এদিকে সদরে তখন আরেক হট্টগোল। ট্যাংকসহ মিত্রবাহিনী এগিয়ে গেছে। পেছনে রেখে গেছে আর্বজনাস্বরূপ যুদ্ধবন্দিদের। তবে কড়া প্রহরায়। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী আতা মিয়াকে নিরস্ত্র করে ভারতীয় সান্ত্রিরা মাননীয় মেহমানগণের সঙ্গে সাক্ষাতের ছাড়পত্র দেয়। তখন মনে যদিও আরেক চিন্তা–আতা মিয়া মুক্তিকে বলে, তবু একবার পাকিস্তানি সৈন্যদের চোখের দেখা দেখার জন্য সে বন্দিশিবিরে প্রবেশ করে। আট-দশ জন আধমরা, ক্ষতবিক্ষত হানাদার কোনোরকমে বোর্ড অফিসের খাস কামরার খালি মেঝেতে পড়ে আছে। চিড়িয়াখানার জন্তুর মতো অসহায়, বিহ্বল চাহনি। এ তাহলে প্রবল পরাক্রান্ত শত্ৰু, যাদের বিরুদ্ধে গত ছয়টা মাস আতা মিয়া খেয়ে না-খেয়ে যুদ্ধ করেছে! এখন উভয় পক্ষ মুখোমুখি অথচ কেউ কাউকে মারছে না। আতা মিয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁ-করে তাদের দেখে। ভাবে, মর্জিনা বিবি সঙ্গে থাকলে বেশ হতো। কিন্তু কী হতো–সে জানে না। মেয়েটার কথা ভাবতে গেলে, চেহারাছবি কিছু মনে পড়ে না, চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফুলপাতা আঁকা একটা কাঁচের গেলাস। যার মিষ্টি শরবতে কয়েক ফোঁটা কষ্টের নোনা পানি মিশে রয়েছে। তারপর তো সে ওখান থেকে পড়িমরি পালায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আতা মিয়া অস্বস্তিতে ডান পায়ের পাতা দিয়ে বাঁ পা ঘষে। ভঙ্গিটা মিত্রবাহিনীর নিয়োগকৃত সান্ত্রির পছন্দ হয় না। সে পেছন থেকে তাগাদা দেয়, আপকা টাইম ওভার হুয়া।
অন্য সময় হলে আতা মিয়ার মাথায় রক্ত চড়ে যেত। আজ যেন তার কী হয়েছে। ওখান থেকে নড়তেও ইচ্ছে করে না। অথচ দাঁড়িয়ে থাকতে গেলে পা ঘষাঘষি বাদ দিয়ে অন্য কিছু করা দরকার। কী করা যায়-ভাবতে ভাবতে আতা মিয়ার চোখ পড়ে পালের গোদা একজন অফিসারের ওপর। দেখে সেও তার দিকে অপলক চেয়ে আছে। যা মর্জিনাকে বলতে পারত অথচ বলা হয়নি, আতা মিয়ার গলার কাছে সেসব কথা ভিড় করে। সৈন্যটিকে সে জিগ্যেস করে, ‘ভাইসাব, আপ ক্যায়সা হো?’ সম্বোধনের জবাবে লোকটি নিরুত্তর। একটু যেন আবেগে কেঁপে উঠল। প্রশ্নটা নির্দোষ। কিন্তু অদ্ভুত ধরনের। সারা দিন সান্ত্রিটি নানান রকমের গালাগাল দিতে দেখেছে লোকজনদের। কিন্তু এমন প্রশ্ন কেউ করেনি। তাকে গোঁফের তলায় মিটিমিটি হাসতে দেখে আতা মিয়ার কথা বলার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। সে তার পছন্দের সৈন্যটিকে বলে, ‘আপলোক ভিজা বিড়াল বন গয়া কিউ? আভি ডর লাগতা হ্যায়?’ যুদ্ধবন্দি বেজায় সেয়ানা। তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আড়চোখে সান্ত্রির দিকে তাকায়। যেন বোঝাপড়াটা শুধু পাকিস্তানে আর হিন্দুস্থানে। মাঝখানে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা ফাউ। এখনো তাদের প্রজা। আতা মিয়ার হাত নিশপিশ করে। কিন্তু তার মর্জিনাকে বলতে-না-পারা কথাগুলো এখনো শেষ হয়নি। বিনয়ের সঙ্গে সে বলে, ‘আপলোক কভ পাকিস্তান সে আয়া?’ এবার সৈন্যটার শুকনো ঠোঁটজোড়া কেঁপে ওঠে। আতা মিয়া এক পা এক পা করে এগিয়ে যায়, মেরা নাম আতা মিয়া। ফ্রিডম ফাইটার। ভাইসাব আপকা নাম?’
