে বিদেশে চলে যায়। পরের দিনের খবরের কাগজে পাঠকরা হয়তো দেখলেন–নার্সদের কোলে শিশু আর উড্ডীয়মান একটি বিমান।
‘তুমি কাজটা যত সহজ ভাবছ, তত সহজ ছিল না।’ মুক্তির দীর্ঘ বয়ান শুনে প্রাক্তন সমাজকর্মী বললেন, ‘মেয়েরা চিল্লাফাল্লা করত। এমনও হয়েছে যে, মাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে চুপিচুপি বাচ্চাটা সরাতে হয়েছে। এসব বাচ্চা দেশে রাখা যাবে না–এরা পাকিস্তানি বাস্টার্ড। যদি কোনো ফরেন কান্ট্রি অফার করে, তাহলে আমরা বাচ্চা দিয়ে দেব ফর অ্যাডপশন। তো বেশিরভাগ বাচ্চা গেছে কানাডায়। স্ক্যান্ডেনেভিয়ায় আমাদের প্রচুর বাচ্চা গেছে।’ সমাজকর্মী কথা বলতে বলতে মুক্তির কানের কাছে মুখ নিয়ে আসেন, ‘ওই যে মোল্লারা, ওরা তখন টেলিফোন করে বলত, বাইরে বাচ্চা দিতে পারবেন না, সব খ্রিষ্টান হয়ে যাবে। তারা কিন্তু ভালো কোনো কাজে ছিল না। নয় মাস হয়তো রাজাকারিই করেছে–তবু।’
এই সমাজকর্মী যুদ্ধের সময় রাজাকারদের হুঁশিয়ার করে বেনামে উড়া চিঠি দিয়েছেন। লিফলেট বিলি করেছেন। মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা তার কাছে হাতচিঠি পাঠাত, ‘খাল্লামা, সামনে শীত। আমাদের পঞ্চাশটা পুলওভার পাঠাবেন কালো রঙের।’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি গেরিলা যুদ্ধের উপযোগী সোয়েটার বুনতে বসে গেলেন। যুদ্ধের দিন, বাড়িতে কখন মিলিটারি আসে, কাকে ধরে নিয়ে যায়, মেরে ফেলে–তার ভেতর ডজন খানেক সোয়েটার বুনলেনও, যার একটিও পরে কাজে লাগেনি। কারণ শীতের শুরুতেই হঠাৎ করে যুদ্ধটা শেষ হয়ে গিয়েছিল।
এই মুক্তিবাহিনীর ছেলেরাই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কোথায় কোন বাংকারে, আর্মির প্রমোদখানায়, গুদামঘরে মেয়েরা আটকা পড়ে আছে, সেসব খবর আনতে শুরু করে। মেয়েগুলো রুগ্ণ, অসহায়। তাদের তুলে আনার জন্য গাড়ি, রাখার জন্য বাড়ি, চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল দরকার। একে একে সবকিছুরই ব্যবস্থা হলো। তবে কে কোনটা করছে, আরেকজন সঠিকভাবে জানছে না। ‘আসলে কাজগুলো তখন হাতে হাতে হচ্ছিল,’ আরেকজন সমাজকর্মী মুক্তিকে বলেন। ‘আমাদের দিয়েই হচ্ছিল। অথচ আমরা জানছি না–কে কোনটা করছি।’ আর তাই যুদ্ধের আটাশ বছর পর, মুক্তি কয়েকজন সমাজকর্মীর সাক্ষাৎকার কাট অ্যান্ড পেস্ট করেও ‘বীরাঙ্গনা অফিস’ নামে। একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায় দাঁড় করাতে পারল না। মেয়েদের উদ্ধার করা থেকে শুরু করে পুনর্বাসনের দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি কয়েকজন মানুষের সাক্ষাৎকার, পেপার কাটিং আর দু চারটা ছেঁড়া ছেঁড়া ঘটনায় আটকে থাকল।
গর্ভপাতের আগ পর্যন্ত মরিয়ম নিজেকে নিজের হাতে রাখে। এরপর আর সম্ভব হয় না। কারণ বিষয়টা ক্লিনিক্যাল। তত দিনে বিদেশি ডাক্তার, নার্স আর স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা পৌঁছে কাজ শুরু করে দিয়েছে। ধানমন্ডির তিন নম্বর রোডের একটি সাদা বাড়ি, যা তখন বীরাঙ্গনা অফিস নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে, সেখানে তখন দিনে গড়পড়তা একশ জনের গর্ভপাত, প্রসব করানো আর আনুষঙ্গিক চিকিৎসা চলছে। হাসপাতাল শেষে সুস্থ মেয়েদের গন্তব্য দুটি। হয় তারা নিজেদের আগের ঠিকানায় ফিরে যাবে, না-হয় নিউ ইস্কাটন রোডে আশ্রয় নেবে। সেখানে মুখোমুখি দুটি বাড়ির একটিতে ছিল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, অন্যটি হোস্টেল। হোস্টেলে সেসব মেয়েই ছিল, যাদের বাড়িঘরের ঠিকানা তখনো পাওয়া যায়নি। বা পেলেও বাবা এসে হয়তো। বললেন, ‘মা পরে এসে নিয়ে যাব। আর দুইডা দিন কষ্ট করে থাক।’ তারপর বাবা ভাই কেউ আর নিতে আসেনি। পরের দিকে হোস্টেলটা শুধু বীরাঙ্গনা নয়, দুস্থ নারী আর এতিম শিশুদেরও আশ্রয়স্থল হয়। ‘যারা খাইতে দিতে পারত না, যাগো অনেক পোলাপাইন হইত, তারা রাইতের আন্ধারে পুনর্বাসনকেন্দ্রে বাচ্চা ফালাই দিয়া যাইত।’ কথাগুলো বলে সে সময়কার পুনর্বাসনকেন্দ্রের বাসিন্দা, বর্তমানে বাংলা ছায়াছবির সাইড একট্রেস বকুল বেগম। সে ’৭২ থেকে ’৭৪-এ দুই বছর আশ্রয়কেন্দ্রে পালাক্রমে এক সপ্তাহ রান্না করেছে, আরেক সপ্তাহ এতিম বাচ্চাদের গোসল দিয়েছে। বকুলের কাহিনি মুক্তি পরে শুনবে। সে এফডিসির সমান পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পরপর দু’দিন তার সাক্ষাৎকার দেয়। এই দু’দিনের পারিশ্রমিক ছিল মাত্র পঞ্চাশ পঞ্চাশ একশ টাকা।
