মেজর ইশতিয়াকরা শক্ৰবেষ্টিত। এই অবস্থায় ভূগর্ভস্থ কক্ষ থেকে ইস্টার্ন কমান্ডের নির্দেশ আসে-শতকরা পঁচাত্তর ভাগ কেজুয়্যালটির আগে ডিফেনসিভ পজিশন ছেড়ে কেউ পালাতে পারবে না। নির্দেশটা মৃত্যুর পরোয়ানা। ভূগর্ভস্থ নির্দেশটিকে মেজর ইশতিয়াক বিচার করে বাস্তবতার নিরিখে। শত্রু জল, স্থল, অন্তরীক্ষ–সর্বত্র বিরাজমান। এ অবস্থায় যুদ্ধ নিরর্থক, পালানো কাপুরুষতা। তারপর বাকি থাকে মৃত্যু। ‘মুজে মাফ কর্ দো’ বলে ভারতীয়দের বোমাবর্ষণের মধ্যে সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। মরিয়ম হতভম্ব। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শোনে দরজায় তালা লাগানোর ঝনঝন আওয়াজ। ‘এই, এই কী হচ্ছে? প্লিজ লেট মি ফ্রি, আই বেগ ইউ!’ সে দৌড়ে যায় দোর পর্যন্ত। বাইরে থেকে তখন জবাব আসে, ‘অর্ডার নেই।’
১৪. উদ্ধার পর্ব
তালা ভেঙে মরিয়মকে যারা উদ্ধার করে, অকুস্থলে পৌঁছাতে তাদের আরো চার দিন বাকি। পাকিস্তানি ট্যাংক আর যৌথ বাহিনীর ট্যাংক তখন সামনাসামনি মোকাবিলা করছে। ট্যাংকের ওপর গোলমতন ফাঁকা জায়গায় গ্রেনেড চার্জ করছে মুক্তিবাহিনী। প্রথমটা ছুঁড়ে দেওয়ার পর যখন বাস্ট হলো, ‘হা-হা-হা’ মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম হাসতে হাসতে মুক্তিকে বলে, ‘তখন খুব আনন্দ পালাম।’ তারপর দুপাশে মাথা নাড়ে, ‘এ বলা যায় না তো–এ ছিল স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ।’ সেদিনের ট্যাংক ফাইটে তাদের ছয় থেকে সাতজন ছেলে মারা যায়। পরেরটা বাস্ট হলো কি না, কাজটা চুরি চুরি করে করা হচ্ছে বলে রফিকুল বলতে পারবে না। তবে দ্বিতীয় দিনে তারা অনেক দূর অ্যাডভান্স করে। তৃতীয় দিনে তারা আরো অ্যাডভান্স করে। কমান্ডিং অফিসার শুধু অর্ডার দিয়ে যাচ্ছেন–অ্যাডভান্স। গুলির বৃষ্টিতে তারা ঢুকে পড়েছে। জীবনের পরোয়া নেই। তখন মুক্তিযযাদ্ধাদের কাছে রিপোর্ট এল, ‘পাকবাহিনী ভাইগ্যা যাচ্ছে। ওরা পালাচ্ছে। এদিকে ফায়ার চলছে। পেছনে আর্টিলারি। আর্টিলারি সেল নিক্ষেপ করে যথারীতি অপারেশন পার্টিকে কাভার দিয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা অ্যাডভান্স করছে। চারপাশের গ্রাম দেখতে পাচ্ছে তারা। আশপাশের গ্রামের মানুষ গরুগাড়ি করে, পায়ে হেঁটে সরে যাচ্ছে। তাদের আগে আগে পাঞ্জাবিরাও যাচ্ছে। পালাচ্ছে।