‘মেজর ইশতিয়াক।’
আতা মিয়া এক গাল হেসে মুক্তিকে বলে, ‘আপনে জানতে চাচ্ছেন বলে কচ্ছি।’ তা না হলে যুদ্ধবন্দিদের মাঝখানে পালের গোদা আছে জেনেও সেদিন তার তেমন উত্তেজনা বা আনন্দ হয়নি। বরং তার কথা বলার আগ্রহ তখন বৃদ্ধ লোকটার সঙ্গে, যে। শীতের রাতে ভোলা মাঠে আগুন পোহাচ্ছে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিম পড়তে শুরু করে। গায়ে তাদের কাপড়চোপড় তেমন নেই। আগুনের উত্তাপে সামনেটা গরম হলেও পেছন দিকটা জমে যাওয়ার উপক্রম। অদূরেই পাকসেনার বাংকারগুলো খালি পড়ে রয়েছে। এতে রাতের মতো ঢুকে পড়লেই চলত। কিন্তু জিন্দা থাকতে গর্তে ঢুকতে নারাজ বৃদ্ধ। আতা মিয়া দৌড়ঝাঁপ করে কাঠখড় জোগাড় করে, বৃদ্ধ এক চুলও নড়ে না। সেই যে আগুনের পাশে দুই হাঁটুর মাঝখানে মাথা গুঁজে বসে আছে, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও সোজা হওয়ার তার লক্ষণ নেই। এ কেমন মানুষ? মুক্তিযোদ্ধা আতা মিয়ার তাকে তখন ভয় দেখাতে ইচ্ছে করে। বলে, ‘বুড়া মিয়া, নয় মাস দেশে থাকি কী করিছেন? জানি মুক্তিযুদ্ধ করেননি। রাজাকারি করিছেন?’
‘মুই?’ বৃদ্ধ চমকে উঠে তাকায়। ‘বয়স কই রে বাপ, যে যুদ্ধ করিব, রাজাকারি করিব?’
‘বয়স থাকলে রাজাকারি করতেন?’
বৃদ্ধ চরম গোঁয়ার। আতা মিয়ার মারাত্মক প্রশ্নটার জবাব দেয় না। মাথাটাও ফের গুঁজে দিয়েছে দু’হাঁটুর মধ্যিখানে। বয়সকালে ডাকাত ছিল নাকি লোকটা? ডরভয় বলে কিছু নেই! রাজাকারির শাস্তি এখন মৃত্যুদণ্ড। এ এক দিনে ডজন খানেক রাজাকারের লাশ পড়েছে কমলগঞ্জে। কিন্তু বয়স থাকলে যে রাজাকার হতো তার শাস্তি কী? এখন অবশ্য চাইলেই যা খুশি করা যায়। আইনের বই দেখে তো আর বিচার-সালিশ হচ্ছে না না! সবাই প্রতিহিংসায় পাগল। হাতে পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র। একেকটা অভিযোগ আসে, অনতিবিলম্বে শাস্তি কার্যকর হয়ে যায়। সাক্ষী-সাবুদের দরকার পড়ে না। আতা মিয়া অবশ্য গ করতে চায় না। তার আগ্রহটা অন্য জায়গায়। সে বৃদ্ধের সাপোর্ট চায়। আগামীকাল মিত্রবাহিনীকে অনুসরণ করে সে ঢাকার দিকে অ্যাডভান্স করবে, না কমলগঞ্জে থেকে যাবে, যেখানে বিবি মর্জিনা স্বামীশোকে ঘন ঘন মূর্ছা যাচ্ছে। ‘যুদ্ধ বড়, না মানুষের মিল-মহব্বত বড়–বুড়া মিয়া?’ আতা মিয়ার মুখ ফসকে অযোদ্ধাসুলভ প্রশ্নটা তিরের বেগে বেরিয়ে যায়। আর এর ধাক্কায় বৃদ্ধের মাথাটা হাঁটুর প্যাঁচ ছেড়ে উত্থিত হয়। তিনি পরম তাচ্ছিল্য ভরে বলেন, ‘যুদ্ধ রাজারে প্রজা বানায় না। প্রজারে রাজা বানায় না। সত্য যা, তা কারবালা।’
