এভাবে দিন কয়েক চলার পর, কমলগঞ্জে জনতার সঙ্গে পাকিস্তান সৈন্যের খণ্ডযুদ্ধের খবরটা তাদের কাছে ওয়ারলেস মারফত আসে। কমলগঞ্জ আতা মিয়ার চেনা জায়গা, নিজের গ্রাম থেকে মাত্র দুই ক্রোশ পথ। তাই তাকে সমাদর করে প্রথম দিনের মতো ফের ট্যাংকে তোলা হয়। ট্যাংক-কমান্ডার খুশিতে ডগমগ—’দোস্ত জলদি চলো। মওকা মিল গিয়া।’ মৃত সৈন্য নয়, এখন তাদের দরকার জ্যান্ত যুদ্ধবন্দি। কমান্ডার আতা মিয়ার দিকে তাকালেই সে হাতের ইশারায় সামনের দিকটা দেখিয়ে দেয়। অর্থাৎ-চিন্তার কোনো কারণ নেই-কমলগঞ্জ সামনেই। ঠিক সে সময় মজিদ বিহারির ট্যাংকের সামনে হঠাৎ চলে আসাটা ছিল উটকো ঝামেলা। আতা মিয়া প্রথম বুঝতে পারেনি। সে তখন দ্রুতগামী ট্যাংকের পিঠে নিজেকে ধরে রাখতেই ব্যস্ত। তারপর ‘রোকো রোকো…’ চিৎকারটা যখন শোনে, ততক্ষণে মজিদ বিহারি পদাতিক বাহিনীর গুলি খেয়ে উড়তে উড়তে রাস্তার বাইরে চলে গেছে। দৃশ্যটা তাকে এতই আচ্ছন্ন করে রাখে যে, সামনের মসজিদে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখেও তার কোনো ভাবান্তর হয় না। তবে হাফ ডজন ট্যাংকের পরোয়া না-করে উন্মত্ত জনতাকে যখন মারদাঙ্গা চালিয়ে যেতে দেখে, তখন সে ট্যাংকের পিঠ থেকে খুশিতে লাফিয়ে পড়ে গলা ফাটিয়ে স্লোগান দেয়–জয় বাংলা!
মসজিদের দরজাটা পদাতিক বাহিনীর দখল নিতে নিতে খান পাঁচেক পাক আর্মির লাশ পড়ে যায়। তাতেও লোকগুলোর রাগ কমে না। জেনেভা দেশে হানাদারদের জামাই আদরে থাকাটা যে-করে হোক ঠেকাবেই। এই মানেকশ’র ‘সারেন্ডার সারেন্ডার’ ঘোষণাটি যত অনিষ্টের মূল। গত ন’মাসে তারা রেডিও শুনেছে বিস্তর, কিন্তু কোনো খবরই এভাবে তাদের নাকে-মুখে থুতু ছিটিয়ে দেয়নি। মিত্রবাহিনীর দাবড়ানি খেয়ে ওসমান গনি পুকুরের উঁচু পাড়ে ফের এক লাফে উঠে যায়, ‘ভায়েরা শোনেন, একবারটি মোর কথা শুনি লন। ইব্রাহিমের বাপ ইসমাইলকে নচ্ছাররা যখন গুলি করইলো, মানিক শার চ্যালা-চামুণ্ডারা তখন কনে ছিল! কনে ছিল আফিলুদ্দিন যখন শহিদ হয়–’
ওসমান গনির ফাটা বাঁশের মতো ভাঙা খ্যানখেনে গলা আর আতা মিয়ার মুহূর্মুহূ জয় বাংলা স্লোগান মিত্রবাহিনীর ফাঁকা আওয়াজের নিচে চাপা পড়ে যায়। বিক্ষুব্ধ জনতা ক্রমশ পিছু হটতে শুরু করে। তারা দৌড়ঝাঁপ করতে করতে একসময় পৌঁছে যায় দুদিন আগের পচাগলা লাশের কাছে। সেখানকার বাস্তবতা তখন ভিন্ন…।
যে যে-জায়গায় গুলি খেয়ে পড়েছিল, সেখানেই ফুলে ঢোল হয়ে আছে। আর তাদের নিয়ে চলেছে কাক, শকুন, কুকুরের ত্রিমুখী লড়াই। বাঙালি আর পাকিস্তানি লাশের মধ্যে তরতফাত নেই। গাঁয়ের মহিলারা শত্রু-মিত্র ভুলে সব কটা লাশের জন্য আছাড়ি-পিছাড়ি বিলাপ জুড়ে দেয়। নারীদের অরাজনৈতিক কাণ্ডকারখানায় পুরুষেরা বিরক্ত হয়। তারা পাকসেনার লাশগুলো কোনোরকমে মাটি চাপা দিয়ে, আত্মীয় বা প্রতিবেশীর অর্ধভুক্ত দেহাবশেষ বাঁশের মাচায় তুলে কাঁধে করে বাড়ি ফেরে।
গাঁয়ের বাড়িগুলো যখন শোকে মোহমান, কান্না আর দীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারাক্রান্ত, রাতের অন্ধকারে এবার সত্যিকারের শিয়ালের পাল ফসলের মাঠে ঝাকে। আঁকে প্রবেশ করে। পিতৃহারা ইব্রাহিম এই দৃশ্য বাড়ির নামায় বসে দেখে। কিন্তু সে চাঁচায় না। ভয়ও পায় না। কাঁচা লঙ্কা দিয়ে শিয়ালের মুলো খাওয়ার কথাটা মনে পড়তে এত দুঃখের মাঝেও তার মুখে হাসি ফোটে। সে ভাবে, দু’দিন আগেও সে কত ছোট আর বেকুব ছিল। শিয়াল যে আমিষাশী-মাংস খায়, লঙ্কা দিয়ে মুলো খায় না, তা-ও তার জানা ছিল না। বাপ মরে গিয়ে রাতারাতি তাকে সাবালক বানিয়ে দিয়ে গেছে।