চতুর্থ দিন সকালবেলা একটা খোলা জিপে করে রফিকুল ইসলামরা শহরে ঢোকে। তাদের জিপের এক সাইডে ফিট করা মেশিনগান, অন্য সাইডে এলএমজি। শহর একবারে ফাঁকা। পাকিস্তানি সৈন্যরা আগেই পালিয়েছে। কোনো লোকজনও নেই। রাস্তার কুকুরগুলো পাগলের মতো এলোমেলো ঘুরে বেড়াচ্ছে। ততক্ষণে মুক্তিযোদ্ধাদের জয় বাংলা ধ্বনি আর ব্ল্যাংক ফায়ার চারদিক থেকে শুরু হয়ে গেছে। রফিকুলদের গাড়িটা চালাচ্ছিল সিক্সথ বেঙ্গলের একটি ছেলে। নাম স্বপন। পাশের সিটে আর পেছনে স্টেনগান হাতে ওরা পাঁচজন। একজন হলো রুস্তম আলি, যাকে ’৭৩ সালে মহররমের আশুরার দিন কিছু অজ্ঞাত ব্যক্তি গুলি করে হত্যা করে। সে জাসদের গণবাহিনী করত। আরেকজন ছিল কালো হ্যাংলা মতন, নাম সিরাজ। কমিশনার সাহেবের মেয়ে সে বিয়ে করেছে। এখন কন্ট্রাকটরি করে। পরের জন সুধীর, শহিদ সুধীর পাল, পরদিন নারকেলবাড়িয়ার যুদ্ধে সুধীর শহিদ হয়। এখন জেলখানার দিকে যেতে যে সাদা একতলা বাড়িটা, এর মালিক আগে স্টেশনমাস্টার ছিল, পরে ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে কাজ করত, তার মেজো ছেলে, কোনো এক ব্যাংকের এখন ডিরেক্টর, সে ছিল রফিকুলদের দলের চতুর্থ ব্যক্তি। আর রফিকুল নিজে হচ্ছে একজন প্রাক্তন ব্যবসায়ী। ব্যবসায় লাল বাত্তি জ্বলে উঠলে রাস্তার ওপরের দোকান বেচে দিয়ে, দোকানের পেছনের নামায় একটা ছাপরা মতন ঘর বেঁধে থাকে। তার কথামতো, এখন মদ না খেলে রাতে ঘুম হয় না।
পাঁচজনের দলটা একটা ভোলা জিপ নিয়ে সেদিন বন্দি মানুষদের উদ্ধারে নেমে পড়ে। তারা জয় বাংলা স্লোগান দিতে দিতে প্রথম জেলখানার দিকে যায়। জেলের তালা ভেঙে ছোটে ক্যান্টনমেন্টের দিকে। মরিয়ম বলে, ‘সকাল থেকে খালি কানে আসতেছে জয় বাংলা স্লোগান। সারা দিনই জয় বাংলা স্লোগান শুনছি। গোলাগুলির শব্দও দূর থেকে ভেসে আসছে।
মেজর ইশতিয়াক চলে যাওয়ার দিন থেকে মরিয়ম না-খাওয়া। এই চার দিনে এক বেলাও খাবার জোটেনি। বাথরুমের কল ছেড়ে দু’দিন শুধু পানি খেয়েছে। তারপর কলেও পানি নেই। পানি-বাতি সব বন্ধ। জিব দিয়ে ঠোঁট চাটতে গেলে জিব। জড়িয়ে আসে। খিদা-তৃষ্ণার বোধটা ধীরে ধীরে শরীর থেকে চলে যাচ্ছিল। এই বুঝি শেষ, না-খেয়ে মরতে হবে। এই অবস্থায় জয় বাংলা স্লোগানটা আরো নিকটে এলে, মরিয়ম বলে, ‘তখন যে কী অনুভূতি হচ্ছিল তা ভাষায় বোঝাতে পারব না। আরে আল্লা, আমরা তাইলে বেঁচে গেছি, বোমার আঘাতে বা না-খেয়ে আমাদের আর মরতে হবে না!’ শরীরে তখন অসুর ভর করে। ‘ও বাবা, ও ভাই’ চিৎকার করে করে মরিয়ম তখন দরজায় লাথি মারছে। বাইরে থেকেও চিৎকার আসে, ‘ও মা, ও বুইন আমরা আসছি, আমরা আসছি। মা-মা, এই যে আমরা আসছি, এই যে আমরা আসছি।’
আঁচলে চোখ মোছে মরিয়ম, ‘কান্না পায় কথাগুলো মনে পড়লে। এত বছর পর কান পাতলে আজও শুনি মা-মা চিৎকার করে ওরা আসছে।’ মরিয়ম যে কোনোদিন জীবিত সন্তানের মা হতে পারল না, দূর থেকে ভেসে আসা ওই মা-মা চিৎকারটা ওর কষ্ট এখন আরো বাড়িয়ে দেয়। তখন কত আশা ছিল, মেজর ইশতিয়াক পালিয়ে গেছে–যাক, দেশ স্বাধীন হয়েছে, মুক্তিবাহিনী এগিয়ে আসছে তাদের উদ্ধার করতে।
