হাসপাতালের অবস্থা করুণ। সেখানে কোনো ডাক্তার নেই। সিভিল সার্জন যে, সে অবাঙালি, চিকিৎসা করবে কী, নিজেই প্রাণের ভয়ে পালিয়েছে। নার্সরা ছোটাছুটি করে কোনোরকমে কাজ চালাচ্ছিল। ‘তখন তো হাসপাতালে দুইশ-আড়াইশ বেড ছিল না, ডাক্তারও কম।’ আতা মিয়া মুক্তিকে বলে, ‘ধরেন আজকে যেমন নাকের ডাক্তার হয়েছে, কানের ডাক্তার হয়েছে–একটা হসপিটালে বিশ রকমের ডাক্তার, তখন তো এসব ছিল না! তা-ও সদর হসপিটালে যে কজন ছিল–পলাইছে।’
এদিকে রণাঙ্গন থেকে আহতদের এনে তোলা হচ্ছে সদর হাসপাতালে। মুক্তিযোদ্ধারা কোত্থেকে এক ডাক্তার ধরে আনে। একা কী করবে সে। যার পেটে গুলি ঢুকে আছে, তার তো জরুরি অপারেশন দরকার, অথচ তাকে ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়ানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পানি নেই, বাতি নেই। রাতে আবার বিমান হামলার আশঙ্কায় শহর নিষ্প্রদীপ। আতা মিয়া রোগী দেখতে এসে ফেঁসে যায়। পাড়াতুতো ভাই যুদ্ধ থেকে ফিরেছে, তার বিশ্রাম দরকার, কোন ফাঁকে সে সরে পড়েছে। আতা মিয়ারও কেটে পড়ি পড়ি ভাব। হঠাৎ ঠা-ঠা করে গুলি ফাটল। বোঝা যাচ্ছে ব্ল্যাংক ফায়ার-পাকসেনারা আবার ফিরে আসলো নাকি! আতা মিয়া তখনো জানে না যে, তা বিজয়োৎসবের। সে অন্ধকার হাসপাতালের করিডোরে নেমে আসে। গুলির আওয়াজেই সম্ভবত, করিডোরের রোগীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। যারা চলতে-ফিরতে সক্ষম তারা বাইরে বেরিয়ে আসে। উল্টো দিক থেকে হনহন করে হেঁটে আসে জোর করে ধরে আনা সেই ডাক্তার। এসেই মাথায় আর হাতে ব্যান্ডেজ বাধা সামনের। রোগীটাকে বুকে জড়িয়ে একটানে মাথার ওপর তুলে ফেলে। তাকে নামিয়ে আরেকজনকে। এভাবে পাঁচজনের সময় ডাক্তার আর লোকটিকে মাথায় তোলে না। শূন্য থেকে ছেড়ে দিয়ে আতা মিয়াকে স্টেনগানসহ জাপটে ধরে, ‘মুক্তিযোদ্ধা ভাই, দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। আমরা স্বাধীন। স্বাধীন দেশের নাগরিক।’
ডাক্তারের চিৎকার করিডোর ছেড়ে পুরুষের ওয়ার্ড পেরিয়ে বন্ধ দরজার ওপাশে। মহিলা ওয়ার্ডের একমাত্র রোগী মরিয়মের কানে পৌঁছায়। এতে তার কোনো ভাবান্তর। হয় না। ইস্পাহানি স্কুল থেকে গতকাল তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। আগের। দু’দিন মরিয়মের অবস্থা ছিল চিড়িয়াখানার জন্তুর মতো। দলে দলে লোক দেখতে। আসছিল। অন্য মেয়েরা কে কোন দিকে চলে গেছে। সে একা। খাওয়া না, নাওয়া না, মানুষের ঠাট্টা-মশকরা শুনে শুনে সে আরো অসুস্থ হয়ে পড়ে। বমি কিছুতেই বন্ধ। হচ্ছিল না। হাসপাতালে আনার পর একজন নার্স যত্ন করে গোসল করিয়ে তাকে বমির ওষুধ খাইয়ে দেয়। সেই থেকে সে ঘুমাচ্ছে।
সেদিন বিকেলে জেনারেল নিয়াজি যখন আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করছিলেন, মরিয়ম তখন ওষুধের ঘোরে প্রবেশ করে সেখানে, যেখানে শালিমার বাগ আছে আর শহরটার নাম হচ্ছে লাহোর। সে লাহোরের সবুজ ঘাসের গালিচার ওপর দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে যায়, ফোয়ারার ধারে চকিতে দাঁড়ায়, সারি সারি ঝাউবীথির মনোরম শোভা উপভোগ করে। কিন্তু টাইট কামিজ আর চুড়িদার পরা, গলায় দোপাট্টা প্যাঁচানো কোনো নারীকে সেখানে দেখতে পায় না। দৃশ্যটা তাকে স্বস্তি দেয় এবং ভবিষ্যতের জন্য একটা দরজা খোলা রেখে সে ফের ঘুমিয়ে পড়ে।
