ওসমান গনি জানায়, সেদিন দুপুরের আগেই উভয় পক্ষের চারটা লাশ পড়ে। সৈন্য যদি মরে একজন, গাঁয়ের লোক মারা যায় তিনজন। কারণ সৈন্যদের হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র । গাঁয়ের লোকজনের সম্বল বলতে লাঠিসোটা আর ঘৃণা। তা-ই দিয়েই তারা লড়ে যাচ্ছিল। দুপুরের দিকে রণকৌশলে কিছুটা রদবদল হয়। যারা খেত-খামারে যুদ্ধ করছিল, তারা পিছিয়ে আসে। কয়েক গাঁয়ের লোক টেটা-বল্লম হাতে সৈন্যদের ঘিরে দাঁড়ায়। বৃত্তটা দ্বিতীয় দিনে ছোট আর আকারে হয় গোল। সৈন্যরা গুলি চালাতে চালাতে বৃত্তের কোনা ভেঙে বেরিয়ে গেলে তাদের সেদিনের গুলিবর্ষণে শহিদ হন ইব্রাহিমের বাবা ইসমাইল।
পাকসেনাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র যতই থাকুক লোকবল তো কম। তারা মোটে বিশ পঁচিশ। এদিকে গ্রামবাসীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় হাজার হাজার। উপায়ান্তর না দেখে পাকসেনারা বাজারের মসজিদে ঢুকে দোর আটকে দেয়। গুলির মুখে গাঁয়ের লোকজনের মসজিদের দরজা ভাঙার সাহস হয় না, তবে তারা সরেও যায় না। জায়গাটা ঘিরে রাখে। ততক্ষণে আশপাশের পাঁচ ছ’ গাঁয়ের নর-নারী, ছেলে-বুড়ো সবাই যুদ্ধে শরিক হয়ে গেছে। তারা গায়ের যোদ্ধাদের জন্য ডালা ভরে খই-চিড়ে আর মাটির মটকায় করে গুড় নিয়ে আসে। তেষ্টা নিবারণ হয় মসজিদসংলগ্ন পুকুরের পানিতে। হায় গো কারবালার যুদ্ধ!’ ভিড়ের মধ্য থেকে বৃদ্ধের কণ্ঠ ফের ভেসে আসে। ফোরাতের পানি রক্তে ভাইস্যে গেল, তবু যুদ্ধ থামল না।’ এটুকু বলে শ্রোতাদের মনোযোগ আকর্ষণের পর পুনরায় পুঁথির ভুবনে ঢুকে পড়েন বৃদ্ধ। তার মাথাটা হাঁটুর বেশ খানিকটা ওপর। ভঙ্গুর দেহটা সাপের মতো দুলছে যেন কোনো। এক অদৃশ্য সাপুরের বাঁশির সুরে সুরে–
এই কথা শুনিয়া রে কাশেম জ্বলিয়া উঠিল
ছাগলের পালে যেমন বাঘ ঝাঁপ দিল।
কলার বাগিচা যেমন হাতিতে লুটায়
দুই হাতে তলোয়ার লইয়া অমনি কাটে ভাই।
মুক্তির মনে হয়, সবাই যেন ইতিহাসের যোদ্ধা–প্রাণপণে শত্রুর মোকাবিলা করছে। আর বৃদ্ধ তাদের গানে গানে বলে যাচ্ছে, তোমরা অনর্থক কালক্ষেপণ করিয়ো না। পুকুরের পানি শুকিয়ে তলায় লেগে গেছে। আচমকাই তার চোখে নামে বিষাদের কালো ছায়া। সেখানে শুধুই শোক, বহু বছর আগেকার এক বালক যোদ্ধা কাশেমের জন্য। ঘরে যার সদ্য বিয়ে করা বালিকা বধূ সখিনা। যোদ্ধা নিজে তিরবিদ্ধ, জলতেষ্টায় কাতর। ভূমিতে পড়ে ছটফট করছে। বৃদ্ধের কণ্ঠে ঝরনার মতো ঝিরঝিরিয়ে বিষাদের সুর নামে।
