স্কুলঘরের চারদিক থেকে কৌতূহলী মানুষ উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। গেটে সশস্ত্র সান্ত্রি। মুক্তিবাহিনীর কয়েকটা ছেলে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। ছেলেছোকরাদের জানালা থেকে নামানো হয় তো তারা বাউন্ডারি ওয়ালের ওপর চড়ে বসে। বা বানরের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে গাছের মগডালে উঠে যায়। ইতিমধ্যে গাছ থেকে পড়ে দুটি ছেলের পা ভেঙেছে। সব শুনে একজন চেনা মুক্তিযোদ্ধা আতা মিয়াদের নির্ধারিত কক্ষে নিয়ে আসে। তারপর মুক্তিযোদ্ধার কথামতো বুলির নাম, তার আব্বার নাম বলে স্কুলের রোল-কল করার মতো তারা দুজন চারবার ডাক ছাড়ে। কিন্তু মুখঢাকা মেয়েগুলো সাড়া দেয় না। একজন শুধু শেষবার ডাকার সময় শীর্ণ একটা হাত বের করে পিঠ চুলকায়। আতা মিয়া তাকে বুলি মনে করে এগিয়ে যেতে চাইলে তাকে হাত তুলে বাধা দেয় মুক্তিযোদ্ধা ছেলেটি। মুখে বলে, ‘আপনি যা ভাবিছেন তা না, গর্তে থাকি থাকি ওদের গায়ে উকুন পড়ে গেছে। হাত দিয়ে চুলকোচ্ছে তাই।’ তারপর রাইফেলের বাঁট নিয়ে নিজের গা চুলকাতে চুলকাতে মুক্তিযোদ্ধা ছেলেটি হাসপাতালের বেড খালি হওয়ামাত্র তাদের ওখানে স্থানান্তর করা হবে বলে জানায়। কিন্তু আতা মিয়ার সন্দেহ দূর হয় না। সবার গায়ে গুঁড়ি গুঁড়ি উকুন থাকলে, তাদের একজন খালি পিঠ চুলকাবে কেন, যখন সে বুলির নাম ধরে ডাকছিল! ‘কিন্তু সবকিছুর একটা নিয়ম আছে,’ চেনা মুক্তিযোদ্ধা বলে। ‘কেউ নিজের মুখ দেখাতে না চাইলে আপনি জোর করে দেখতে পারেন না।’ এ ছাড়া আতা মিয়া নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা। সর্বাগ্রে তারই তো নিয়ম মানা উচিত।
এরপর তারা হাসপাতালের দিকে হাঁটতে শুরু করে। যদিও বেড খালি না হলে মেয়েগুলোকে ওখানে স্থানান্তর করা হবে না। আইয়ুব স্কুল আর সদর হাসপাতালের মধ্যিখানে টাউন হল ময়দান। ওখানে তখন এ অঞ্চলের যুদ্ধবন্দিদের নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া চলছে। জায়গাটা ঘিরে রেখেছে মিত্রবাহিনী। পাবলিক মাঠের বাইরে থেকে শ্লোগান দিচ্ছে, ‘একটা একটা সৈন্য ধরো, সকাল-বিকাল নাস্তা করো। বিচার চাই বিচার চাই, ইয়াহিয়ার বিচার চাই। বিচার চাই বিচার চাই, নরহত্যার বিচার চাই। ইয়াহিয়া-ভুট্টো, কুত্তার বাচ্চা কুত্তো।’ সেখানে আতা মিয়ার সহযোদ্ধারা মহা ব্যস্ত। তারা কোনো-না-কোনোভাবে নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় জড়িত হয়ে গেছে, যা বুলিকে খোঁজার চেয়ে উঁচুদরের কাজ। আতা মিয়াও তাতে শরিক হয়। এই ফাঁকে আমজাদ হোসেন তার কাছ-ছাড়া হয়ে গেলে, দুই রাত দুই দিন পর টাউন হল ময়দানের সামনে বুলিকে খোঁজাখুঁজির ইতি ঘটে।
মেয়েটা মরে গেল না বেঁচে রইল–আতা মিয়া একজন মুক্তিযোদ্ধা, পথে পথে ঘুরেও এর সুরাহা করতে পারল না, ফুপুকে মুখ দেখাবে কেমন করে! পরদিন কাউকে কিছু না বলে সে শহর ছেড়ে চলে আসে। যায় কমলগঞ্জ। মর্জিনা বিবির তখনো ইদ্দতকাল চলছে। এ অবস্থায় শাদি নাজায়েজ। তখন সবে দেশ স্বাধীন হয়েছে। আইনকানুন ঢিলেঢালা। রাজাকারি করুক চাই না-করুক গাঁয়ের মোল্লা-মৌলবিরা পলাতক। তাই তাদের শাদিটাও নিয়ম ভঙ্গ করে হয়ে যায় নির্বিঘ্নে।
ঢাকার স্টেডিয়ামে অস্ত্র জমা দিয়ে সরকারি কম্বল হাতে আতা মিয়া এ গাঁয়েই ফেরে। এখানে বৃদ্ধ আছেন কারবালার পুঁথি নিয়ে, আতা মিয়া আছে মর্জিনা বিবি, তাদের ছেলেমেয়ে আর গার্লস স্কুলের দফতরির চাকরিটা নিয়ে। এখনো আতা মিয়া ভুলতে পারে না শীর্ণ হাতের মেয়েটির কথা, যে তার ডাক শুনে পিঠ চুলকাচ্ছিল অথচ মুখ দেখাতে চায়নি। কিন্তু সে বুলি হয়ে থাকলে এত দিনে কি বাড়ি ফিরত না?
