পরদিন কয়েকটা বাসি ও টাটকা খবর উড়তে উড়তে আসে–
মাটি-ল্যাপা, ডালপাতায় সাজানো কয়েকটা মাইক্রোবাস কারফিউর ভেতর ঢাকার অলিগলি চষে ফেলছে। আলবদর বাহিনী খুব তৎপর। তারা দেশের বাছা বাছা সন্তানদের চোখ বেঁধে মাইক্রোতে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘এন্টারপ্রাইজ’ ভিয়েতনাম ছেড়ে এখন ভারত মহাসাগরে।
ভারতীয় বিমানবাহিনীর আক্রমণের ফলে গভর্নর হাউসে আগুন ধরে যায়। আক্রমণকারীরা নিশানা ঠিক করেছিল ঢাকার টুরিস্ট গাইড দেখে। তাতে ভয় পেয়ে গভর্নর স্বয়ং ইস্তফা দিয়েছেন। তিনি বর্তমানে দলবলসহ আন্তর্জাতিক জোন, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থান করছেন।
মিত্রবাহিনী ঢাকার উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে। ভৈরব হয়ে তাদের একদল এখন ডেমরায়। আরেক দল মানিকগঞ্জ রোড ধরে এগিয়ে মিরপুর ব্রিজের কাছাকাছি অবস্থান। নিয়েছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে টাঙ্গাইলে অবতরণকারী একদল ছত্রীসেনা। বিদেশি সূত্রমতে ছত্রীর সংখ্যা ৫০০০।
তখন একটি ভূগর্ভস্থ কক্ষের দেয়াল বেয়ে একটা বিষধর কেউটে মানচিত্রে উঠে গেল। তারপর কুণ্ডলী পাকিয়ে ফণা তুলল ঢাকার ওপর। জেনারেল ব্যাঘ্র ভয়ে গর্জন করলেন, কিন্তু তার মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরোল না। তার কানের পাশে মাছির মতো ভনভন করে উড়ছে একটি প্রলোভনসারেন্ডার সারেন্ডার, একটি জরুরি ঘোষণা। তিনি মাছিটিকে না তাড়িয়ে উড়তে দিলেন।
ঠিক সেসময় জে এ ভুট্টো জাতিসংঘের বর্ধিত সভায় আমরা যুদ্ধ করব, হাজার বছর ধরে যুদ্ধ করব’ বলে চেঁচাচ্ছিলেন। তারপর হলিউডি কায়দায় যে কাগজটি না পড়েই তিনি ছিঁড়ে ফেললেন, আশ্চর্য হলেও সত্য যে, তা ছিল যুদ্ধবিরতির সোভিয়েত লবির দেশ পোল্যান্ডের পক্ষ থেকে।
জেনারেল ব্যাঘ্র দেয়াল থেকে মানচিত্র নামানোর আদেশ দিয়ে সাজঘরে ঢুকলেন। সাজটা যুদ্ধের নয়–আত্মসমর্পণের।
.
আতা মিয়া কমান্ডারের কাছে গিয়ে মিথ্যা করে বলে, ‘মনটা জানি কেমুন করতে লাগিছে, ভাইজান। আমারে দুই দিন ছুটি দেন। আমি বাড়ি যাইয়্যাম।’ এরকম একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যে-কোনো সময় ঢাকা থেকে পাকবাহিনীর সারেন্ডারের খবর আসতে পারে, সারা বছর যুদ্ধ করে কে চায় এ দৃশ্য দেখা থেকে বঞ্চিত হতে! প্রস্তাবটা পাগলামির পর্যায়ের হলেও ভাইজান সানন্দে ছুটি মঞ্জুর করেন। রাস্তার চৌমাথায় এসে আতা মিয়া টানাটানিতে পড়ে যায়-তার সামনে চারদিকে চারটা রাস্তা। একটা গেছে মর্জিনাদের বাড়ির দিকে। দিনের আলোয় তার মনে হয়, শোকের বাড়িতে এভাবে যাওয়া ভালো দেখায় না। চার দিনের খতম পড়ানো হয়ে গেলে যাওয়া যাবে বরং। তার পরের রাস্তা গেছে ঢাকা। ঢাকা বহু দূর। তৃতীয়টা ধরলে দুই ক্রোশ পর যদিও