পরদিন সন্ধ্যায় আতা মিয়া নিজেকে আবিষ্কার করে শহরের তস্যগলির শেষ মাথায় জোড়া তালগাছের পেছনে টিনের চাল আর বাঁশের বেড়ার একটা শোকার্ত বাড়ির সামনে। তালগাছ দুটি মোটা আর লম্বা হওয়া ছাড়া বহির্বাড়ির কোনো পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু অন্দরমহলের চেহারা করুণ। ফুপুর মোটাকাটা শরীরটা শুকিয়ে চেরা তক্তার মতো পাতলা হয়ে গেছে। একসময়ের তেল জবজবে কালো চুল এখন রুক্ষ আর সাদা। সুখী গৃহিণীর খোঁপা ভেঙে তা পিঠের ওপর লুটাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা ভাইপোকে দেখে ফুপু হাউমাউ করে কেঁদে উঠে কী বলেন স্পষ্ট বোঝা যায় না। ফুপাজানের শহিদ হওয়ার খবর আতা মিয়া ফুপাতো বোন দুলির কাছ থেকে তখন। শোনে। কোনো অপরাধ ছাড়াই মিলিটারিরা তালগাছের গোড়ায় তাকে গুলি করে। দুই দিন দুই রাত লাশটা জোড়া তালগাছের চিপায় পড়ে ছিল। মুসলমান মুসলমানের কবর দেবে, ফরজ কাজ, তবু ভয়ে কেউ এগিয়ে আসে না। কুকুর আর কাকের উপদ্রপে যখন পাড়ার লোকজন অস্থির, দুর্গন্ধে টেকা দায়, তখন দুলির স্বামী আমজাদ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লাশের পাশেই গর্ত খোঁড়ে। দুলি পচাগলা বাপজানের শরীরটা কবরে নামাতে হাত লাগায়। তারপর কচি ঘাস-দুব্বো দিয়ে কবরটা ঢেকে দেয় রাতারাতি। মাত্র দুই মাসের পুরোনো কবর, আতা মিয়া তাই জোড়া তালগাছ পার হওয়ার সময় প্রথম দর্শনে তা শনাক্ত করতে পারেনি। কবর জিয়ারত করার সময়ও তার মনে হচ্ছিল, ফুপাজান আবদুল করিম-চল্লিশ বছর যিনি কোর্টের পেশকার ছিলেন, তিনি এখানে শায়িত আছেন তো, নাকি সে জ্যান্ত তালগাছ দুটির রুহের মাগফেরাত কামনা করছে!
‘তোর ফুপারে নিয়ে যে শোক করব, তা আমার নসিবে ছিল না রে, বাপ। তিরিশ বচ্ছর একসঙ্গে ঘর করলাম, এক চালের নিচে থাকলাম, মানুষটা চোখের সামনে গুলি খেয়ে ঘাপাতে ঘাপাতে মরি গেল, এক ফোঁটা চক্ষের পানি ফেলতি সময় পালাম না আমি! আমার বিপদের কোনো শেষ আছে?’
কথা বলতে বলতে ফুপু হঠাৎ থেমে যান। দুলি, আমজাদ আমতা আমতা করে। আতা মিয়ার টনক নড়ে, ‘বুলি কনে ফুপু আম্মা? ওরে যে দেখতে পাচ্ছিনে!’ বাড়ির চার-পাঁচ বছরের মেয়েটি এতক্ষণ হাঁ করে স্টেনগান দেখছিল, এই প্রথম তার কথা বলার সুযোগ আসে। সে স্টেনগানের ফিতা ধরে টান দেয়, ‘বুলি খালারে মিলিটারি ধরে নে গেছে, মামা।’ সঙ্গে সঙ্গে ফুপু ডুকরে কেঁদে ওঠেন, আর দুলির মেয়েটা আগ বাড়িয়ে কথা বলার জন্য মায়ের হাতে দুমদুম কিল খায়।
স্বাধীন বাংলাদেশের কোথাও কি এক ফোঁটা শান্তি নেই? কুত্তার বাচ্চারা কী করে থুয়ে গেছে দেশটার? আতা মিয়ার আর সহ্য হয় না। সে বাইরের দিকে পা বাড়াতে ফুপু খপ করে তার স্টেনগানের ফিতা ধরে ফেলেন, ‘বাজান কনে যাচ্ছিস। যাওয়ার আগে তোর ফুপুরে মাইরে থুয়ে যা।’ এখন ঠ্যালা সামলাও! পেছনে কুপির সলতেটা ফুপুর আহাজারিতে কেঁপে কেঁপে উঠছে। আতা মিয়া নিষ্কম্প। স্থির দাঁড়িয়ে ভুতুড়ে তালগাছ দুটির দিকে তাকিয়ে সে ভাবে, যুদ্ধের পরও যে আরেক যুদ্ধ, এর জোয়াল বয়ে বেড়ানোর দায় আছে কি না একজন মুক্তিযোদ্ধার। কমলগঞ্জের মর্জিনা বিবিকে সে চিনে না, দেখেওনি কোনোদিন অথচ মা মদিনা উঠোনে লাশ রেখে তার হাতে মেয়েকে সঁপে দিতে চাইলেন। তার একটা মন পড়ে আছে ওখানে। এদিকে ফুপুও তার পর নয়। দুই মাস আগে ফুপাজানকে মেরে ফুপাতো বোন বুলিকে ধরে নিয়ে গেছে মিলিটারিরা। এই বুলির সঙ্গেই একবার আতা মিয়ার বিয়ের কথা হয়েছিল। পাত্রের পড়ালেখা কম থাকায় প্রস্তাবটা টেকেনি। মানুষের জীবনে কখন যে কী হয়! এলাকা শত্রুমুক্ত হয়েছে তো চার দিন। আমজাদ হোসেন এ কয় দিন শালির জন্য কী করেছে? নাকি শ্বশুরের লাশ মাটি চাপা দিয়েই তার দায়িত্ব শেষ?
