দেখেছিল এক বিহারি, মজিদ নাম, ঘটনাস্থল থেকে এক মাইল দূরে। লোকটা ছিটগ্রস্ত। আজগুবি চিন্তায় মাথাটা ভরপুর। অন্য সব বিহারি পাকিস্তান আর্মির পেছন পেছন সটকে পড়লে সে শুধু রয়ে যায় তাদের প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষায়। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পাকিস্তানি যোদ্ধারা এইভাবে চোরের মতো পালিয়ে যাবে, চোখের সামনে দেখেও তার বিশ্বাস হয়নি। তাহলে তো আসমানের চান-সুরুজ মিথ্যা হয়ে যায়। তৃতীয় দিনে তার প্রার্থনা মঞ্জুর হয়। মজিদ বিহারি দেশভাগ দেখেছে। বন্দে মাতরম আর নারায়ে তকবির আল্লাহু আকবর-এর মুখোমুখি সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ আর ছোরার ঝলকানির সে একজন প্রত্যক্ষদর্শী। রাতের আঁধারে বিহারের টিলাটক্কর, কাঁটা ঝোঁপড় আর বাংলামুলুকের একাংশ ডিঙিয়ে এপারে চলে আসার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা তার আছে। তারপর নয় মাস যাবৎ এত বড় একটা যুদ্ধ গেল, আশ্চর্য যে সে কোনোদিন ট্যাংক দেখেনি। লোকটা ট্যাংক দেখে ভাবে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সেনাবাহিনী বুঝি শক্তিমান যানে চেপে ড় তুলে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসছে। তাদের আগমন মাটি কাঁপানো ভূমিকম্পের মতন। তাতে তার শরীর আবেগে থরথর করে। সে আর বিলম্ব করে না। ‘রোকো রোকো ভাইয়া, হামলোক বিহারি আদমি, তুমহারা দোস্ত!’ ধ্বনি তুলে মজিদ বিহারি কম্পমান মাটির ওপর দিয়ে নতুন হাঁটতে শেখা শিশুর মতো টলতে টলতে দৌড়ে যায় যন্ত্রদানবের দিকে।
দৃশ্যটা দেখেছিল ট্যাংকের ওপর থেকে ইব্রাহিমের বড় বোন মর্জিনার স্বামী আতা মিয়া। মুক্তির ইশারায় সে বসাবস্থা থেকে সিনা টান করে উঠে দাঁড়ায়, নিজের পরিচয় দেয়, ‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। ভারত থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।’
সেদিন ‘ট্যাংকের ওপর আপনি কী করছিলেন?’ মুক্তির প্রশ্ন শুনে আতা মিয়া থ। যুদ্ধের এত বছর পর, কেউ এমন প্রশ্ন করতে পারে, তার ধারণা ছিল না। সে মনে বেদম চোট পায়। সত্যি, সেদিন ট্যাংকের কমান্ডার, ক্রু বা চালক এসব গুরুত্বপূর্ণ পদের কেউ ছিল না আতা মিয়া। তার থাকার কথাও নয়। তাদের দল তখন মিত্রবাহিনীর ট্যাংকের পথপ্রদর্শক। শত্রু ঠেঙাতে ঠেঙাতে বীরের বেশে স্বদেশে ফিরছে। কিন্তু চোখে-মুখে, শরীরের ভঙ্গিমায় বীরত্বের ভাবটা কিছুতেই ফুটিয়ে তুলতে পারছিল না। ট্যাংকের ইস্পাতের বডিটা পিচ্ছিল আর সামনের দিকটা ঢালু। ঝাঁকুনির সঙ্গে সঙ্গে শরীর পিছলে পিছলে পড়ে যেতে চায় নাক উঁচু ট্যাংকের কনভেয়ার বেল্টের তলায়। এই অবস্থায় হাতের তালুর ওপর ভর রেখে টাল সামলাতে বেশ নাজেহাল হতে হচ্ছিল পথপ্রদর্শকদের। কিন্তু সেসব তো তখনকার কথা। তারপর আতা মিয়া যখনই নিজের গৌরবময় দিনগুলোর কথা ভাবে, তখন একটা নাক উঁচু ট্যাংক ঘড়ঘড়িয়ে তার