‘আমরা তো পাগলের মতো একটার পর একটা তালা ভেঙে আগুই যাচ্ছি।’ রফিকুল বলে, ‘কতগুলি বিদগুটে চেহারার মেয়েছেলে পিলপিল করে বেরিয়ে আসলো। সারা গায়ে ঘা। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়েছে। শরীরে এক ফোঁটা গোশত নেই। একেকটা কঙ্কাল। তখন ওদের মানুষ বুইলে মনে হতো না। হাফম্যাড। কাপড় বলতে এদের যা ছিল, এ তো ভাষায় বলা যাবে না! এরা মনে হয় যোনিদ্বারটা শুধু ঢাইক্যা রাখছিল।’
কিন্তু সিল্ক শাড়ি? খোঁপায় লাল গোলাপ? দেয়ালে তৈলচিত্র? মেঝেতে হারমোনিয়াম-তবলা? কোথাও একটা গোলমাল হয়েছে। রফিকুল যাদের তালা ভাঙার পর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে দেখেছে, তারা অন্য কেউ, সেখানে মরিয়ম ছিল না। মুক্তি তার সন্দেহের কথা জানালে একটানে হাঁটুর ওপর শাড়ি তুলে ডান পায়ের ক্ষতস্থান দেখায় মরিয়ম। ‘দেখতে চাও? আরো দেখাই,’ বলে যখন সে ব্লাউজ খুলতে যাচ্ছিল, মুক্তি বাধা দেয়। ‘তোমাকে যে বলেছে মিথ্যা বলেছে,’ মরিয়ম রাগে কাঁপতে থাকে। ‘ওরা তখন আমাদের দ্যাখবে কেন? নজর তো অন্যদিকে। আমরা হলাম গিয়ে বাসি, মিলিটারি আমাদের ইজ্জত মারছে। গায়ে খোঁচা খোঁচা দাগ। রক্ত, গন্ধ। আমাদের এরা চিনবে কেন?’ রেগে হড়হড় করে একসঙ্গে এতগুলো কথা বললেও সিল্ক শাড়ি, লাল গোলাপ, তৈলচিত্র, হারমোনিয়াম-তবলা নিয়ে একটি কথাও আর বলে না মরিয়ম। রফিকুলকে দেখানোর জন্য তার কাছে ছবি চাইলে হালের একটা পাসপোর্ট সাইজের সাদাকালো ছবি দিয়ে মুক্তিকে বিদায় করে। বাইশ বছরের তরুণীকে যে দেখেছে, সে বায়ান্নতে তোলা ছবি দেখে তাকে চিনতে পারবে?
হারিকেনের ঘোলা আলোয় সাদা-কালো ছবিটা চোখের সামনে মেলে ধরে রফিকুল। ‘এহ্ হে, এ তো বুড়ি! আমরা যাদের তালা ভেঙে বের করে দেছিলাম, ওরা সব মোলো-সতেরো বচ্ছরের ছুঁড়ি ছেল। তয় ঘিন্না লাগত ওদের দেখলে।’
‘আপনেও তো বুড়া।’ বলে মুক্তি ছবিটা ফিরিয়ে নিতে হাত বাড়ায়। রফিকুল তার হাত সরিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে ছবিটা। একদিন আবেগের বশে তালা ভেঙে যাদের বের করেছিল, তারা কোথায় গেল, কী করল, বেঁচে আছে না মরে গেছে, মাঝখানে এতগুলো বছর, কোনো দিন খোঁজ নেওয়া হলো না। সে নিজেও একজন মেয়েটি বলল, ‘বুড়া’। লিভার পচে গেছে। আজ আছে কাল নেই। রফিকুলের মনের পর্দায় ভেসে ওঠে অনেকগুলো মুখের ভেতর একটা মুখ। যার গালের মাঝখানে একটা আঁচিল ছিল গোলাপি রঙের, সাদা-কালো ছবিতে যদিও বোঝা যাচ্ছে না, এ কি সেই? মুক্তি সায় দিতে লোকটা হে-হে করে হাসতে থাকে। ‘গালে আঁচিল একটা মেয়ে বেরুইয়ে পানি খাতি চাইল। আমরা পানি দেলাম। বাড়ি কোথায় বলল না। খালি কইল, ঢাকাত থ্যে বাড়ি যাচ্ছিল, পথে ধরা পড়ছে। তখন এ খুব রোগা ছিল। এখন দেখি গায়ে গোশত হয়েছে–হে-হে-হে।’
‘পরনে কী শাড়ি ছিল? সিল্ক শাড়ি?’
‘শাড়ি-টাড়ি কিছু ছিল না। ও-ওই রহমই। হাফম্যাড। পরে, অনেক বছর পরেও রাতে ঘুম ভাঙলে ওই চেহারা কয়ডা মনের পর্দায় ভেসে উঠত।’
‘ঘরের মধ্যে কি হারমোনিয়াম-তবলা বা দেয়ালে পেইন্টিং ছিল?’
‘কে কয়? যে ব্যারাকে এদের আটক রাখছিল, তা একটা নোংরা-ময়লা ঘর। নয় মাস ঝাড় পড়ে নাই। এর মধ্যে হাফম্যাড–পাগলের মতো মেয়েটা বইসে ছেল।’
‘তো আপনি প্রথম তাদের হাসপাতালে নিলেন, না সামনের ইস্পাহানি স্কুলে?’