মৃত সৈন্যদের নিয়ে শিয়ালের পাল যখন ব্যতিব্যস্ত, তখন জ্যান্ত যুদ্ধবন্দিরা এক মাইল দূরের সদরের এক খুপরি ঘরে নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। জেনেভা কনভেনশন শীতের রাতে মৌতাতের মতো। তা পেটের দানাপানি না জোগালেও ঘুম পাড়ানোর ব্যবস্থা করে। সে সময় আতা মিয়া অদূরের খোলা মাঠে পরিত্যক্ত বাংকারের কাঠখড় জ্বালিয়ে আগুন পোহাচ্ছিল। তার পাশে গানে গানে কারবালার কাহিনি বয়ান করেন। যে, সেই বৃদ্ধ। তখনো বৃদ্ধের স্বল্প কেশের মাথাটা দু’হাঁটুর মাঝখানে, যা আগুনের রক্তিমাভায় ঝিকমিক করছে। আজ পুঁথির বীরযোদ্ধাদের সশরীরে পেয়ে এলাকার লোকজন বৃদ্ধের কথা ভুলে গেছে। খাওয়ার সময় তাকে ডাকেনি। শোয়ার জায়গাটাও বেহাত হয়ে গেছে। এখন মুক্তিযোদ্ধারা এর-ওর বাড়ির সম্মানীয় অতিথি। মুক্তাঞ্চলের তারা নব্য শাসক। গতকাল পর্যন্ত যেসব দোর তাদের সামনে রুদ্ধ ছিল, সেসব এখন অবাধ, উন্মুক্ত। তাদের আপ্যায়ন করতে সদরের আশপাশ এলাকা আজ উৎসবমুখর। শামিয়ানার নিচে বড় বড় তামার ডেকচিতে গরুর মাংস, খিচুড়ি। পরিবেশনের জন্য এবাড়ি-ওবাড়ি থেকে চেয়েচিন্তে আনা হয়েছে চিনামাটির বাসন, কাঁচের গেলাস, কাঁসার চিলমচি। ভূরিভোজের পর বহুদিন পর যোদ্ধারা আজ গরম বিছানায় সুখনিদ্রা যাচ্ছে। আতা মিয়ার চোখে ঘুম নেই।
দিনের বেলা মিত্রবাহিনীর তাড়া খেয়ে ওসমান গনির দল যখন ফসলের মাঠের দিকে দৌড়ে যায়, আতা মিয়া তখন তাদের মাঝখানে নিজেকে আবিষ্কার করে। তারপর দলছুট কচুরিপানার মতো ভাসতে ভাসতে ইব্রাহিমদের উঠোনে হাজির হয়। সেখানে দু-দুটি লাশ। একটা ইসমাইলের, অন্যটা আবদুর রবের। যার সঙ্গে সাত দিন আগে ইসমাইল বিশ্বাসের কন্যা মর্জিনা বিবির শাদি হয়েছিল। আহা রে, ঘুরেফিরে আবার সেই কারবালা। মর্জিনার অবস্থা বিবি সখিনার মতো। বাবা নেই। নতুন বিয়ে। করা স্বামী নেই। একটু পরপর মেয়েটা মূৰ্ছা যাচ্ছিল। মা মদিনার এত শোকের মধ্যেও বাস্তব জ্ঞানটা টনটনে। বাড়ির উঠোনে দু’দুটি লাশ আছে, একজন জীবিত মুক্তিযোদ্ধাও তো আছে। মর্জিনা দশটা জল ঝাঁপটা খেয়ে একবার চোখ খুলে তো, মা তাকে মুক্তিযোদ্ধার জন্য শরবত বানানোর তাড়া দেন। এই করে করে একসময় মেয়ের মাথায় মায়ের নির্দেশটা ঢোকে। কিন্তু শরবতের গ্লাস হাতে মর্জিনা বিবি দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। হুড়মুড়িয়ে কলাগাছের মতো ভেঙে পড়ে মুক্তিযোদ্ধার পায়ের কাছে। এত বড় সম্মানের জন্য আতা মিয়া মোটেও তৈরি ছিল না। তড়াক করে সে লাফ দেয়, যেন আর একটু হলেই শত্রুর পোঁতা মাইনে পা পড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ইসমাইলের বাড়ির সীমানা ছাড়ার পরপরই মনে তার অনুতাপ আসে। যাক, যা হবার হয়ে গেছে। এখন ফেরার পথ নেই। দিন শেষ। নিজের অধিনায়কের কাছে রিপোর্ট করতে হবে। তা না হলে দলের লোকেরা তাকে ক্যাজুয়ালটির দলে ফেলে। দিতে পারে। সে সদরে যাওয়ার রাস্তায় ওঠার আগে মর্জিনাদের বাড়ির পথটা ভালো করে দেখে নেয়, যাতে দ্বিতীয়বার পথ চিনতে কোনোক্রমেই ভুল না হয়।
