সেদিনের ঘটনার শুরু বর্তমান মুদি দোকানদার ইব্রাহিম বিশ্বাসকে দিয়ে।
ইব্রাহিমের বয়স তখন দশ। অবেলায় খেজুরের রস খেয়ে তার পাতলা পায়খানা হচ্ছিল। ভোররাতের দিকে পেটে মোচড় দিতে সে একাই বাড়ির নামায় গিয়ে বসে। নিজেকে খালাস করে বসাবস্থায় অদূরের সবজির মাঠে আয়েশ করে তাকায়। আমি ছোট্ট এইখানি তো, সামনের একটা ন্যাংটা বাচ্চাকে দেখিয়ে মুক্তিকে বলে ইব্রাহিম, ‘ভাবিলাম মুলো খেতে বুঝি শেয়াল পড়িছে। ঝাঁকে ঝাঁকে শেয়াল। আগে ইব্রাহিমদের গাঁয়ে মানুষ মরলে শিয়াল ডাকত। তখন যুদ্ধের বছর, হরবখত মানুষ মারা যাচ্ছে। রাতের প্রহরে প্রহরে শোনা যায় বজ্জাতগুলির হুঙ্কুতি আর হুক্কা হুয়া হাঁকডাক। খালে বিলে এত মরা থাকতে, ইব্রাহিম অবাক হয়ে ভাবে, ‘সবজি খেতে তেনারা মুলো খাইতে আসিছে কেন।
মুলাখেতের পাশেই লঙ্কার আবাদ। আর ওখানেও শিয়াল। শিয়ালগুলো বড় বড়, সংখ্যায় মনে হয় কয়েক গন্ডা। ইব্রাহিমের ধন্ধ লাগে। এ তো শিয়াল নয়, মানুষ-ছপছপ করে পাতাসুদ্ধ মুলো খাচ্ছে কাঁচা লঙ্কা দিয়ে। তার আর পুকুরঘাটে যাওয়া হয় না। পরনের হাফপ্যান্ট পতাকার মতো মাথার ওপর নাচাতে নাচাতে সে বাপজানকে গলা ফাটিয়ে ডাকে। যতটা জোরে ডাকলে মানুষের ভয় পালায় ঠিক ততখানি গলা ফাটিয়ে। বাপ বেরিয়ে এলে সে ‘মুলো খেতে শেয়াল পড়িছে’ বলে, বলে না যে মানুষ। কারণ মানুষ বলতে তখনো তার গা ছমছম করছিল। যা হোক যুদ্ধের দিন, লোকজন ঘুমালেও কান দুটি জেগে থাকে। বাপবেটার চিল্লাচিল্লিতে পাড়াপড়শির ঘুম ভেঙে যায়। তারা দলে দলে বেরিয়ে আসে হাতে লাঠিসোটা নিয়ে। ততক্ষণে ভোরের কুয়াশা কেটে গেছে। সকাল হয় হয়। তবু তারা খেতে পাকসেনাদের ছোটাছুটি করতে দেখে শিয়ালই ভাবে, মানুষ ভাবে না। কারণ বাজারের ক্যাম্প ভেঙে দু’দিন হয় পাক আর্মি চলে গেছে। বিহারিরা সপরিবারে গেছে তাদের পেছন পেছন। রাজাকাররাও লাপাত্তা। এ অবস্থায় খেতে শিয়াল নয় তো কী। দেখতে-শুনতে বা আচার-ব্যবহারে ভোরের আলো-আঁধারে এদের শিয়াল বলেই গণ্য হয়। তেনারাও মানুষজন দেখে শেয়ালের মতো লেজ দুলিয়ে নাইচতে লাগিছেন, ইব্রাহিমের কথার মাঝখানে বলে ওঠে ঘটনার আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী ওসমান গনি। অবশ্য বিষয়টা তখন আর ইব্রাহিমের একার থাকে না। প্রাপ্তবয়স্কদের এখতিয়ারে চলে। যায়। তারা হাতের লাঠিসোটা নিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ যুদ্ধের যেন শেষ নেই। আর ফসলের খেতগুলোও মনে হয় কারবালার ময়দান। ওসমান গনি কাহিনির এই জায়গায় কথা বন্ধ করতেই একজন বৃদ্ধ নিচু স্বরে কারবালার গীত গেয়ে ওঠেন। এ যেন আগে থেকে রিহার্সেল করা–কথা থামলে গান শুরু হবে। চোখ বুজে বৃদ্ধ গাইছেন–