আতা মিয়া ডাক্তারের বাহুবন্ধন থেকে ছাড়া পেয়ে দৌড়ে বেরিয়ে যায়। সে এখন বিজয়োৎসব করুক চাই না করুক, তার জন্য হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়াটা জরুরি। বাইরের অবস্থা তখন আরো হতাশাজনক। দিনের বেলা লুটপাট, পাকহানাদের ব্ল্যাংক ফায়ার–সব মিলিয়ে পরিস্থিতি খুব প্রাণবন্ত ছিল। এখন একে মনে হচ্ছে একটা মরা শহর। পথচারী বলতে একা আতা মিয়া। হাঁটতে হাঁটতে সে টাউন হলের সামনে আসে। ওখানে কয়েকটা খাবার হোটেল। মিষ্টির একটি মাত্র দোকানে ভিড় লেগে আছে মানুষের। দোকানের সামনে শান্তিপূর্ণভাবে বিজয়োৎসব করার জন্য একজন রিকশায় বসে মাইকিং করছিল। উৎসবই বলে হচ্ছে না, তার আবার শান্তি-অশান্তি! একটুখানি উৎসব করার জন্য আতা মিয়ার মনটা ছটফট করে। এর আগে দু-চারটা মিষ্টি খাওয়া দরকার। পকেটে পয়সা নেই তো কী, কাঁধের স্টেনগানই যথেষ্ট। আতা মিয়া মুক্তিকে কৈফিয়ত দিয়ে বলে, ‘ওইসব দিনে মুক্তিবাহিনীরে মানুষ ফিরিই খাওয়াইছে। টেনে টেনে বাড়ি নিয়ে বিছনা পাইতে বলেছে–ভাইজান ঘুমাই পড়েন।’ তবে আতা মিয়ার সেদিন মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা পূরণ হয় না। দোকানে পৌঁছানোর আগেই কাঁচের আলমারির তাক সব ফাঁকা। দোকানদার হাত কচলায়, ‘স্যার, ময়দা আছে, দুইডা পরোডা বানাই দিই?’ পরোটা ভাজার আগেই মাইকিং বাদ দিয়ে ফ্রিডম ফাইটার শাহজাহান সিদ্দিক রিকশা থেকে নেমে আসে। কত দিন পর দেখা, মুখভর্তি দাড়ি-গোঁফ, প্রথম একজন আরেকজনকে চিনতে পারেনি। কোলাকুলির পর বলে যে, ‘দোস্ত উপশহরে গন্ডগোল শুরু হয়ে গেছে। এখন পরোটা খাওয়ার সময় নয়। পরে তোরে আমি গোশত-ভাত খাওয়াব-চল।
উপশহরে বাস করে বিহারিরা। আতা মিয়া আর শাহজাহান সিদ্দিক ওখানে মাইকে স্লোগান দেয়, ‘বাঙালি-বিহারি ভাই ভাই/এক থালাতে ভাত খাই। তুমি কে আমি কে/ স্বাধীন বাংলার নাগরিক।’ তাদের স্লোগান, অভয়বাণী বিহারিরা শুনছে বলে মনে হয় না, শুনলেও বুঝতে পারছে বলে মনে হয় না। তাদের দরকার নিরাপদ আশ্রয়। এদিকে রাত গম্ভীর হচ্ছে। তারা যখন শাহজাহান সিদ্দিকের ডেরায় ফিরে আসে, ততক্ষণে মুক্তিযোদ্ধাদের হাট বসে গেছে ওখানে। কে কার চেনা বা অচেনা, কে বড়লোক বা ঘোটলোক এসব নিয়ে চিন্তাভাবনার আপাতত দরকার নেই। সবাই বীর মুক্তিযোদ্ধা, সকলের সমবেত প্রচেষ্টায় দেশ স্বাধীন হয়েছে। তাদের কথারও শেষ নেই। বীরত্বের কথা, দুঃখের কথা, কষ্টের কথা, আনন্দের কথা বলতে বলতে রাত কাবার। মাঝখানে দু’দুবার পাশের হোটেল মাংস-ভাত সরবরাহ করে। তারা যখন ঘুমাতে যায়, স্বাধীন দেশের প্রথম সূর্যকিরণ ততক্ষণে হামাগুড়ি দিয়ে তাদের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েছে।