ইব্রাহিমের মা মদিনা বিবিসহ অন্য বিধবারা শুরু থেকেই পুকুরপাড়ে। মাঠে ময়দানে পড়ে থাকা লাশের কাছে কেউ নেই। মহিলাদের ভাবখানা এমন, মসজিদের শত্রুরা নিহত হলে, তাদের স্বামীরা আপনা হতে জ্যান্ত হয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরবে, যেমন করে হাল বাওয়ার পর গোধূলি বেলায় মাঠ থেকে লাঙল-গরু নিয়ে ফিরত। এদিকে মসজিদ ভাঙা ছাড়া শত্রু নিধনের অন্য কোনো উপায় নেই। এ নিয়ে যখন মতভেদ চলছে, তখন স্কুলছাত্র মহিবুলকে দেখা যায় ‘সারেন্ডার সারেন্ডার’ বলে ফসলের মাঠ চিরে দৌড়ে আসতে। সে রেডিওতে জেনারেল মানেকশ’র আত্মসমর্পণের নির্দেশটা শুনে আর দেরি করেনি। মসজিদের কাছাকাছি এসে তোতা পাখির মতো এর পুনরাবৃত্তি করে, ‘ভাইসব তোমরা চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে পড়িছো। আকাশপথ-সমুদ্রপথ বন্ধ। পালানোর উপায় নেই। তোমরা সারেন্ডার করো, নতুবা মৃত্যু। সারেন্ডার করলে জেনেভা কনভেনশন মোতাবেক তোমাদের প্রতি যুদ্ধবন্দির আচরণ করা হইবে।’
মহিবুলের মুখে জেনারেল মানেকশ’র ঘোষণাটি সবাই ধৈর্য সহকারে শোনে। সারেন্ডার যে মাথার ওপর হাত তোলা, এই নয় মাসে তারা তা শিখেছে। ‘কিন্তু জেনেভা কী রে, মহিবুল?’ মসজিদের বেষ্টনী ধরে রেখে ওসমান গনি গলা তুলে জানতে চায়। ‘জেনেভা হলো গে দেশ, একটা স্বাধীন রাষ্ট্র।’ মহিবুল দম নেওয়ার ফাঁকে গভীরভাবে চিন্তা করে আরো বলে, ‘সারেন্ডার করলি পর তেনাদের জেনেভা দেশে চালান করি দিবে।’
খবরটা শুনে সবার মাথায় হাত। ভারতের এ কেমন বিচার! ‘নয় মাস ধরে জ্বালাল-পোড়াল, খুন করল, ইজ্জত নিল–সাজা হবে না? জেনেভা দেশে পাঠাই দিবে!’
‘জে,’ মহিবুল নিজে যেন ভারতীয় সৈন্য, মৃদুস্বরে অপরাধীর গলায় তা স্বীকার করে।
ওসমান গনি বেষ্টনী ছেড়ে এক লাফে পুকুরের উঁচু পাড়ে ওঠে। রাগে-অপমানে মুখটা তার লাকড়ির চুলার মতো গনগনে লাল। ভায়েরা, শেয়াল মারিছ না তোমরা অতীতকালে!’ সে তর্জনী নাচিয়ে নাচিয়ে বক্তৃতা আরম্ভ করে, ‘গর্তের মুখে ধোয়া দিয়ে মোরা এখন শেয়াল ধরিব–চলো।’ যেই কথা সেই কাজ। বস্তা ভরে লঙ্কার গুঁড়ো এল। শুকনো কচুরিপানা, খড়ের বিচালি, পাটখড়ি, কেরোসিন জোগাড় হয়ে গেল হাতে হাতে। একজন মই বেয়ে উঠে গেল মসজিদের গম্বুজের চূড়ায়। হাতুড়ি, বাটাল, শাবল দিয়ে মসজিদের ছাদ ফুটো করে ফেলল। ছিদ্রপথে দাহ্য পদার্থের সঙ্গে ছেড়ে দেওয়া হলো লাল লঙ্কার গুঁড়ো। ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠতে থাকলে সেদিন সূর্য ঢাকা পড়ে মধ্যাহ্নেই কমলগঞ্জে নেমে আসে রাতের অন্ধকার।
ধোঁয়া-অন্ধকারের আড়ালে মানুষগুলো ওত পাতে মসজিদের দরজায়। একেকজন সৈন্য মাথার ওপর হাত তুলে সারেন্ডার করে বেরোয় তো, মানেকশ’র ঘোষণা অগ্রাহ্য করে তারা শিয়ালের মতো পিটিয়ে মারে। হত্যার বহ্নি উৎসবে কখন ত্রাণকর্তারা ট্যাংক নিয়ে হাজির হয়েছে, তারা তা দেখতে পায়নি।