তার নিজের বাড়ি, বাড়িতে আছেন বৃদ্ধ বাপজান আর তার পরের সংসারের স্ত্রী-পুত্র পরিজন, বেকার ছেলে যুদ্ধে যাওয়াতে একজনের খোরাকি বেঁচে গিয়েছিল, এখন স্টেনগান কাঁধে আতা মিয়া বাপজানের সামনে খালি হাতে দাঁড়াতে চায় না। চতুর্থ রাস্তায় গেলে পথে পড়ে যে জেলা শহর, সেখানে থাকেন তার মাতৃতুল্য ফুপু, তাকে পুত্রস্নেহে লালন করে যিনি নিজের গর্ভজাত পুত্রসন্তানের অভাব পূরণ করেছিলেন। শহরটা স্বাধীন হয়েছে আজ তিন দিন। আতা মিয়া আর যুদ্ধ করতে চায় না ঠিকই, তবে স্বচক্ষে বিজয় দেখা থেকে বঞ্চিত হবে, সেটাও তার ইচ্ছে নয়। সহিসালামতে শহরটায় পৌঁছাতে পারলে সাপও মারা পড়বে, হাতের লাঠিও ভাঙবে না।
১৬. বুলি আজও তোরে ভুলি নাই
আতা মিয়া উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে যখন শহরে ঢোকে, তখন দক্ষিণ সীমানা থেকে ৭/৮ মাইল দূরে পাকবাহিনী-যৌথবাহিনীর তুমুল লড়াই চলছে। পথেই পাড়াতুতো এক মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। ছেলেটা অস্ত্র খুইয়ে কোনোরকমে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে এসেছে। উদ্ভ্রান্ত চেহারা। দুই দিন তিন রাত একনাগাড়ে যুদ্ধ করেছে। সে বলে, পাকবাহিনী এক ইঞ্চি জমিনও ছাড়তে রাজি নয়, শস্যখেত ভরে গেছে লাশে লাশে। ওখান থেকে যুদ্ধের আওয়াজ এলেও শহরের অবস্থা স্বাভাবিক। রাস্তাঘাটে কিছু মানুষ লুটপাট নিয়ে ব্যস্ত। কারো দিকে কেউ তাকাচ্ছে না। আতা মিয়াদের পাশ দিয়ে সেমাইয়ের পোটলা হাতে একজন দৌড়ে চলে যায়। অদূরে বাড়িঘরের দরজা-কপাট ভেঙে কিছু লোক ভ্যানে তুলছে। কোমরে পিস্তল ঝুলিয়ে রিকশাভর্তি লেপ-তোশকের ওপর পা ছড়িয়ে বসে একজন আসছিল তাদের দিকে। পাড়াতুতো ভাই বলে, ‘শালারে হ্যান্ডসআপ করায়ে পিস্তলডা নে, আমার অস্ত্রের দরকার।’ যে কথা সেই কাজ। লোকটা পিস্তল ফেলে লেপ-তোশকের রিকশা থেকে লাফিয়ে নেমে দৌড়ে পালাল। বুলেট নেই পিস্তলে। ‘শালা মাগনা পেয়ে তুলে নেইছে। যা-ই হোক, যুদ্ধের সোমায় হাতে লগার-ফগার কিছু থাকা ভালো।’ তারা আবার হাঁটতে শুরু করে। পথিমধ্যে শোনে যে, বোমায় পা উড়ে গেছে তাদের পরিচিত ফ্রিডম ফাইটার একজনের। তাকে আহত অবস্থায় সদর হাসপাতালে আনা হয়েছে। হাসপাতালে যাওয়ার পথে আরেক কাণ্ড। কয়েকটা পাঞ্জাবি সৈন্য কোথা থেকে রাস্তায় এসে পড়ে। পাবলিক তাদের দেখে। জয় বাংলা স্লোগান দেয়। ভয়ে পাঞ্জাবিরা চাইনিজ স্টেনগান দিয়ে ব্ল্যাংক ফায়ার। করলে পাবলিক ভাবে, পাকবাহিনী আবার এসে গেছে, তারা রাস্তার ধারের দোকানপাট ভেঙেচুরে দেয় দৌড়। আতা মিয়ারাও দাঁড়িয়ে থাকার কোনো কারণ দেখে না। দুজনের হাতেই অস্ত্র আছে, তবে গুলি সাকল্যে দুটি, তা-ও আতা মিয়ার কোমরের গামছায় বাঁধা। সে তো যুদ্ধ করবে না বলেই শত্রুমুক্ত শহরে ঢুকেছে। তাই তার প্রস্তুতিও নেই।