স্মৃতিতে ঢুকে পড়ে। তখন সে আর দু’কাঠা ধানি জমির মালিক, পেশায় গার্লস স্কুলের দফতরি, ইব্রাহিমদের বাড়ির ঘরজামাই থাকে না। হয়ে যায় ট্যাংকআরোহী-বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতার বীজ বপন করতে করতে যে এগিয়ে আসছে। মুক্তির প্রশ্নটা তাই তার স্মৃতির প্রতি হুমকি। যাচাই-বাছাইয়ের সময় মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে কলমের খোঁচায় নাম কাটা যাওয়ার চেয়েও বেদনাদায়ক।
সে সময় যুদ্ধের মতিগতি হঠাৎ পাল্টে গিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধারা তখনো জানে না যে, এবার গেরিলা যুদ্ধ খতম, সামনে আসল যুদ্ধ–একেবারে শত্রুর মুখোমুখি, যার নেতৃত্বে থাকবে মিত্রবাহিনী, আতা মিয়ারা থাকবে পার্শ্ব চরিত্রের ভূমিকায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখা গেল, সামনে হাফ ডজন ট্যাংক। ট্যাংক কমান্ডারের গলায় দুরবিন, মাথায় হেলমেট। ক্রুরা সব ডাংরি পরে ট্যাংকের নিরাপদ গহ্বরে ঢুকে বসে আছে। পথঘাট চেনানোর জন্য দীনহীন বেশের আতা মিয়াদের বসিয়ে দেওয়া হয় অভিজাত ট্যাংকের ওপর। আতা মিয়া ভয়ে তটস্থ। তার মনে হচ্ছিল, তোপের মুখে মিত্রবাহিনী তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। ভয়ের চেয়েও বিষয়টা অপমানের। কিন্তু খানিক পর উল্টো দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি আসতে শুরু করলে, আতা মিয়া বলে-মারাঠি ট্যাংক কমান্ডার ‘আপনারা নেমে যান, নেমে যান’ নির্দেশ দিয়ে নিজে ঢাকনার নিচে ঢুকে পড়ে। তারপর ঝাং-গুরুম, ঝাং-গুরুম শব্দে গোলা ছুঁড়ে ছুঁড়ে আসল যুদ্ধটা ট্যাংকবাহিনীই চালিয়ে যায়। আতা মিয়ারা থাকে পেছনে–শোয়া পজিশনে। এই অবস্থায় অর্ডার আসে, পাকিস্তান আর্মি পালিয়েছে, তোমরা এগিয়ে গিয়ে ক্যাম্প দখল করো। দখল আর কী-পোড়া মাটি, ধ্বংসস্তূপ, পরিত্যক্ত বাংকার, অর্ধভুক্ত বিরিয়ানি, থালাবাসন, কয়েকটা তাজা লাশ। কিন্তু ট্যাংকগুলো থামে না। কারণ জাতিসংঘের নিউ ইয়র্ক অফিসে তখন তুমুল তর্ক-বিতর্ক চলছে। বিষয় ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ। যুদ্ধবিরতি ও পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে ১০৪-১১টি ভোট পড়ে। বিপক্ষের ভোটাররা ভারত আর সোভিয়েত লবির মাত্র ১১টি দেশ। এদিকে পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী জে এ ভুট্টো সাত সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধিদল নিয়ে নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে রাওয়ালপিন্ডি ত্যাগ করেছেন। অবস্থা সঙ্গিন। জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস হওয়ার আগেই ভারতীয় ট্যাংকবাহিনীর দ্রুত ঢাকা পৌঁছাতে হবে। শত্রুকে তাড়া করে তাই তারা এগিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি মার্চ করছে সহযোগী পদাতিক বাহিনী। আর আতা মিয়ারা তো আছেই সঙ্গে।