‘হাসপাতালে কারে নেয়া হচ্ছে, কারে নেয়া হচ্ছে না…’
‘ইস্কুল ঘরে?’
‘ইস্কুল ঘরে কারে নেয়া হচ্ছে, কারে নেয়া হচ্ছে না…’
রফিকুলের গ্লাস খালি। কথায় বিরতি দিয়ে কাজের ছেলের কাছে সে ইনিয়ে বিনিয়ে আরেকটু মদ চায়। তারপর ফের শুরু হয় কথাবার্তা, ‘কথা হইল গে ওই সময় সৈনিকের দুটো মন থাকে। একটা মন থাকে মানুষরে উদ্ধার করার জন্য, আরেকটা মন থাকে শত্রুরে মারার জন্য। মানুষ তো খালি মদ খেয়ে মাতাল হয় না! যারা জীবন্ত মানুষ গুলি করে মারে, ওরাও মাতাল।’
গ্লাসের তলানিটুকু গলায় ঢেলে রফিকুল বলে, ‘আমি যত পুড়ি ততই আমার ভালো লাগে। হা-হা-হা।’
পাকিস্তানি মিলিটারি তখন পালাচ্ছে। যুদ্ধ তখনো শেষ হয়নি। রফিকুলরা শুধু তালা ভেঙে দিয়েছে। হাসপাতালে কাকে নেয়া হচ্ছে, কাকে নেয়া হচ্ছে না, ইস্কুল ঘরে কাকে নেয়া হচ্ছে, কাকে নেওয়া হচ্ছে না–সেসব দেখা তাদের কাজ না। যুদ্ধ করার জন্য মাতালের মতো অবস্থা তখন তাদের। এ সময়ে কমান্ডারের নির্দেশ আসে–অ্যাডভান্স! সামনে বাড়ো!
১৫. সারেন্ডার সারেন্ডার, একটি জরুরি ঘোষণা
মেজর ইশতিয়াকের দলটা শত্রুর তাড়া খেয়ে পালাচ্ছে। পলায়নবৃত্তি কাপুরুষতা, তবে মৃত্যুর চেয়ে ভালো।
ব্যারাক ছাড়ার আগে মেজর ইশতিয়াকরা সাদা আর হলুদ মিত্রদের জন্য অপেক্ষা করে। তারা আকাশের দিকে তাকায়, সাগরের ওপর চোখ রাখে। শূন্যের রং নীল, সাগরেরও তাই। চীনা বা আমেরিকানদের এগিয়ে আসতে দেখা যায় না। রং শুধু বিভ্রান্তিই বাড়ায়। তাতে অযথা কালক্ষেপণ হয়। অবশেষে মাকড়সার জালে বন্দি মাছির মতো ভনভন করতে করতে রাতের অন্ধকারে একটি নদীর খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। উড়োজাহাজ থেকে দেখা রুপোলি সর্পিল জলাধার, তীরে নোঙর করা সারি সারি গানবোট–যেগুলো পদ্মার ওপর দিয়ে কুলচিহ্নহীন মেঘনার মোহনা পর্যন্ত তাদের এগিয়ে দেবে। তারপর সাদা পতাকাবাহী জাহাজে চেপে বিক্ষুব্ধ সাগরের তরঙ্গে ভাসতে ভাসতে পৌঁছে যাবে এমন এক নিরাপদ বন্দরে, যার জেটিতে স্ত্রী-সন্তানেরা চোখে জল আর হাতে রুমাল নিয়ে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু দিনশেষে রাত নামে। শুকনো খাল-বিল ছাড়া কিছু নজরে পড়ে না। নদীগুলো যেন যুদ্ধাক্রান্ত জনগোষ্ঠী, তাদের বুটের আওয়াজে দ্রুত পালাচ্ছে। অগত্যা সমুদ্রপথে পলায়নের পরিকল্পনাটা বাতিল হয়। কিন্তু শত্রু পেছনে রেখে ডাঙায় টিকে থাকা কঠিন, বিশেষ করে এমন এক জনপদে, যেখানে তুমি কারো সাহায্য আশা করতে পারো না। স্থানীয় লোকজন সামনে পেলে শিয়াল-কুকুরের মতো পিটিয়ে মারবে। শত্রু অঞ্চলে একটা বিচ্ছিন্ন দলের বাঁচার উপায় তারা স্টাফ কলেজের প্রশিক্ষণকালে পাতানো যুদ্ধের মাধ্যমে শিখেছিল। কিন্তু বাস্তবটা অন্যরকম। দিনে গা-ঢাকা দেওয়ার যে জনপ্রাণীহীন ল্যান্ডস্কেপ থাকার কথা, সে রকম কিছু কোথাও নেই। রাত কাটে খেতের সবজি চুরি করে, অনিদ্রায়, আতঙ্কে। পাতার খসখস আওয়াজ, ব্যাঙের ডাক, শিয়ালের খকখক হাসি শুনে তারা বন্দুকের ট্রিগার টিপে ধরে। এর মধ্যে এক রাতে সবজি চুরি করার সময় এমন এক অঘটন ঘটে, যা সেই গাঁয়ের লোক গর্ব আর শোকের স্মৃতি হিসেবে যুদ্ধের বহু বছর পরও মনে রাখবে এবং যে-কোনো আগন্তুকের কাছে তারা তা বয়ান করবে। তাতে মর্সিয়ার মাতম সহযোগে কারবালার কাহিনি শোনাবেন এক বৃদ্ধ। যার বয়সের গাছপাথর নেই।