এবার তার প্রশ্নের জবাব দেয় বুলির বড় বোন দুলি। মুন্নির আব্বা একা মানুষ, কী করবে। তুমি যখন আসি পড়িছো একটুখানি দেখো দিনি ঘটনাটা কী!’ ফুপু মেয়ের চেয়ে এককাঠি বাড়া। তিনি ভাইপোকে জড়িয়ে ধরে বলেন, দেশ স্বাধীন হইয়ে গেল রে বাপ, আমার মেয়ে কই? তোরা তারে এনে দে। বুকের আগুন আমি পানি ঢালি নিবাই।’ দুই মাস বুকে পাষাণ বেঁধে পড়ে থাকলেও ফুপুর আর একমুহূর্তও তর সইছে না, তিনি নিজের বুকে দুমদুম কিল বসাচ্ছেন। এদিকে আমজাদ হোসেন সোয়েটার গায় দিয়ে রেডি, শালিকে সে মুক্তিযোদ্ধা আতা মিয়ার সঙ্গে খুঁজতে যাবে।
সব শুনে শাহজাহান সিদ্দিক চার-পাঁচ জায়গার নাম দিয়ে বলে, ‘এখন কি আর খুঁজে পাবি? বেঁচে থাকলি তো এদ্দিনে নিজবাড়িই ফিরত। তবে এমনও হতি পারে লজ্জায় সে মুখ দেখাতি পারছে না। দ্যাখ তবে চেষ্টা করে।’
শাহজাহান সিদ্দিকের সঙ্গে কথা বলে আতা মিয়া আর আমজাদ হোসেন সোজা নদীর পাড়ের ভাগাড়ে চলে যায়। পরে ভাগাড়টার নাম হয় কালীতলা বধ্যভূমি। তারা প্রথম সেখানে যায়, কারণ জায়গাটা কাছে আর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা যেহেতু বুলির কম-শাহজাহান সিদ্দিক বলে দিয়েছে। সেখানে তখন শয়ে শয়ে কেরোসিনের লম্প। মানুষ আপনজনের লাশ খুঁজতে বেরিয়েছে হারিকেন দিয়ে। কত দিনের পচাগলা লাশ, বেশির ভাগই কঙ্কাল। কার লাশ কে নিয়ে যাচ্ছে। আতা মিয়াদের সঙ্গে হারিকেনও নেই। তারা ভাগাড় থেকে চলে যায় উপশহর, যেখানে বিহারিদের আবাস। বিহারিরা পাকবাহিনীর যোগসাজশে নয় মাস বাঙালি কেটে কেটে ম্যানহোল ভরেছে। এবার পাল্টাপাল্টির সময়। সেই রাতে ম্যানহোলের ঢাকনা তুলে পচাগলা যে কটা বাঙালির লাশ তোলা সম্ভব হয়, সেই খালি জায়গায় কেটে কেটে ফেলতে থাকে বিহারির লাশ। এই চলে পরদিন ভোর পর্যন্ত। সকালের দিকে সেই যে শাহজাহান সিদ্দিক বলেছিল ‘এমনও হতি পারে সে লজ্জায় বাড়ি যাতি পারছে না’ কথাটা মনে পড়তে আতা মিয়া আর আমজাদ হোসেন নয়াবাজারের বাংকারের দিকে ছোটে। সঙ্গে নেয় বুলির লজ্জা নিবারণের জন্য একখানা নাইলনের শাড়ি, যা কাঁধের স্টেনগান দেখিয়ে আতা মিয়া চকবাজারের এক আড়তদারের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে। শাড়িটা সঙ্গে নিয়ে লাভ হয়নি। বাংকারে সেদিন কাউকেই ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। পাকবাহিনীর মাইনে পড়ে এক মুক্তিযোদ্ধার হাত-পা উড়ে গেছে। তাকে নিয়ে যমে-মানুষে টানাটানি। দ্বিতীয় দিনে মিত্রবাহিনীর সার্চ করা নয়াবাজারের বাংকারে তারা কোনোরকমে প্রবেশ করে। সেখানে হাতের চুড়ি, শাড়ি, লম্বা চুলের গোছা সব আছে, মানুষ নেই। তারপর তারা যায় আইয়ুব স্কুলে, পরে যার নাম হয় এ কে ফজলুল হক স্কুল। স্কুলে গিয়ে দেখে টুল-বেঞ্চি-ব্ল্যাকবোর্ডহীন একটা ক্লাসরুমে কয়েকটা মেয়ে মুখ ঢেকে নতুন বউয়ের মতো বসে রয়েছে।