বেঁচে থাকলেই সবাই বাড়ি ফিরেছে–তা কিন্তু নয়। আতা মিয়া টাউন হল ময়দানে যুদ্ধবন্দিদের নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় যখন উঁচুদরের ভূমিকা রাখছিল, তখন কাছের সদর হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডে কিছু মেয়ে জড়ো হয়। তারা কেউই উদ্ধারকারীদের নিজের বাড়ির ঠিকানা দেয়নি। পরদিন ঢাকাগামী ভারতীয় মিলিটারি কনভয়ের যাত্রী ছিল ওরা। সঙ্গে যুদ্ধবন্দি পাকসেনারাও ছিল। মেজর ইশতিয়াকের কপালে, হাতে কমলগঞ্জের গণপ্রতিরোধের ফলক–দগদগে কাটা ঘা। উন্মুক্ত, ব্যান্ডেজহীন। ফেরি-পারাপারের সময় পদ্মার উত্তাল তরঙ্গের দিকে তাকিয়ে মেজর আহত হাত তুলে আনমনে একটা মাছি তাড়ায়। তা দেখে ফেরির পানিবিক্রেতা ছেলেটি ভাবে, খুনি লোকটা বুঝি তাকে সালাম দিচ্ছে। সে সালামের প্রতি-উত্তরে মেজরকে গাল দেয়, ‘শালা বাইনচোত!’ কেউ কিছু বলছে না যখন, ছেলেটি বীরত্ব দেখাতে তার বাদামবিক্রেতা বন্ধুকে ডেকে আনে। এবার তাদের টার্গেট হয় মরিয়ম আর সঙ্গের মেয়েরা, যারা কেউই উদ্ধারকারীদের বাড়ির ঠিকানা দেয়নি। বাদামবিক্রেতা পানিঅলাকে বলে, ‘এই দ্যাখ দ্যাখ, মাইয়্যা গুলান মিলিটারির লগ লইছে। খানকি মাগিরা যায় কই?’
মরিয়মের মাথার ভেতর মেজর ইশতিয়াকের তাড়িয়ে দেওয়া মাছিটা ভনভন করে উড়তে থাকে। তাদের ঘিরে রেখেছে বাচ্চা বাচ্চা ফেরিঅলারা। স্বাধীন দেশে এ কেমন সংবর্ধনা! ভারতীয় সৈন্যরা এর মর্মার্থ না বুঝেই হাসছে আর যারা হাত বাড়াচ্ছে। তাদের সঙ্গে ঝুঁকে ঝুঁকে হ্যান্ডশেক করছে।
ভারতীয় মিলিটারি কনভয় ফেরি ছেড়ে নদীর ঢাল বেয়ে তীরে উঠলে মরিয়ম মনে মনে পদ্মাকে বিদায় জানায়। গোধূলির রক্ত বর্ণের আকাশকে নিঃশব্দে বলে, অন্য দেশের সন্ধ্যা কী রকম, আমি জানি না। কিন্তু নিজের দেশ আমাকে কী দিল। বাইশ বছর কি অনেক সময়? জীবন তার চেয়েও দীর্ঘ।
১৭. বীরাঙ্গনা অফিস
‘আপনার কাছে বীরাঙ্গনাদের কোনো ছবি নাই?’ ঢাকার এক প্রাক্তন সমাজকর্মীর ড্রয়িংরুমে বসে সাক্ষাৎকার নিচ্ছিল মুক্তি। সামনের দেয়ালে মাদার তেরেসা, সরোজিনী নাইডু, অরুণা আসফ আলী, মাদাম টিটোসহ নাম-না-জানা বিদেশিনিদের সঙ্গে গৃহকত্রীর স্বাধীনতা-উত্তরকালের কয়েকটি ফ্রেমে বাঁধানো গ্রুপ ছবি, যা একই সঙ্গে তার যৌবনকাল এবং সমাজসেবার মূল্যবান স্মারক। মরিয়ম ফটোগ্রাফে কি রক্তমাংসের শরীরে তখনো ধরা দেয়নি। বীরাঙ্গনা বলতে মুক্তি শুধু দেখেছে কিশোর পারেখের একটি সাদা-কালো আলোকচিত্র। তাতে দুজন অনামা নারীর একজন লম্বা ঘোমটায় মুখ ঢেকে রেখেছে, আরেকজনের মুখের এক পাশ ভোলা। তার আধখানা কপাল ঘিরে ছোট ছোট চুল। মুখটা শীর্ণ। সমাজকর্মী বললেন, ‘মেয়েদের ছবি পাবে কোথায় তুমি। সামনে ক্যামেরা দেখলেই ওরা লজ্জায় না ঘেন্নায় লম্বা ঘোমটার নিচে মুখ লুকাতো।’