কারবালারো কথা কইতে যায় গো হৃদয় ফাটিয়া
কান্দে মায়ে বাচ্ছা কোলে লইয়া।
নবীর বংশ ধ্বংস হইল শুধু পানির লাগিয়া
কান্দে মায়ে বাচ্ছা কোলে লইয়া।
জমায়েতটা ইস্পাতের মতো স্থির। বাতাসের কম্পন কখন যেন থেমে গেছে। মুক্তি তাকিয়ে দেখে, বৃদ্ধের ভাঙাচোরা দেহটা দু’হাঁটুর মধ্যিখানে। শোকে তিনি মোহ্যমান। গান শেষে তার স্বল্প কেশের মাথাটা নুয়ে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সে বৃদ্ধের বয়স জানতে চাইলে গাঁয়ের কেউ সঠিক বলতে পারে না। গাঁয়ের সর্বজ্যেষ্ঠ মুরুব্বি ওসমান গনি জানায়–সত্তরের জলোচ্ছ্বাসের পর সাগর উপকূলের এক গ্রাম থেকে নিঃস্ব অবস্থায় বৃদ্ধ এখানে আসেন। তার পরনে ছিল ছেঁড়া তবন, গায়ে তাপ্লিমারা ফতুয়া আর বগলে খান কয়েক জীর্ণ পুঁথি। এসে বললেন, সংসারে জনমনুষ্যি কেউ বেঁচে নেই। সাগর টেনে নিয়েছে। নোনা পানি বৃদ্ধের হাড়মাস খেয়ে ফেলেছিল। চামড়াও নুন-পোড়া। এসেই ঘড়া ঘড়া পুকুরের পানি একেক টানে যখন খেয়ে নিচ্ছিলেন, তখন তিনি দেখতে আজকের মতোই। শীতের শেষে তার চলে যাওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে যুদ্ধ বেধে গেল। তখন কারবালার কাহিনি শুনিয়ে শুনিয়ে বৃদ্ধ কমলগঞ্জের মানুষদের আসন্ন যুদ্ধের ব্যাপারে প্রস্তুত করেন। জনে জনে তিনি বলেন যে, বিক্ষুব্ধ সাগরের মতোই যুদ্ধ। তা ধ্বংস করে, আপনজনের মৃত্যু ঘটায় আর সয়সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তা অন্ধ-বড়লোক ছোটলোক মানে না, নারীদের উলঙ্গ আর বেইজ্জত করে। যুদ্ধশেষে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ফরসা চেহারার শহুরে বা ভিনদেশি মানুষেরা খাদ্য-খাবার, ক্যামেরা নিয়ে আসে। নিজেরা সঙ্গে আনা বোতলের পানি খায়, সেই পানিতে ভাগ বসাতে দেয় না। খাদ্য কম্বল বিতরণ করে ছবি তুলে চলে যায়।
বৃদ্ধের কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে ফলে যায়। অকারণে এত মৃত্যু, তা-ও আবার সমুদ্রের আক্রোশে নয়, মানুষের ষড়যন্ত্রের ফলে, এ শোক স্বজনহারা মানুষ সামলাবে। কী করে! তাই দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বৃদ্ধকে তারা যেতে দেয়নি। সেই থেকেই তিনি আছেন। তার গানের বিষয়ও একটা কারবালা। যখনই একাত্তর নিয়ে কথা ওঠে, তিনি তাদের কারবালার কাহিনি শোনান। কাজটা অনিয়মিত। তবু এর বিনিময়ে তাকে তারা দু’বেলা খেতে দেয়। খুব সামান্যই তিনি আহার করেন। দুর্ভিক্ষ, মন্বন্তরে তাকে খাওয়াতে তাই তাদের অসুবিধা হচ্ছে না। এরপর গ্রামবাসীর বক্তব্য শেষ হলে বৃদ্ধ ‘হায় গো দুলদুল’ বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে যান, যা তাদের রিহার্সেলের অংশ বলে মনে হয় মুক্তির ।
